নুমাবোর হাতের বর্শা টারজনের বুক স্পর্শ করল। ফিনকি দিয়ে রক্তের ছোট ধারা গড়িয়ে পড়ল তার বাদামী বুক বেয়ে। সঙ্গে সঙ্গেই কৌতূহলী দর্শকদের পিছন দিকে ভেসে এল নারী-কণ্ঠের আর্ত চীৎকার আর বহুকণ্ঠের বীভৎস হুংকার ও গর্জন। গোলমালটা কিসের তা দু’জনের কেউই দেখতে পেল না। কিন্তু কিছু না দেখেই কেবল শব্দ শুনেই টারজান বুঝতে পারল ওটা কাদের গর্জন ও হুংকার।
কিন্তু সে ভেবেই পেল না কেমন করে গোরিলারা এখানে এল, আর তাদের এই আক্রমণের উদ্দেশ্যই বা কি। ওরা যে তাকেই উদ্ধার করতে এসেছে তা সে ভাবতেই পারল না।
যুবক গোরিলা জু-টাগ প্রচণ্ড দুই থাবার আছাড় মেরে, থাবড়ে কামড়ে, সমবেত জনতাকে ছিন্নভিন্ন করে এগিয়ে এল। পিছন পিছন ধেয়ে এল তার কদাকার দলবল। টারজান সবিস্ময়ে দেখল, তাদের চালিয়ে এনেছে বার্থা কিরচার।
সে চীৎকার করে বলল, জু-টাগ, আগে সর্দারের দলের উপর ঝাঁপিয়ে পড়। কিরচারকে বলল, তুমি আমার বাঁধন খুলে দাও। তাড়াতাড়ি।
বার্থা কিচারের চেষ্টায় নিজেকে মুক্ত করে টারজান বলল, এবার এই ইংরেজের বাঁধন খুলে দাও। সঙ্গে সঙ্গে সে ছুটে গেল জু-টাগের পাশে। নুমাবো ও তার দলের সঙ্গে তখন গোরিলা দলের তুমুল যুদ্ধ চলেছে। আর্তনাদ করতে করতে নিগ্রোরা পালিয়ে গিয়ে অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেল। নুমাবো অনেক চেষ্টা করেও তাদের ফেরাতে পারল না।
ততক্ষণে মেয়েটি ইংরেজ বৈমানিককে মুক্ত করে দিয়েছে। নিগ্রোদের পরিত্যক্ত বর্শা হাতে নিয়ে এবার তিন ইওরোপীয় মানুষ ও অবশিষ্ট গোরিলারা গ্রামের ফটক পার হয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
টারজান সম্পূর্ণ নির্বাক। তার পাশেই চলেছে গোরিলা জু-টাগ। পিছনে বাকি গোরিলারা। সকলের শেষে ফ্রলিন বার্থা কিরচার ও লেফটেন্যান্ট হারল্ড পার্সি স্মিথ-ওল্ডইউক।
হরিণ শিকার করে কাঁধে ঝুলিয়ে গাছের ডালে ডালে ফিরছিল টারজান। হঠাৎ থেমে নিচের বেড়া ঘেরা কুটিরের দিকে এগিয়ে চলা দুটি মনুষ্যমূর্তির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তাদের একজন যুবক- পরনে ব্রিটিশ রাজকীয় বিমান বাহিনীর শতছিন্ন ইউনিফর্ম; অপরজন যুবতী-পরনে একদা পরিচ্ছন্ন অশ্বারোহণ-পোশাকের এক শোচনীয় সংস্করণ।
ভাগ্যের খেয়ালে তিনটি ভিন্ন চরিত্রের মানুষ এক সঙ্গে বাঁধা পড়েছে। একজন প্রায় নগ্নদেহ বর্বর, একজন ইংরেজ অফিসার, অপর জন এক ঘৃণিত জার্মান গুপ্তচর। এই দুটি প্রাণীকে পূর্ব উপকূল পর্যন্ত পৌঁছে না দেয়া পর্যন্ত তাদের হাত থেকে টারজনের মুক্তি নেই। কিন্তু তা করতে হলে তাকে যে নিজের স্বপ্নের দেশ থেকে অনেক অনেক দূরে সরে যেতে হবে। অথচ না গিয়েও তো উপায় নেই। এই দুটি যুবক-যুবতী তার সাহায্য ছাড়া এত দূরের অজ্ঞাত পথ কিছুতেই পার হতে পারবে না।
শিকার নিয়ে তিনজন কুটিরে ফিরে গেল। টারজান হরিণটাকে কেটে টুকরো টুকরো করে কিছুটা। নিজের জন্য রেখে বাকিটা দু’জনকে দিয়ে বলল, তোমরা তো আবার রান্না না করে খেতে পার না। টারজনের ওসব বালাই নেই।
যুবকটি আগুন জ্বালিয়ে দিল। যুবতীটি মাংস রান্নার কাজে মন দিল।
একটু দূরে বসে স্মিথ-ওল্ডইউক টারজানকে বলল, আশ্চর্য মেয়ে! কি বল?
টারজান উত্তর দিল, ও জার্মান এবং গুপ্তচর।
কি বলছ তুমি?
ঠিকই বলছি। মেয়েটা জার্মান গুপ্তচর।
আমি বিশ্বাস করি না?
বিশ্বাস করো না? তোমার বিশ্বাসে আমার কি যায়-আসে। আমি ভাল করেই জানি সে জার্মান গুপ্তচর। তবু সে একটি নারী, তাই আমি তাকে শেষ করে দিতে পারিনি।
তরুণ লেফটেন্যান্ট বলে উঠল, হা ঈশ্বর! আমি যে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না। মেয়েটি এত মিষ্টি এত সাহসী, আর এত ভাল।
টারজান দুই কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, মেয়েটি সাহসী সে কথা ঠিক। কিন্তু আমি তাকে ঘৃণা করি। তোমারও উচিৎ তাকে ঘৃণা করা।
লেটেন্যান্ট হারল্ড পার্সি স্মিথ-ওল্ডইউক দুই হাতে মুখ ঢাকল। পরে বলল, ঈশ্বর আমাকে ক্ষমা করুন! আমি ওকে ঘৃণা করতে পারব না।
তীব্র ঘৃণার চোখে তার দিকে তাকিয়ে টারজান উঠে দাঁড়াল। বলল, টারজান আবার শিকারে যাচ্ছে। যে মাংস আছে তাতে তোমাদের দু’দিন চলে যাবে। ততক্ষণে সে ফিরে আসবে।
দু’জন একদৃষ্টিতে তার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। এক লাফে একটা গাছের ডাল ধরে সে ডালপালার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল।
কুটিরে বসে দু’জন তাদের ভবিষ্যৎ কর্তব্য সম্পর্কে আলোচনা করতে লাগল।
স্মিথ-ওল্ডইউক বলল, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একটা সাদা মানুষদের বস্তির সন্ধানে আমাদের বেরিয়ে পড়া উচিৎ।
বার্থা কিরচার বলল, কিন্তু সে ফিরে না আসা পর্যন্ত আমরা তো যেতে পারি না।
কিন্তু চলে যেতেই হবে, যুবকটি জোর দিয়ে বলল, সে চায় না যে আমরা এখানে থাকি। বিশেষ করে তুমি।
মেয়েটি বলল, আমাকে বল সে কি বলেছে। সব কথা জানবার অধিকার আমার আছে।
মেয়েটির চোখে চোখ রেখে স্মিথ-ওল্ডউইক বলল, সে বলেছে তোমাকে ঘৃণা করে। তুমি একটি নারী বলেই কেবল কর্তব্যবোধে সে তোমাকে সাহায্য করছে।
মেয়েটির মুখ ম্লান হয়ে গেল। পরক্ষণেই হয়ে উঠল রক্তিম। দৃঢ় গলায় বলল, এই মুহূর্তেই আমি যাবার জন্য প্রস্তুত। কিছুটা মাংস সঙ্গে নিতে হবে। আবার কতদিনে জুটবে কে জানে।
নদীর ভাটির পথে তারা দক্ষিণ দিকে এগিয়ে চলল। যুবকটি হাতে নিল টারজনের ছোট বর্শাটা। মেয়েটির হাতে একটা লাঠি মাত্র। বার্থার কথামত যাবার আগে যুবকটি একটা চিরকুটে টারজানকে ধন্যবাদ ও বিদায়-সম্ভাষণ জানিয়ে সেটাকে কুটিরের দেয়ালে সেঁটে দিল।
