জঙ্গল পার হতেই সামনে চাষের ক্ষেত ও একটা প্রাচীরঘেরা নগর দেখতে পেয়ে তারা অবাক হয়ে গেল।
স্মিথ-ওল্ডইউক বলে উঠল, আরে, এ যে রীতিমত ইঞ্জিনীয়ারের হাতের কাজ।
মেয়েটি দূরে তাকিয়ে বলে উঠল, আর ঐ গম্বুজ ও মিনারগুলো দেখ। প্রাচীরের ওপাশে নিশ্চয় সভ্য মানুষরা বাস করে। হয়তো ভাগ্যক্রমেই আমরা তাদের হাতে পড়েছি।
স্মিথ-ওল্ডইউক মাথা নেড়ে বলল, হয়তো তাই। তবু আমার কেমন যেন ভাল বোধ হচ্ছে না। নিশ্চয়ই কিছু একটা গোলমাল আছে।
খিলান-দেয়া ফটক পার হয়ে তারা ভিতরে ঢুকল। সরু সরু পথ। দু’দিকে সারি সারি বাড়ি ঘর। অধিকাংশই দোতলা।
একদল রক্ষী এসে বার্থা কিরচারকে ইশারায় তাদের অনুগমন করতে বলল। স্মিথ-ওল্ডইউককে সঙ্গে নিল না। কিছুক্ষণ পরে আর দু’জন রক্ষী এসে তাকে নিয়ে গেল।
বার্থা কিরচারকে নিয়ে যাওয়া হলো নগরের সবচাইতে বড় ও বেশি জাঁকজমকপূর্ণ বাড়িটাতে।
পর পর অনেকগুলো দরজা পার হয়ে তারা একটা হলে ঢুকল। মেঝেতে পায়চারি করছে লাল পোশাকে সজ্জিত একটি মানুষ। তার বুক ও পিঠের উপর প্রকাণ্ড দুটো কাকাতুয়ার মূর্তি, আর শিরস্ত্রাণের উপর বসানো একটা খড়ভর্তি কাকাতুয়া।
ঘরের চার দেয়ালে শত শত, হাজার হাজার কাকাতুয়ার মূর্তি কাপড়ের উপর সেলাই করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।
লোকটি ঘরময় হাঁটছে তো হাঁটছেই। একটি মেয়েকে সেখানে আনা হয়েছে সে খেয়ালই নেই। হঠাৎ পায়চারি থামিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে সে ছুটে এল মেয়েটির দিকে। তাকে ছুটে আসতে দেখে মেয়েটি তাকে রুখবার ভঙ্গীতে হাত বাড়িয়ে দিয়ে সভয়ে পিছনে হটে গেল।
লোকটি কিন্তু খুব কাছে এসেও তাকে স্পর্শ পর্যন্ত করল না। চোখ ঘুরিয়ে তাকে দেখতে লাগল, আর তার চুল, চামড়া, পোশাক, বিশেষ করে তার দাঁতগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল।
তারপর আবার পায়চারি শুর করল। এইভাবে পনেরো মিনিট কাটাবার পরে রক্ষীদের কি যেন হুকুম করতেই তারা মেয়েটিকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
অনেকগুলো বারান্দা ও ঘর পার হয়ে তারা সিঁড়ি বেয়ে আরও একতলা উপরে উঠে গেল। সেখানে একটা ছোট ঘরে তাকে ঢুকিয়ে দিয়ে রক্ষীরা দরজায় তালা লাগিয়ে চলে গেল।
এক কোণে একটা নিচু আসনে বসে আছে একটি নারী। তার উপর চোখ পড়তেই বার্থ কিরচার চমকে উঠল। এ যে তারই মত এক শ্বেতাঙ্গিনী। বৃদ্ধ বয়স, বিবর্ণ নীল চোখ, থোবড়ানো দন্তহীন মুখ বলীরেখায় আকীর্ণ।
দুর্বল দেহে বৃদ্ধা দুই হাতে লাঠিতে ভর দিয়ে স্খলিত পায়ে মেয়েটির দিকে এগিয়ে গেল। তাকে আপাদ মস্তক নিরীক্ষণ করে কাঁপা-কাঁপা গলায় বলল, তুমি কি বাইরের জগৎ থেকে এসেছ? ঈশ্বর করুণ, তুমি যেন আমার এই ভাষা বুঝতে ও বলতে পার।
বার্থা কিরচার সবিস্ময়ে প্রশ্ন করল, তুমি একজন ইংরেজ? কত বছর এখানে আছ?
ষাট বছর আমি এই প্রাসাদের বাইরে যাইনি। হাড়-জিরজিরে হাতটা বাড়িয়ে বলল, এস। এই আসনে আমার পাশে বস।
মেয়েটিকে নিয়ে আসনে বসে বৃদ্ধা বলল, এবার বল, তুমি কেমন করে এদের খপ্পরে পড়লে?
মেয়েটি সংক্ষেপে সব কথাই বলল। সব শুনে বৃদ্ধা শুধাল, তাহলে তোমার সঙ্গে একটি ছেলেও আছে?
হ্যাঁ, কিন্তু সে যে কোথায় আছে, তাকে নিয়ে এরা কি করেছে, কিছুই আমি জানি না।
বৃদ্ধা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। একটু পরে মেয়েটি শুধাল, এরা কারা? এরা তো আমাদের মত নয়, আর তুমিই বা এখানে এলে কেমন করে?
আসনে দুলতে দুলতে বৃদ্ধা বলতে শুরু করল ও সে অনেক দিন আগেকার কথা। আমার বয়স তখন মাত্র বিশ বছর। খুবই সুন্দরী ছিলাম। বাবা ছিল মধ্য আফ্রিকার একজন মিশনারী। একদিন সেখানে হানা দিল একদল আরব ক্রীতদাস-ব্যবসায়ী। ছোট গ্রামের অন্য নারী-পুরুষের সঙ্গে তারা আমাকেও নিয়ে গেল।
তারপর নদী, নালা, প্রান্তর, পাহাড় পেরিয়ে সে এক দীর্ঘ যাত্রা। ক্রমে তাদের হাবভাবে ও কথা বার্তায় বুঝলাম, তারা পথ হারিয়েছে।
ক্ষুধায় তৃষ্ণায় কাতর হয়ে বন্দী নিগ্রোরা একে একে পথের মাঝখানেই মরতে লাগল। ক্ষিধে মিটাতে লাগল ঘোড়ার মাংস কেটে খেয়ে। শেষ পর্যন্ত এই দেশে এসে পৌঁছলাম মাত্র দু’জন- আমি ও আরব সর্দার আর পৌঁছেই বন্দী হলাম এদের হাতে-ঠিক যেভাবে তুমি বন্দী হয়েছ।
তোমার মতই আমাকেও তারা এই প্রাসাদে নিয়ে এল। তখন রাজা ছিল পঞ্চবিংশতি আগো। তারপর থেকে অনেক রাজা দেখলাম। কি জান, এরা সকলেই ভয়ঙ্কর।
কিন্তু এদের হয়েছে কি? মেয়েটি শুধাল।
বৃদ্ধা বলল, এরা এক পাগল জাত। তুমি কি তা বুঝতে পারনি?
এরা সব পক্ষীকে ভক্তি করে, কিন্তু এদের প্রধান দেবতা কাকাতুয়া। এই প্রাসাদের একটা খুব সুন্দর ঘরে একটি কাকাতুয়া আছে। সেই এদের দেবাধিপতি।
কিছুক্ষণ দু’জনই চুপ।
প্রথম কথা বলল বার্থা কিরচার এখান থেকে পালাবার কি কোন পথ নেই?
গরাদে-দেয়া জানালার দিকে আঙুল বাড়িয়ে রানী বলল, দেখতেই তো পাচ্ছ। দরজার বাইরে আছে সশস্ত্র খোঁজা। তাকে পার হয়ে রাস্তায় যাবে কেমন করে? একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, না, এখান থেকে পালাবার কোন উপায় নেই।
ঠিক সেই সময় একটি পীতবসনধারী সৈনিক ঘরে ঢুকে বৃদ্ধাকে কি যেন বলল।
বৃদ্ধা বার্থাকে বলল, রাজার হুকুম হয়েছে তোমাকে ভালভাবে সাজিয়ে তার কাছে পাঠাতে হবে।
স্নান সেরে সাজ-পোশাক পরে রক্ষীদের সঙ্গে বার্থা কিরচার বলল রাজ দর্শনে।
