তাই লেফটেন্যান্ট হারল্ড পার্সি স্মিথ-ওল্ডউইক বিমানপথে পশ্চিম দিকেই চলেছে- কোন হুম বাহিনী সেদিকে এসেছে কি না সে দিকেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখেছে। নিচে দূর বিস্তর ঘন অরণ্য। পাহাড়, উপত্যকা, মরুভূমি- সব মিলিয়ে চমৎকার প্রাকৃতিক দৃশ্য। কিন্তু জনমানুষের চিহ্নমাত্র নেই।
উড়ে চলতে চলতে বিকেল হয়ে এল। গাছপালার ভিতর দিয়ে একটা নদীর আঁকাবাঁকা গতিপথ চোখে পড়ায় সেখানেই রাতের মত তাঁবু খাটাবার সিদ্ধান্ত নিল। আর তখনই ইঞ্জিনটা থেমে গেল। কাজেই কাছের একটা খোলা মাঠের মধ্যে নেমে মোটরটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে গুণ গুণ করে একটা গানের সুর ভাঁজতে লাগল। পাশের জঙ্গলেই যে কোন বিপদ ওঁৎ পেতে থাকতে পারে তা সে। ভাবতেও পারেনি। বিশ জোড়া বর্বর চোখের দৃষ্টি যে আড়ালে থেকে তার উপর নজর রেখেছে তা সে। বুঝবে কেমন করে। ঠিক সেই মুহূর্তে ওয়ামাবো-সর্দার নুমাবো সঙ্গীদের নিয়ে হঠাৎ লাফিয়ে পড়ে তার দিকে ধেয়ে এল।
অসভ্য লোকগুলো চারিদিক থেকে তাকে ঘিরে বর্শাগুলোকে ঘুরিয়ে ধরে হাতল দিয়ে তাকে সমানে পেটাতে শুরু করল। আঘাতে-আঘাতে জর্জরিত হয়ে সে মাটিতে পড়ে গেল। সকলে তাকে ধরাধরি করে তুলে দুই হাতে পিছ-মোড়া করে বেঁধে ঠেলতে ঠেলতে জঙ্গলের দিকে নিয়ে চলল। অসহায় স্মিথ ওল্ডউইক বুঝতে পারল কোন অসভ্য রাজশক্তির খেয়ালখুশির উপরেই নির্ভর করছে তার জীবন-মরণ।
জঙ্গল পার হয়ে একটা খোলা জায়গায় পৌঁছে সে দেখতে পেল, দূরে একটা কুটিরের ভিতর থেকে এগিয়ে আসছে একদল নিগ্রো। তাদের পরনে জোড়াতালি দেয়া জার্মান ইউনিফর্ম। তাদের মধ্যে একটা গাট্টাগোট্টা লোকের গায়ে ছিল সার্জেন্টের পোশাক। ব্রিটিশ অফিসারটির উপর চোখ পড়তেই সে সোল্লাসে চীৎকার করে উঠল। অন্য সকলের কণ্ঠে উঠল তার প্রতিধ্বনি।
কালা সার্জেন্ট উসাঙ্গা সর্দার নুমাবোকে জিজ্ঞাসা করল, এই ইংরেজকে কোথায় পেলে? তার সঙ্গে কি আরও অনেকে আছে?
সর্দার বলল, ও তো আকাশ থেকে নেমেছে এমন একটা আজব বস্তুতে চড়ে যা পাখির মত আকাশে ওড়ে। তা দেখে প্রথমে আমরা ঘাবড়েই গিয়েছিলাম। পরে যখন বুঝলাম ওটা কোন জীবিত প্রাণী নয়। তখন সাহস করে এগিয়ে গেলাম, আর এই লোকটাকে ধরে ফেললাম।
উসাঙ্গা চোখ বড় বড় করে শুধাল, ও কি মেঘের ভিতর দিয়ে উড়ে এসেছিল?
উমোবা বলল, হ্যাঁ বস্তুটা দেখতে পাখির মত। এখনও জঙ্গলের ওপারেই পড়ে আছে, অবশ্য যদি এর মধ্যে উড়ে গিয়ে না থাকে।
উসাঙ্গা বলল, সে ভয় নেই; এই লোকটা না উঠলে সেটা উড়তে পারবে না। ওকে ধরে এনে খুব ভাল করেছ। এই ইংরেজগুলো খুব খারাপ সাদা আদমি।
তখন উমাবো ইংরেজ অফিসারটিকে ঠেলতে ঠেলতে গ্রামের একটা কুটিরে ঢুকিয়ে দিয়ে দু’জন সাহসী যোদ্ধাকে পাহারায় রেখে দিল।
জঙ্গলের ফাঁক-ফোকর সম্পর্কে অরণ্যরাজ টারজনের জ্ঞান প্রায় অলৌকিকতার পর্যায়ে পৌঁছে যায়। তবু তার সব বিচার-বিবেচনা নির্ভুল হতে পারে না। গাছের বেশ মোটা ডাল ধরে ঝুলতে ঝুলতেই সে চলছিল। এক সময়ে যে ডালটা ধরে সে ঝুল দিল সেটাও বেশ মজবুত ও তাজা। সে কেমন করে জানবে। যে বাকলের নিচে সে ডালটাকে পোকায় কেটে একেবারে ঝাঁঝরা করে রেখেছে।
তার দেহের ভারে হঠাৎ ডালটা সশব্দে ভেঙ্গ পড়ল। নিচে কোন মোটা ডাল ছিল না যে জাপটে ধরবে। হেট-মুণ্ড উৰ্দ্ধ-পদ হয়ে সে সপাটে ছিটকে পড়ল গ্রামের পথটার একেবারে মাঝখানে। ডাল ভাঙ্গার মড়মড় শব্দে ও পড়ন্ত দেহের ছরছরাৎ আওয়াজে চমকে ওঠে গ্রামবাসীরা। এসে দেখল, একটি প্রায় নগ্নদেহ সাদা মানুষ গাছ থেকে যেখানে পড়েছিল সেখানেই চুপচাপ পড়ে আছে। সর্দার নুমাবো। বলল, ওকে বেঁধে ফেল। আজ রাতে ভোজটা জমবে ভাল।
শক্ত করে টারজনের হাত-পা বেঁধে তাকে নিয়ে হাজির করল সেই কুটিরে যেখানে লেফটেন্যান্ট হারল্ড পার্সি স্মিথ-ওল্ডউইক আসন্ন মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করে আছে। তারও হাত-পা বাঁধা।
ধীরে ধীরে টারজনের জ্ঞান ফিরে এল। চোখ মেলে তাকাল। অনেক কষ্টে পাশ ফিরে উঠে বসল। সামনেই ইংরেজ যুবকটিকে পিছমোড়া করে বাঁধা অবস্থায় দেখে ম্লান-হেসে বলল, দেখছি আজ রাতে ওরা পেট ভরে খাবে।
যুবকটি বলল, তুমি কেমন করে ধরা পড়লে?
টারজান আক্ষেপের সুরে বলল, নিজের দোষে। আরে ভাই, ডালটা যে পোকায় খাওয়া তা কেমন করে জানব।
যুবক বলল, পালাবার কোন পথ কি নেই?
টারজান হেসে বলল, মরতে তোমার এত ভয় কেন? একদিন তো মরতে হবেই। আজ রাতে হোক, কাল রাতে হোক, আর এক বছর পরে হোক- তাতে তফাৎটা কি হবে?
যুবক বলল, এসব দার্শনিক কথাবার্তা শুনতেই ভাল গো দাদা, কিন্তু আমার ওতে সায় নেই। যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ। দেখাই যাক।
অরণ্যরাজ টারজান ও লেফটেন্যান্ট হারল্ড পার্সি স্মিথ-ওল্ডইউককে শক্ত করে বাঁধা হয়েছে। পাশাপাশি দুটো দণ্ডের সঙ্গে। ইংরেজ যুবকটি মুখ ঘুরিয়ে সঙ্গীর দিকে তাকাল। টারজান সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে ভয় বা ক্রোধের চিহ্নমাত্র নেই। পরিপূর্ণ উদাসীনতা।
যুবক লেফটেন্যান্ট ফিসফিস্ করে বলল, বিদায় গো দাদা।
টারজানও মুখ ফিরিয়ে হেসে বলল, বিদায়।
চারদিক থেকে তাদের দু’জনকে ঘিরে যোদ্ধারা গোল হয়ে এগিয়ে আসতে লাগল। কাছে আরও কাছে।
