রাতের অন্ধকারে এ-পথ সে-পথ ঘুরতে ঘুরতে এক সময় হঠাৎ তার চোখে পড়ল, রাস্তার পূর্ব দিকের বাড়ির ছাদ থেকে একটি মনুষ্য মূর্তি নিচে নামবার চেষ্টা করছে। তা দেখে টারজনের মনে কৌতূহল জাগল।
স্মিথ-ওল্ডইউককে যে গুপ্ত ঘরে রেখে রক্ষীরা চলে গেল তার দেয়াল হাতড়াতে হাতড়াতে স্মিথ ওল্ডইউক একটা কাঠের দরজা পেয়ে গেল। খুব সাবধানে নিঃশব্দে দরজার খিল খুলতেই চোখে পড়ল, বাইরে শুধু চাপ চাপ অন্ধকার।
অন্ধকারে একটা সরু বারান্দা ধরে এগিয়ে কয়েক গজ যেতেই সে ধাক্কা খেল মইয়ের মত একটা বস্তুতে। সামনের পথ দেয়ালে অবরুদ্ধ। অগত্যা সে মই বেয়ে উপরে উঠতে লাগল। মইয়ের দু’তিনটে ধাপ পার হতেই মাথায় একটা জোর ঠোক্কর খেয়ে একটা হাত মাথার উপর তুলতেই বুঝতে পারল, ছাদের একটা চাপ-দরজার সঙ্গে তার মাথা ঠুকে গেছে। অল্প চেষ্টাতেই দরজাটাকে ঠেলে একটু উঁচু করতেই তার ফাঁক দিয়ে চোখের সামনে ফুটে উঠল রাতের আফ্রিকার তারায় ভরা আকাশ।
একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল তার বুকের ভিতর থেকে। ধীরে ধীরে পাল্লাটাকে একপাশে সরিয়ে দ্রুত চারদিকে তাকিয়ে বুঝল, ধারে-কাছে কেউ কোথাও নেই।
প্রাচীর বেয়ে একটা খিলানের নিচে নেমে গেল। আর তখনই পিছনে সামান্য শব্দ শুনে ফিরে তাকাতেই দেখল, একটি সৈনিক তার একেবারে সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
স্মিথ-ওল্ডইউকের প্রথম চিন্তাই হল, একটা গুলিতে সৈনিককে সাবার করে দিয়ে দুই পা যেদিকে যায় সেই দিকে ছুটে পালাবে, কারণ এর হাতে পড়া মানেই আবার বন্দী হওয়া। সেই কথা ভেবে পিস্তলের জন্য পাশ-পকেটে হাত ঢোকাতেই একটা কঠিন মুঠি তার কব্জিটাকে চেপে ধরল, আর একটি নিম্নকন্ঠ ইংরেজিতে বলে উঠল, লেফটেন্যান্ট, আমি অরণ্যরাজ টারজান।
স্মিথ-ওল্ডইউক বলে উঠল, তুমি? তুমি? আমি তো ভেবেছিলাম তুমি মরে গৈছ!
টারজান বলল, না, মরিনি। দেখছি তুমিও মরনি। কিন্তু মেয়েটির খবর কি?
ইংরেজ যুবক উত্তর দিল, এখানে আসার পর থেকে আর তাকে দেখিনি। শহরে আনার পরেই আমাদের আলাদা করে দিয়েছে।
টারজান বলল, তাকে তো খুঁজে বের করতেই হবে। হতে পারে সে একটি জার্মান গুপ্তচর, তবু সে নারী-শ্বেতাঙ্গিনী- তাকে আমরা এখানে ফেলে যেতে পারি না।
শেষ পর্যন্ত ফেলে যেতেও হল না। টারজনের সঙ্গে সংঘর্ষে মেটাকের মৃত্যু হল। সেই সুযোগে তাদের সঙ্গে পরিচয় হল নিগ্রো ক্রীতদাস ওটোবুর সঙ্গে। তাকে ক্রীতদাসত্ব থেকে মুক্তি দেয়া হবে এই শর্তে টারজান তাকেও দলে টেনে নিল। তিনজনের মিলিত আক্রমণে মেটাক পরাভূত হল।
এবার সুযোগ পেয়ে টারজান মেটাকের গলাটা চেপে ধরল। ধীরে ধীরে দৈত্যের মুঠি বসে গেল তার গলায়। তার চোখ দুটো ঠিকরে বেরিয়ে এল। টারজান তখন তার মৃতপ্রায় দেহটাকে দুই হাতে মাথার উপর তুলে সবেগে জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল নিচের সিংহের আস্তানার মধ্যে।
বিজয়গর্বে সঙ্গীদের দিকে ফিরে তাকিয়ে টারজান দেখল সকলে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
টারজান ওটোবুকে বলল, তুমি যদি ওয়ামাবো দেশে ফিরে যেতে চাও তাহলে নিরাপদ পথ দরে আমাদের শহরের বাইরে নিয়ে চল।
নিগ্রো বলল, নিরাপদ পথ তো নেই। তবে সকলের গায়েই এ দেশী পোশাক আছে। তাই ফটক পর্যন্ত আমরা নির্বিঘ্নেই যেতে পারব। তবে বিপদ দেখা দেবে সেখানেই, কারণ রাতের বেলা কাউকে শহর ছেড়ে যেতে দেয়া হয় না।
টারজান বলল, সে দেখা যাবে। এখন তো চল।
দুটি পুরুষ, একটি নারী ও একটি কালা ক্রীতদাস এ শহরের পথে কোন অসাধারণ দৃশ্য নয়। তাছাড়া এই গভীর রাতে পথও জনবিরল।
দুটো মোড় ঘুরতেই ফটকটা চোখে পড়ল। সেখানে অন্তত বিশজন সশস্ত্র সৈনিক তাদের বন্দী করতে প্রস্তুত হয়ে আছে।
টারজান ইংরেজ যুবকের দিকে ফিরে বলল, তোমার সঙ্গে কত গুলি আছে?
স্মিথ-ওল্ডইউক উত্তর দিল, পিস্তলে আছে সাতটা, আর পকেটে আছে আরও এক ডজন।
টারজান বলল, ওটোবু, তুমি থাক এই মেয়ের পাশে। ওল্ডউইক, তুমি আর আমি এগিয়ে যাব।
শুরু হল আক্রমণ। স্মিথ-ওল্ডইউকের পিস্তল গর্জে উঠল। অনেকেই থর থর করে কাঁপতে কাঁপতে ধরাশায়ী হল। সেই সুযোগে টারজান তার দলবল নিয়ে ফটক পার হয়ে অন্ধকারের ভিতর দিয়ে ছুটতে লাগল।
একটা গিরি-খাতে ঢোকার পরে দিনের আলো ফুটল। টারজান ছাড়া বাকি সকলেই ক্লান্ত; তবু তারা বুঝতে পারছে খাতের খাড়া পাহাড়ি দিকটা বেয়ে উপরের মালভূমিতে না ওঠা পর্যন্ত যে ভাবে হোক তাদের এগিয়ে যেতেই হবে।
ক্রমে দুপুর হ’ল। সারাটা পথ টারজান হয় কাঁধে করে নয়তো গলা জড়িয়ে ধরে স্মিথ-ওল্ডউইককে সঙ্গে নিয়ে চলেছে। কিন্তু এবার যে বার্থা কিচারের পাও টলতে শুরু করেছে।
তার অবস্থা দেখেই দুপুরের পরে ইংরেজ যুবক হঠাৎ বালির উপর বসে পড়ে বলল, আমি আর হাঁটতে পারছি না। মিস কিরচারও ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়েছে। আমাকে ফেলেই তোমাদের এগোতে হবে।
মেয়েটি বলল, না, তা হতে পারে না। এত বিপদ-আপদের মধ্যেও আমরা একসঙ্গে আছি, আর কপালে যাই থাকুক একসঙ্গে থাকব। টারজনের দিকে মুখ তুলে বলল, অবশ্য তুমি যদি আমাদের এখানে রেখে এগিয়ে যাও সেটা স্বতন্ত্র কথা।
ঈষৎ হেসে টারজান বলল, তুমি এখনও মরনি; লেফটেন্যান্ট বা ওটোবু বা আমিও মরিনি। হয় মরব না হয় বাঁচব, তবুও যতদিন না মরি ততদিন বাঁচার চেষ্টাই করব। এতদিন যখন আসতে পেরেছি তখন এগিয়েই যাব। আপাতত এখানেই বিশ্রাম করা যাক, কারণ তোমরা একটু সুস্থ হলে আবার আমরা পথ চলব।
