সৌভাগ্যবশত দু’জনের কেউই সেরকম আঘাত পেল না, কিন্তু তাদের অবস্থা দাঁড়াল শোচনীয়।
মেয়েটি শুধাল, তুমি কি যন্ত্রটা মেরামত করতে পারবে না?
চেষ্টা করে দেখতে হবে। আশা করি গুরুতর ক্ষতি কিছু হয়নি। টাঙ্গা রেলপথ তো এখান থেকে অনেক-অনেক দূরে।
দু’দিন ধরে স্মিথ-ওল্ডউইক বিমানটাকে মেরামতের অনেক চেষ্টা করল। কিন্তু তার সব চেষ্টাই বিফল হল।
স্মিথ-ওল্ডইউক বিমানে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। মেয়েটি তাকিয়েছিল নিচের গিরি-খাতের দিকে। হঠাৎ সে যুবকটির হাত চেপে ধরল। ফিসফিস্ করে বলল, ওই দেখ।
তার দৃষ্টি অনুসরণ করে দূরে পাহাড়ের বাঁকের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে যুবক দেখতে পেল একটা বড় সিংহের মাথা।
সিংহ নুমা একটু একটু করে এগিয়ে আসেছ। বিমানের একেবারে কাছে এসে উপরের দিকে তাকিয়েই সে একটা লাফ দিল। পাইলটও পিস্তল থেকে গুলি ছুঁড়ল।
আর ঠিক সেই ক্ষণে অরণ্যরাজ টারজনের প্রবেশ ঘটল সেই দৃশ্যে। তাকে দেখেই নুমা মুখ ফিরিয়ে তার দিকে এগিয়ে গেল।
টারজান বর্শা হাতে তৈরি ছিল। কিন্তু সে চিনতে পারল, এটা তার পরিচিত নুমা।
নুমাও তাকে চিনতে পেরেছে। গুটি-গুটি পায়ে এগিয়ে এসে সিংহটা টারজনের পাশে দাঁড়াল বিশ্বস্ত ভৃত্যের ভঙ্গীতে।
মুহূর্তের মধ্যে অরণ্যরাজ টারজান রূপান্তরিত হল লর্ড গ্রেস্টোক জন ক্লেটন-এ। বিমানের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, তোমাদের খুঁজে পাবার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলাম। বড় ঠিক সময়ে এসে পড়েছি। বিমানটা কি একেবারেই অকেজো হয়ে গেছে?
হ্যাঁ, কোন আশা নেই, স্মিথ-ওল্ডইউক বলল।
টারজান শুধাল, তাহলে এখন কি করবে কিছু ভেবেছ?
মেয়েটি উত্তর দিল, আমরা উপকূলে পৌঁছতে চাই। কিন্তু এখন তো সেটা অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে।
টারজান বলল, কিছুক্ষণ আগে হলে আমিও তাই মনে করতাম। কিন্তু নুমাকে যখন এখানে পেয়েছি তখন জলভাগ নিশ্চয় খুব দূরে হবে না। তোমরা নেমে এস।
যুবক-যুবতী দুটি ভয়ে ভয়ে বিমান থেকে নেমে এল। আগে আগে চলল নুমা। তার পিছনে-পিছনে বাকিরা। অন্ধকার নেমে আসার আগেই হঠাৎ টারজান দাঁড়িয়ে পড়ল। দুই সঙ্গী সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকাতে সে আঙুল বাড়িয়ে সামনের পথটা দেখাল। ভাল করে নজর করতেই মেয়েটি চেঁচিয়ে বলে উঠল, মানুষের পায়ের ছাপ।
টারজান মাথা নাড়ল।
মেয়েটি আঙুল বাড়িয়ে বলল, কিন্তু পায়ের আঙুলের কোন ছাপ নেই।
পায়ে নরম স্যান্ডেল ছিল, টারজান বুঝিয়ে বলল।
তাহলে তো নিশ্চয় কাছাকাছি কোন গ্রাম আছে। স্মিথ-ওল্ডইউক বলল।
টারজান বলল, তা আছে; কিন্তু আফ্রিকার এই সব অঞ্চলে যে সব মানুষ বাস করে তারা তো পায়ে স্যান্ডেল পরে না।
তার মানে তুমি মনে কর যে এগুলো কোন সাদা মানুষের পায়ের ছাপ?
সেইরকমই তো মনে হচ্ছে, বলেই টারজান হঠাৎ মাটিতে হামাগুড়ি দিয়ে পথটা শুঁকতে শুরু করল।
যৎসামান্য খাবারে নৈশভোজন শেষ করে টারজান মেয়েটিকে একটা গুহার ভিতরে ঢুকতে বলল।
বলল, তুমি ভিতরে ঘুমাবে। লেফটেন্যান্ট ও আমি শোব বাইরে গুহার মুখে।
সেই রাতেই একদল মানুষ এসে তাদের আক্রমণ করল। এতগুলো মানুষের বিরুদ্ধে একা কিছুই করতে পারবে না জেনেও টারজান রুখে দাঁড়াল। কিন্তু তার সব চেষ্টা ব্যর্থ হল। একটা প্রচণ্ড ধাক্কায় ছিটকে পড়ে মাথায় আঘাত পেয়ে সে জ্ঞান হারাল।
যখন জ্ঞান ফিরল তখন ভোরের আলো ফুটেছে। টারজান করে ধীরে চোখ মেলল।
গুহার ভিতরে তাকিয়ে দেখল, স্মিথ-ওল্ডইউক ও বার্থা কিরচার কেউই সেখানে নেই। তার সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে দেখে টারজান তীব্র রোষে মাথাটা ঝাঁকি দিল। যেমন করেই হোক এবার খুঁজে বের করতে হবে বার্থা কিরচার ও স্মিথ-ওল্ডইউককে। পথে অনেক স্যান্ডেল-পরা পায়ের ছাপ এবং একদল বিচিত্র মানুষের গন্ধ পেল। চলতে চলতে তার নাকে এল মেয়েটির গন্ধ, একটু পরে স্মিথ-ওল্ডইউকের গন্ধ। পথ ক্রমেই সরু হয়ে এল। মেয়েটি ও ইংরেজটির পায়ের ছাপও স্পষ্টতর হয়ে উঠল।
মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে আর একবার ভাল করে শুঁকে টারজান মেয়েটি ও তার অপহরণকারীদের পথের সন্ধান পেয়ে সেই পথে চলতে শুরু করল। চলতে চলতে এক সময় হঠাৎ তার বিস্মিত দৃষ্টির সামনে দেখা দিল গম্বুজ ও মিনারে শোভিত একটি প্রাচীরঘেরা নগর। প্রাচীর ছাড়িয়ে আকাশে মাথা। তুলেছে কয়েকটি গম্বুজ ও অসংখ্য মিনার; কেন্দ্রস্থ গম্বুজটি সোনালী রং করা; বাকিগুলো লাল, নীল বা হলুদ।
সূর্য অস্ত গেল। অন্ধকারে ঢেকে গেল প্রাচীরঘেরা নগর। জানালায় জানালায় আলো জ্বলে উঠল। টারজান আগেই ভেবে রেখেছিল, কিছুটা দূরে পূর্ব দিকের প্রাচীর যেখানে দ্রাক্ষালতায় ছেয়ে গেছে সেখান দিয়ে প্রাচীর টপকে নগরে ঢুকবে। জঙ্গল ও প্রাচীরের মাঝখানে প্রায় সিকি মাইলের ব্যবধান। নিচের খোলা জায়গাটা হিংস্র পশুর অবাধ চলাফেরা। তার ভিতর দিয়ে ছুটে গিয়ে দ্রাক্ষালতা বেয়ে প্রাচীরের উপর উঠতে হবে।
লোকগুলো যখন তার সঙ্গী দু’জনের উপর দিয়ে ছুটে এল তখন বার্থা কিরচার কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গুহার এক কোণে কুঁকড়ে সরে গেল। গুহার অন্ধকারে সে কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। কয়েকটা হাত এসে তাকে চেপে ধরল। তাকে টানতে টানতে গুহার বাইরে টেনে আনা হল। খাদের বালুময় পথে পা দিয়েই সে দেখতে পেল, কয়েকজন মিলে একটা লোককে প্রায় টানতে টানতে নিয়ে চলেছে। বুঝল, এ লোক স্মিথ-ওল্ডইউক ছাড়া অন্য কেউ নয়।
