সকলে যখন পাশের ঘরে রাজার জন্য অপেক্ষা করছে তখন আর একটি ঘর থেকে ঢুকল একটি সুন্দর যুবক। পরিধানে রাজকীয় পোশাক। তাকে দেখেই সৈনিকরা উঠে দাঁড়াল।
জনৈক সঙ্গী অস্ফুট স্বরে বলল, যুবরাজ মেটাক।
দরবার কক্ষের দিকে দু’পা এগোতেই যুবরাজের চোখ পড়ল বার্থা কিচারের দিকে। হঠাৎ থেমে সে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল মেয়েটির দিকে। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিকে এড়াবার জন্য বার্থা মুখটা ফিরিয়ে নিতেই হঠাৎ মেটাকের সমস্ত শরীর থর থর করে কাঁপতে লাগল। তীব্র স্বরে হুংকার দিয়ে এক লাফে এগিয়ে এসে মেয়েটিকে কাছে টেনে নিল।
শুরু হয়ে গেল হট্টগোল। যে রক্ষীরা মেয়েটিকে রাজার কাছে নিয়ে যেতে এসেছিল তারা খোলা তলোয়ার উঁচিয়ে যুবরাজকে ঘিরে নৃত্য শুরু করে দিল। বাকি সব রক্ষীরাও পাগলা যুবরাজের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে তলোয়ার ঘোরাতে ঘোরাতে ছুটে এল।
পাগলের কবল থেকে নিজেকে ছাড়াবার জন্য বার্থা প্রাণপণে চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু যুবরাজের বাহুর দৃঢ় বন্ধনে সে তখন শিশুর মত অসহায়। অনায়াসে তাকে বয়ে নিয়ে মেটাক উল্টো দিকের দরজা। দিয়ে বেরিয়ে গেল।
সেইদিনই সন্ধ্যার ঠিক আগে একজন ক্লান্ত বৈমানিক দ্বিতীয় রোডেশীয় বিমান বাহিনীর কর্নেল ক্যাপেলের হেডকোয়ার্টারে ঢুকে স্যালুট করে দাঁড়াল।
কর্নেল জিজ্ঞাসা করল, আরে টম্পসন, কি খবর? অন্য সকলেই তো ফিরে এসেছে। ওল্ডউইক বা তার বিমানের কোন পাত্তাই করতে পারেনি। মনে হচ্ছে, তোমারও যদি সেই দশা হয়ে থাকে তাহলে এ প্রচেষ্টা ছেড়েই দিতে হবে।
যুবক অফিসার বলল, তা করতে হবে না। আমি বিমানটির দেখা পেয়েছি।
কর্নেল ক্যাপেল বলে উঠল, বল কি হে! কোথায়? ওল্ডউইকের কোন হসিদ পেয়েছ?
সে অনেক ভিতরে একটা জঘন্য গিরি-খাতের মধ্যে। বিমানটা দেখতে পেয়েছি ঠিকই, কিন্তু সেখানে নামতে পারিনি। একটা সিংহ অনবরত সেটাকে চক্কর মারছে। ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত চলে এসেছি।
তোমার কি মনে হয় ওল্ডউইক সিংহের পেটে গেছে?
লেফটেন্যান্ট টম্পসন বলল, না, সে রকম মনে হল না। বিমানের কাছাকাছি কোথাও সিংহটা শিকার ধরে খেয়েছে এমন কোন চিহ্ন দেখতে পাইনি। যখন দেখলাম কিছুতেই নিচে নামা অসম্ভব নয় তখন। গিরিখাতের এদিক থেকে ওদিকে বার কয়েক উড়ে ভাল করে দেখলাম। একটা আশ্চর্য জিনিস দেখে এলাম। কয়েক মাইল দক্ষিণে একটা ছোটখাটো উপত্যকা গাছপালায় ঢাকা, আর তারই ঠিক। মাঝখানে আমার মাথা খারাপ হয়েছে বলে মনে করবেন না। একটা সুন্দর শহর: রাস্তাঘাট, বড় বড়। বাড়ি, গম্বুজ, মিনার-সব কিছু।
শহরে লোকজন ছিল? কর্নেলের প্রশ্ন।
হ্যাঁ। রাস্তায় লোকজন দেখেছি।
ঠিক সেই মুহূর্তে একটা বড় ভকসল গাড়ি হেডকোয়ার্টারের সামনে এসে থামল। আর এক মিনিট পরেই জেনারেল ম্যাটস্ গাড়ি থেকে নেমে ভিতরে ঢুকল।
জেনারেল বলল, এই পথেই যাচ্ছিলাম। ভাবলাম নেমে একটু গল্প করে যাই। ভাল কথা, লেফটেন্যান্ট ওল্ডউইকের খোঁজ-খবর কতদূর এগোল? এই তো টম্পসন দাঁড়িয়ে আছে। সেও তো। অনুসন্ধানের কাজে গিয়েছিল বলে শুনেছি।
ক্যাপেল বলল, ঠিকই শুনেছেন। সেই ফিরেছে সকলের শেষে। লেফটেন্যান্টের বিমানটাকে সে দেখেছে। তারপর টম্পসনের দেয়া বিবরণ সবই তাকে শোনানো হল। তখন দুই অফিসার ও বৈমানিক মিলে টম্পসন-বর্ণিত শহরটার অবস্থানের একটা নক্সা তৈরি করে ফেলল।
স্মাটস বলল, এ দেশটা যেমন বিশাল তেমনি দুরধিগম্য। তবু একটা ছোট বাহিনীকে সেখানে পাঠাতে হবে। খাদ্য ও জলসহ বেশ কয়েকটা মোট লরিসহ একটা বা দুটো কোম্পানি পাঠাও। পশ্চিমে। যতদূর পর্যন্ত লরি চলে সেখানে একটা বেসক্যাম্প বসাও। গোটা দুই বিমানও পাঠাবে সেই সঙ্গে। তারাই বেস-ক্যাম্পের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে। তোমার বাহিনীকে কখন পাঠাতে পারবে?
ক্যাপেল জবাব দিল, আজ রাতেই লরি বোঝাই করা হবে, আর কাল সকাল একটা নাগাদ যাত্রা শুরু হবে।
এক লাফে দ্রাক্ষালতাটা ধরে ঝুলে পড়েই টারজান বুঝতে পারল যে একটা সিংহও কাছাকাছিই আছে, আর তার জীবন নির্ভর করছে লতাটার শক্তির উপরে।
মাত্র কয়েক ফুট নিচেই বাড়ির ছাদটা দেখতে পেয়ে তার উপর লাফিয়ে পড়ামাত্রই একটি ভারী দেহ পিছন থেকে তার উপর লাফিয়ে পড়ে বাদামী দুই বাহু দিয়ে তার কোমরটা জড়িয়ে ধরল।
অসুবিধাজনক অবস্থায় ধরা পড়ে প্রথমে টারজান খুবই অসহায় বোধ করল। কিন্তু বিপদে ভড়কে যাবার পাত্র সে নয়। হঠাৎ সে এমনভাবে একটা ঝটকা মারল যে পিছনের লোকটা পাল্টি খেয়ে সামনে ছিটকে পড়ল, আর সেই ফাঁকে টারজান নিজেকে মুক্ত করে তার বুকের উপর বসে বাঁ হাতে চেপে ধরল তার তরবারি শুদ্ধ কব্জিটা আর ডান হাতে চেপে ধরল তার কণ্ঠনালী। গোঁ গোঁ করতে করতে লোকটির জিভ বেরিয়ে এল, চোখের মণি ঠেলে উঠল। তার ভবলীলা সাঙ্গ হল।
যুবক অফিসার ও মেয়েটিকে খুঁজতে হলে তাকে শহরের পথে পথে ঘুরতে হবে। কিন্তু এ রকম প্রায় নগ্নদেহে পথে নামলে সে তো অচিরেই ধরা পড়ে যাবে। কাজেই একটা ছদ্মবেশ দরকার। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ধৃত রক্ষীর কাকাতুয়া মার্কা পোশাকটা গায়ে জড়িয়ে কোমরবন্ধটা কোমরে জড়িয়ে নিল। অবশ্য পোশাকের তলে ছুরিটাকে লুকিয়ে রাখল। এইভাবে বেশ ভাল রকম ছদ্মবেশে টারজান শহরের পথে নামল।
