লোকটি বলল, খুব ভাল কথা। এই তো বেশ মীমাংসা হয়ে গেল। তাহলে বাকি কথাটাও খোলসা হয়ে যাক। এখানকার কাজ শেষ করে আগামীকাল অথবা পরশু আমি শিবিরে ফিরে যাব। তুমি আমাদের সঙ্গে যাবে না। আমার একটি চাকর তোমার দেখাশুনা করবে-রান্না করবে, সব কাজ করে দেবে। কোন মেয়ের হেপা আমি পোহাতে পারব না। তুমি আমাকে ঘাটাবে না, আমিও তোমাকে ঘাটাব না। তোমার সঙ্গে কথাও বলব না।
সেটা আমারও কথা, মেয়েটি সায় দিল।
লোকটি আবার বলল, আর একটা কথা। সর্দার বোবোলোর দেশে আমার শিবির। আমার যদি একটা কিছু হয় তাহলে একটা লোককে সঙ্গে নিয়ে সেখানে চলে যেয়ো। সেখানে আমার অংশীদার তোমার দেখাশুনা করবে। শুধু আমার নাম করো, তাহলেই হবে।
বুড়ো টাইমার ও তার সঙ্গীরা সে রাতের মত সেখানেই তাঁবু খাটাল। সন্ধ্যার পরে নিজের তাবু থেকেই মেয়েটি দেখল, লোকটি আগুনের পাশে বসে পাইপ টানছে। হঠাৎ তার মনে এমন একটা নিরাপত্তার ভাব জাগল যা আফ্রিকায় ঢোকার পর থেকে কখনও অনুভব করে নি। তার মন বলল, একেবারে একা থাকার চাইতে একটি সাদা পাগলা মানুষও ভাল। কিন্তু লোকটি কি সত্যিই পাগল?
কী আশ্চর্য, ওদিকে বুড়ো টাইমারও মেয়েটির কথাই ভাবছে। পাইপের ধোঁয়ার মধ্যে ভেসে উঠছে তারই মুখ এক অপরূপা সুন্দরীর মুখ।
নিজের মনেই সে বলে উঠল, মলো যা! কেন যে মরতে ওর সঙ্গে দেখা হয়েছিল?
পরদিন সকালে উঠেই সে তাঁবু ছেড়ে চলে গেল। সঙ্গে নিল দুটো চাকর। একটা পুরনো রাইফেল দিয়ে অপর চাকরটিকে রেখে গেল মেয়েটির রক্ষী হিসেবে। সে যাবার আগেই মেয়েটি ঘুম থেকে উঠে এসে দাঁড়াল; কিন্তু তার দিকে না তাকিয়েই সে চলে গেল।
মনের ক্ষোভ চেপে রাখতে না পেরে মেয়েটি হিসৃহিস্ করে বলে উঠল, অসভ্য কোথাকার।
বুড়ো টাইমারের সারাটা দিন কঠোর পরিশ্রমে কেটে গেল। অনেক খুঁজেও একটা হাতির চিহ্ন মাত্রও দেখতে পেল না। এমন এটা আদিবাসীর দেখা পর্যন্ত পেল না যে হাতির দলের চলাফেরার হদিসটাও অন্তত দিতে পারে। অগত্যা ক্লান্ত, অবসন্ন দেহে সে আবার শিবিরেই ফিরে চলল।
দূর থেকে যখন খোলা জায়গাটা দেখতে পেল সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। প্রথমেই চোখে পড়ল মেয়েটির তাঁবু। তাঁবুর বাইরে কি যেন পড়ে আছে দেখেই তার শরীর ভয়ে ঠাণ্ডা হয়ে এল। দ্রুত ছুটে গেল সেইদিকে। চাকর দুটিও ছুটল তার পিছনে। মেয়েটির রক্ষী হিসেবে যাকে রেখে গিয়েছিল তার ভয়ংকরভাবে বিকৃত মৃতদেহটা সেখানে পড়ে আছে। নিষ্ঠুর নখরাঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়েছে তার দেহ।
সঙ্গীর দেহের উপর ঝুঁকে পড়ে নিগ্রো দুটি নিজেদের ভাষায় কি যেন বলল; তারপর বুড়ো টাইমারের দিকে ফিরে বলল, চিতা-মানুষরা এসেছিল বাওয়ানা।
বুড়ো টাইমার ভয়ে ভয়ে তাঁবুর দিকে পা বাড়াল। মেয়েটি তাঁবুর মধ্যে নেই। প্রথমেই তার মনে হল, গলা ছেড়ে তাকে ডাকবে। কিন্তু কেমন করে ডাকবে? তার নামটাই ত জানা হয় নি। পর মুহূর্তেই মনে হল, তাকে ডাকা বৃথা। সে যদিও বেঁচেও থাকে তাহলেও এতক্ষণে সে অনেক দূর চলে গেছে-রক্তপিপাসু শয়তানরা তাকে ধরে নিয়ে গেছে। যেমন করে হোক তাকে উদ্ধার করতেই হবে প্রতিশোধ নিতে হবে।
ওরান্ডোর ডাকে উটেঙ্গা সৈনিকদের কাছ থেকে ভাল করে সাড়া পাওয়া গেল না। যুদ্ধের নামে সকলেই নাচে; কিন্তু চিতা-মানুষদের গুপ্ত সংঘের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কথায় সকলেরই বুক কাঁপে। তাই দেখা গেল যুদ্ধ যাত্রার ডাক পড়লে শ’খানেক লোক এসে হাজির হল।
এদিকে আর এক বিপদ। মুজিমোকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সেই সঙ্গে নিয়ামওয়েগির আত্মাও উধাও হয়েছে। বড়ই অশুভ লক্ষণ। কিস্তু গ্রামের লুপিঙ্গুও যুদ্ধের বিপক্ষে। সুযোগ বুঝে সে ওরান্ডোকে শুধাল, তোমার মুজিমো তো চলে গেল। এখন কে আমাদের চিতা-মানুষদের গ্রামের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে?
ওরান্ডো প্রবল আপত্তি জানিয়ে বলল, সে আমাকে ছেড়ে যাবে তা আমি বিশ্বাস করি না।
বুঝি বা তার কথা রাখতেই কাছের একটা গাছের ডাল থেকে নেমে এল একটা দৈত্যাকার মূর্তি। সে মুজিমো। এক কাঁধে একটা মরা হরিণ, অন্য কাঁধে নিয়ামওয়েগির আত্মা।
ওরান্ডো শুধাল, কোথায় ছিলে মুজিমো? ওরা বলছিল, সোবিটো তোমাকে মেরে ফেলেছে।
কাঁধ ঝাঁকুনি দিয়ে মুজিমো বলল, শুধু মুখের কথায় মানুষ মরে না। সোবিটো তো কথার বস্তা।
একটি বুড়ো প্রশ্ন করল, তুমি কি সোবিটোকে মেরে ফেলেছ?
তাকে বাধা দিয়ে মুজিমো বলল, আমি শিকারে বেরিয়েছিলাম। তোমাদের খাদ্য ভাল নয়; আগুনে পুড়িয়ে তোমরা সব নষ্ট করে ফেল।
একটা গাছের নিচে বসে শিকারের শরীর থেকে খানিকটা মাংস কেটে নিয়ে সে খেতে শুরু করল। মাঝে মাঝে গলার মধ্যে গরু-গর্ শব্দ হচ্ছে। বেশ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে সৈনিকরা সভয়ে তাকে দেখতে লাগল।
খাওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়াল। শরীরের আড়মোড়া ভাঙল। তারপর বলল, মুজিমো প্রস্তুত। উটেঙ্গারা প্রস্তুত থাকলে এবার যাত্রা শুরু হোক।
তিন দিন ধরে চলল একটানা অভিযান। মুজিমো পথ-প্রদর্শক; ওরান্ডো নেতা। যত এগিয়ে যাচ্ছে, সৈনিকদের মনোবল ততই বাড়ছে। সকলেরই ঠাট্টা বিদ্রুপের ফলে লুপিঙ্গুও চুপচাপ পথ চলেছে।
চতুর্থ দিন সকালে মুজিমো জানাল, তারা চিতা-মানুষদের গ্রামের কাছাকাছি এসে পড়েছে। পরদিন সকালেই সে একা এগিয়ে গিয়ে সব কিছু ভাল করে দেখে আসবে।
