স্মিথ-ওল্ডইউক নুমাবোর গ্রামে নিয়ে যাবার পরেই উসাঙ্গা বেরিয়ে পড়েছিল তার বিমানটার খোঁজে। কিন্তু সেটাকে খুঁজে পাবার পরে তার মনোভাব পাল্টে গেল। সেটাকে কাজে লাগাবার ধান্দা ঢুকল তার মাথায়। বিমানটির এটা-ওটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে একদিন তার মনে বাসনা জাগল-আহা, সে যদি যন্ত্রটাকে চালাতে পারত! গাছের মাথার অনেক উপর দিয়ে যদি পাখির মত উড়তে পারত!
কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও বিমানটাকে চালাতে পারল না। অবশ্য আশা ছাড়ল না। তখন ভাবল, সাদা চালকটি যখন নুমাবোর গ্রাম থেকে পালিয়েছে তখন একদিন না একদিন সে তার বিমানের খোঁজে আসবেই। তখন তার কাছ থেকেই সে বিমানে ওড়ার কৌশলটা জেনে নিতে পারবে। সেই আশায়ই সে যখন-তখন এসে বিমানটির চারদিকে ঘুরঘুর করে।
অবশেষে তার প্রতীক্ষার অবসান হল। উত্তর দিক থেকে মানুষের স্বর ভেসে আসতেই উসাঙ্গা দলবল নিয়ে ঘন গাছপালার আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। দেখা দিল বহু প্রত্যাশিত ব্রিটিশ অফিসারটি। সঙ্গে সেই সাদা মেয়েটি।
দুই যুবক-যুবতী জঙ্গল পেরিয়ে একটা খোলা জায়গায় পড়তেই তাদের চোখের সামনে দেখা দিল বহু-বাঞ্ছিত যন্ত্রটি। গভীর স্বস্তি ও আনন্দের উচ্ছ্বাস বেরিয়ে এল তাদের মুখ থেকে। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই উসাঙ্গা তার নিগ্রো যোদ্ধাদের নিয়ে ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে তাদের দুজনকে ঘিরে ফেলল।
দিনের পর দিন যায়। উসাঙ্গা একটু একটু করে বিমান চালানোর বিদ্যা আয়ত্ত করে। ক্রমে তার ধারণা হল যে সে একাই বিমান চালাতে পারবে।
সঙ্গে সঙ্গে আর একটা চিন্তা উসাঙ্গার মাথায় ঝিলিক দিয়ে উঠল। একবার যদি সে নিজে নিজে উড়তে পারে তাহলে আর তাকে পায় কে। সে সোজা উড়ে যাবে পাশের রাজ্যে। সেখানকার রাজা তাকে যন্ত্রটা থেকে নামতে দেখেই ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে তার কাছে আত্মসমর্পণ করবে। সেখানে সে রাজা হয়ে সিংহাসনে বসবে। পাশে থাকবে তার চব্বিশটি বৌ রাণীর সাজে সেজে। আর সকলের মধ্যমণি হয়ে পাটরাণী সেজে বসবে নবাগতা শ্বেতাঙ্গিনী।
আহ্লাদে উসাঙ্গা একেবারে আত্মহারা। ফন্দি-ফিরিক তৈরি করতেও বিলম্ব হল না।
সঙ্গে সঙ্গে বেশ কিছু কালা যোদ্ধা এসে স্মিথ-ওল্ডইউকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিল। সেই অবস্থায় সে দেখতে পেল, কিছু দূরে বার্থা কিরচারও হাত-পা বাঁধা অবস্থায় উসাঙ্গার পাশে দাঁড়িয়ে প্রচণ্ডভাবে মাথা নেড়ে কি যেন বলছে।
উসাঙ্গার হুকুমে কালা আদমিরা মেয়েটিকে বিমানে তুলে দিল। সেখানে তার হাতের বেড়ি খুলে দিয়ে আসনে বসিয়ে উসাঙ্গা তাকে পেটি দিয়ে ভাল করে বেঁধে দিল। তারপর নিজে বসল সামনের আসনে।
মেয়েটি মুখ ফিরিয়ে তাকাল ইংরেজ যুবকটির দিকে। চেঁচিয়ে বলল, বিদায়!
যুবকটি ভারী গলায় বলল, বিদায়! ঈশ্বর তোমার সহায় হোন!
উসাঙ্গা বোধ হয় বিমান-চালানোটা ভালই শিখেছে। একটা ধাক্কা খেয়ে বিমানটা মাটি ছাড়ল। বেশ ভালভাবেই উঠে গেল।
দু’দিন ধরে শিকার করে টারজান ফিরে এল।
কুটির ও তার চারদিকের বেড়া যেমন ছিল তেমনই আছে। কিন্তু ভিতরে জনমানবের চিহ্নও নেই। ভাল করে চারদিকটা খুঁকেই সে বুঝতে পারল, দু’দিই আগেই তারা চলে গেছে। বেরিয়ে যাবার জন্য পা বাড়াতেই ঘরে দেওয়ালে আঁটা এক টুকরো কাগজের উপর তার চোখ পড়ল। তাতে লেখা?
মিস্ কিরচার সম্পর্কে তুমি আমাকে যা বলেছ তারপরে এবং তুমি যে তাকে অপছন্দ কর সেটা বুঝতে পেরে আমার মনে হয়েছে যে আর বেশিদিন তোমার ঘাড়ে চেপে বসে থাকা তার বা তোমার কারও পক্ষেই উচিৎ হবে না। আমি জানি, আমাদের জন্যই তুমি তোমার লক্ষ্যস্থল পশ্চিম উপকূলের দিকে অগ্রসর হতে পারছ না। তাই একটা কোন সাদা মানুষদের বসতি খুঁজে বের করার চেষ্টায় আমরা দু’জনেই বেরিয়ে পড়লাম। যে স্নেহের আশ্রয় তুমি আমাদের দিয়েছিলে সে জন্য আমরা দুজনই তোমাকে ধন্যবাদ জানাই।
চিরকুটের নিচে লেফটেন্যান্ট হারল্ড, পার্সি স্মিথ-ওল্ডইউকের স্বাক্ষর।
টারজান কাঁধ ঝাঁকাল; চিরকুটটাকে দলা পাকিয়ে ছুঁড়ে দিল। একটা অজানা প্রেরণায় হঠাৎ ছুটতে শুরু করল। অনেক পথ পার হয়ে দক্ষিণ পথে কয়েক মাইল এগিয়ে হঠাৎ তার কানে একটা গুড়গুড় শব্দ এল। ভাল করে কান পেতে হঠাৎ সে বলে উঠল, একটা বিমানের শব্দ।
দ্রুতগতিতে ছুটতে ছুটতে সেই মাঠের প্রান্তে গিয়ে সে হাজির হল যেখানে মাটিতে নেমেছিল স্মিথ ওল্ডইউকের বিমান। দ্রুত দৃষ্টি চালিয়ে চারদিকে যা দেখতে পেলে তাতেই পরিস্থিতিটা বুঝতে পারলেও নিজের চোখকেই যেন সে বিশ্বাস করতে পারছিল না। হাত-পা বাঁধা অসহায় অবস্থায় মাটিতে পড়ে আছে ইংরেজ অফিসারটি। তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে জার্মান পক্ষত্যাগী একদল কালা আদমি। একটা বিমান। তার দিকেই এগিয়ে আসছে। বিমানের চালক কালা উসাঙ্গা, আর তার পিছনের আসনে সাদা মেয়ে বার্থা কিরচার। এই অশিক্ষিত বর্বর মানুষটা কেমন করে বিমান চালাবার কৌশল শিখল তা নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় তখন নেই। শুধু এইটুকু সে বুঝতে পারল যে কালা সার্জেন্ট উসাঙ্গা সাদা মেয়েটিকে নিয়ে পালাবার চেষ্টা করছে।
ততক্ষণে বিমানটা মাটি ছাড়বার উপক্রম করেছে। মুহূর্তের মধ্যেই ধরা-ছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে। মেয়েটিকে উদ্ধার করার একটি মাত্র উপায় আছে। কিন্তু সে চেষ্টায় বিফল হলে তার নিজের মৃত্যু অনিবার্য। তবু সেই পথটাই টারজান অনুসরণ করল।
