অনভ্যস্ত বিমান-চালানোর কাজে ব্যস্ত থাকায় উসাঙ্গা টারজানকে দেখতে পায়নি; কিন্তু একদল কালা আদমির চোখের সামনে সে দ্রুতগতিতে ছুটে গেল বিমানটার দিকে। কাঁধ থেকে লম্বা ঘাসের দড়িটা তুলে নিয়ে তার ফাঁস-কল বসানো দিকটাকে সজোরে মাথার উপর ঘোরাতে লাগল।
ছুটন্ত লোকটির মাথার বিশ ফুট উঁচু দিয়ে বিমান তখন উড়ে চলেছে। দড়ির ফাঁস-কলটা বিমানের কাছে যেতেই ব্যাপারটা বুঝে নিয়ে বার্থা কিরচার দুই হাতে সেটাকে লুফে নিল। সঙ্গে সঙ্গে টারজনের পা দুটো মাটি থেকে উপরে উঠে গেল, আর তার ভারে বিমানটা বাঁ দিকে কাত হয়ে পড়ল। উসাঙ্গা বেপরোয়াভাবে চাকাটাকে ঘুরিয়ে দিতেই বিমানটা খাড়া হয়ে উপরে উঠে গেল। দড়ির অপর প্রান্ত ধরে টারজান ঝুলতে লাগল ঘড়ির পেণ্ডুলামের মত।
ইংরেজ যুবকটি চিৎ হয়ে পড়ে সব কিছুই দেখল। টারজনের দোদুল্যমান অবস্থা দেখে তার বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল। লম্বা গাছগুলোতে ধাক্কা খেয়ে লোকটির শরীর যে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে।
কিন্তু সে রকম কিছু ঘটল না। বিমানটি গাছের মাথা ছাড়িয়ে আরও উপরে উঠে গেল। ফঁস কলটাকে দুই হাতে চেপে ধরে মেয়েটি প্রাণপণ শক্তিতে অপর প্রান্তের ভারী দেহটাকে টেনে রেখেছে। আর টারজানও দড়ি বেয়ে একটু একটু করে বিমানের দিকে উঠে যাচ্ছে।
উসাঙ্গা কিন্তু এসব কিছুই জানতে পারেনি। সে বিমানটিকে উঁচুতে-আরও উঁচুতে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
এমন সময় এক হাতে বিমানটির একপাশ আঁকড়ে ধরে টারজান ভিতরে উঠে এল। এক পলকে উসাঙ্গার দিকে তাকিয়ে মেয়েটির কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, কখনও বিমান চালিয়েছ কি? মেয়েটি সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল।
ঐ লোকটাকে জাপটে ধরে তুমি ওর পাশে উঠে যেতে পারবে কি?
উসাঙ্গার দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় মেয়েটি বলল, পারব, কিন্তু আমার পা দুটো যে বাঁধা।
খাপ থেকে শিকারী-ছুরিটা টেনে বের করে টারজান মেয়েটির পায়ের বেড়ি কেটে দিল। পরমুহূর্তেই এক লাফে সে জায়গা করে নিল উসাঙ্গার পাশে। বেচারি কিছু বুঝবার আগেই ইস্পাত কঠিন আঙুল চেপে বসল তার গলায়। একটা বাদামী হাতে ঝলসে উঠল তীক্ষ্ণ ছুরি। কোমরের ফিতেটা দুই খণ্ড হয়ে গেল। পেশীবহুল দুটো হাতে তাকে তুলে ধরে নিচে ছুঁড়ে ফেলে দিল।
নিচে ভূমি-শয্যায় শুয়ে লেফটেন্যান্ট স্মিথ-ওল্ডইউক যখন দেখল যে একটা মানুষের দেহ সবেগে নিচে নেমে আসছে তখন আতংকে সে শিউরে উঠল। শূন্যে পাক খেতে খেতে এসে দেহটা মাটিতে ছিটকে পড়ে একেবারে তালগোল পাকিয়ে গেল।
বিমানটি স্বচ্ছন্দে নিচে নেমে এল। এক লাফে বিমান থেকে নেমে টারজান ছুটে গেল যুবক লেফটেন্যান্টটির কাছে। কালা যোদ্ধারা কেউ সেখানে নেই। অলৌকিক সব কাণ্ড-কারখানা দেখে সকলেই পালিয়েছে।
টারজান যুবকটির বাঁধন খুলে দিল। ততক্ষণে মেয়েটিও নেমে এসেছে। মুখে ধন্যবাদের কথা উচ্চারণ করতেই টারজান ইঙ্গিতে তাকে থামিয়ে দিয়ে যুবকটির দিকে ঘুরে বলল, এখনই যাত্রা কর। তোমরা কেউই জঙ্গলের লোক নও। তার মুখে ঈষৎ হাসি ফুটল।
স্মিথ-ওল্ডইউক বলল, আমাদের তো নয়ই, এই জঙ্গল কোন সাদা মানুষেরই বাসস্থান নয়। তুমিও কেন আমাদের সঙ্গে সভ্য জগতে ফিরে চল না।
টারজান মাথা নাড়ল। আমি জঙ্গলই ভালবাসি।
তাছাড়া তুমি যা বলতে চাইছ তা বুঝতে পেরেছি। কিন্তু তার দরকার হবে না। কি জান, জঙ্গলেই আমি জন্মেছি। সারাটা জীবন জঙ্গলেই কাটিয়েছি। জঙ্গলেই মরতে চাই। আর কোথাও বাঁচতে বা মরতে চাই না।
দু’জনেই মাথা নাড়তে লাগল। এই মানুষটিকে তারা বুঝতে পারে না।
টারজান বলল, চলে যাও। যত তাড়াতাড়ি যাবে, তত তাড়াতাড়ি নিরাপদ হবে।
দু’জন একসঙ্গে বিমানের দিকে গেল। স্মিথ-ওল্ডইউক টারজনের হাতটা টেনে ধরে দ্রুত পায়ে বিমানে উঠে গেল। হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বার্থা কিরচার বলল, বিদায়।
লেফটেন্যান্ট হারল্ড পার্সি স্মিথ-ওল্ডইউক চালিত ব্রিটিশ বিমানটা যখন বার্থা কিরচারকে সঙ্গে নিয়ে বহু বিপদসংকুল জঙ্গলের অনেক উপরে উঠে গেল তখন হঠাৎই মেয়েটির মন খারাপ হয়ে গেল। এমন একটা মানুষকে সে পিছনে ফেলে যাচ্ছে যার প্রতি তার মনের টানের বুঝি অন্ত নেই।
লেফটেন্যান্ট স্মিথ-ওল্ডইউক কিন্তু সপ্তম স্বর্গে। সে ফিরে পেয়েছে প্রিয় বিমানটিকে, দ্রত উড়ে চলেছে সহকর্মীদের কাছে, সঙ্গে ভাল-লাগা মেয়েটিও রয়েছে।
নিচে ঘন অরণ্য: সম্মুখে দূর-বিস্তার অনুর্বর মরুভূমি। একটা পাহাড়ের চূড়াকে পার হবার পরক্ষণেই তাদের পথ আটকে উড়ে এল শকুন স্কার। সবেগে এসে শকুনটা বিমানের উপর পড়তেই প্রপেলারের আঘাতে স্কার ছিন্নভিন্ন রক্তাক্ত নিষ্প্রাণ দেহটা পালকের মত ছিটকে পড়ল মাটিতে। একটা ভাঙ্গা টুকরো আঘাত করল চালকের কপালে। সে মূৰ্ছিত হয়ে পড়ে গেল। আর বিমানটা গোত্তা খেয়ে খাড়া ঝাঁপ দিল পৃথিবীর বুকে।
পাইলট মুহূর্তের জন্য জ্ঞান হারিয়েছিল; কিন্তু ক্ষতি যা হবার তার মধ্যেই হয়ে গেছে। জ্ঞান ফিরে আসতেই পাইলট বুঝতে পারল মোটরটা থেমে গেছে। বিমান সঞ্চারিত হয়েছে তীব্র গতিতে পৃথিবীর বুকে।
নিচে চোখে পড়ল একটা সংকীর্ণ গিরি-খাত। অনেকটা সমতল ও বালুকাময়। মুহূর্তের মধ্যে স্মিথ ওল্ডউইক মনস্থির করে ফেলল : ওই গিরি-খাতে অবতরণই অপেক্ষাকৃত নিরাপদ। তাই সে করল; অবশ্য তাতেও বিমানটির বেশ ক্ষতি হল, আর দু’জনে ঝাঁকি খেল প্রচণ্ড।
