হঠাৎ টারজনের চোখ পড়ল মেয়েটির খোলা বুকের উপর। বিস্ময়ে ও ক্রোধে সে আঁতক উঠল। মেয়েটির সাদা বুকের উপর ঝুলছে একটা হীরক খচিত সোনার লকেট-যে লকেট তার প্রথম প্রণয় উপহার- যা তার সঙ্গিনীর বুক থেকে চুরি করেছিল হুন স্নাইডার। মেয়েটির হাত চেপে ধরে হারটা ছিনিয়ে নিয়ে ক্রুদ্ধ স্বরে বলল, এটা তুমি কোথায় পেয়েছ?
তা দিয়ে তোমার কি দরকার?
এটা আমার। বল কে তোমাকে এটা দিয়েছে, নইলে আবার তোমাকে নুমার মুখে ছুঁড়ে দেব। তুমি তো গুপ্তচর, আর গুপ্তচরের শাস্তি মৃত্যু।
মেয়েটি জবাব দিল, আমাকে ওটা দিয়েছে হাউটম্যান ফ্রিজ স্নাইডার।
টারজান গম্ভীর গলায় বলল, বুঝলাম। এবার হেডকোয়ার্টারে চল।
ঝোপ-ঝাড়ের ভিতর দিয়ে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে এক সময় কিরচার বলল, তুমি কি করে বুঝলে যে আমি গুপ্তচর?
টারজান বলল, তোমাকে প্রথম দেখেছিলাম জার্মান হেডকোয়ার্টারে, তারপর ব্রিটিশ শিবিরে।
বার্থা কিরচার পকেটের পিস্তলটা স্পর্শ করল। কোন মতেই সে ব্রিটিশ শিবিরে ফিরে যাবে না। তার জন্য দরকার হলে পিস্তলের আশ্রয়ই নেবে। পর মুহূর্তেই এক অন্ধ আবেগে পিস্তলটা বাগিয়ে ধরে তার কুঁদো দিয়ে সজোরে আঘাত হানল টারজনের মাথায়। টারজনের দেহটা ছিন্ন মুণ্ড ষাঁড়ের মত সেখানেই লুটিয়ে পড়ল।
টারজান ধীরে ধীরে চোখ মেলল। জঙ্গলের মধ্যে একটা সরু পথের উপর সে পড়ে আছে। ক্রমে সব কথাই মনে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিহিংসার আগুন জ্বলে উঠল তার চোখে। উইহেলস্টলে পৌঁছবার আগেই তাকে ধরতে হবে।
টারজান উঠে দাঁড়াল। বার্থা কিচারের পায়ের ছাপ অনুসরণ করে হাঁটতে শুরু করল।
টারজান যখন ছোট পার্বত্য শহর উইলহেলম্স্টলে পৌঁছল তখন রাত হয়েছে। সৈনিকরা চলাফেরা করছে। শহরটি সুরক্ষিত।
অতর্কিতে একটি জার্মান অফিসারের ঘাড়ে লাফিয়ে পড়ে গলা টিপে তাকে মেরে ফেলল। তারপর তাড়াতাড়ি তার পোশাকটা পরে নিজের ভোল পাল্টে নিল। এবার হোটেলটা খুঁজে বের করতে হবে। তার অনুমান মেয়েটিকে সেখানেই পাওয়া যাবে। তার সঙ্গেই পাওয়া যাবে হাউটম্যান ফ্রিজ স্নাইডারকে। আর সেখানেই পাবে তার মূল্যবান লকেটটা।
অনেক খুঁজে হোটেলটা পাওয়া গেল। একটা নিচু দোতলা বাড়ি। উপরে-নিচে আলো জ্বলছে। অনেক অফিসারের মেলা। লাফ দিয়ে সে উঠে গেল বারান্দার ছাদে। কোণের একটা ঘরের শার্সি নামানো। ভিতরে আলো জ্বলছে। কথাবার্তাও শোনা যাচ্ছে। টারজান দরজায় কান পাতল।
প্রথমে শুনেত পেল একটি নারী কণ্ঠ : আমার অভিজ্ঞান হিসেবে লকেটটা আমি নিয়ে এসেছি। জেনারেল ক্রাউটের সঙ্গে তোমার তো সেই রকমই কথা হয়েছিল। এবার কাগজপত্রগুলো আমাকে দিয়ে দাও, আমি চলে যাচ্ছি।
পুরুষটি নিচু গলায় কি বলল টারজান তা ধরতে পারল না। আবার নারীকণ্ঠ-তাতে ঘৃণা ও ভয়ের আভাষ।
এত স্পর্ধা ভাল নয় হাউম্যান স্নাইডার। আমাকে স্পর্শ করো না। হাত সরিয়ে নাও।
এবার অরণ্যরাজ টারজান দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল। দরজা খোলা ও বন্ধ হবার শব্দ শুনে স্নাইডার ঘুরে দাঁড়াল।
এভাবে এ ঘরে ঢোকার অর্থ কি লেফটেন্যান্ট? এখনই ঘর থেকে বেরিয়ে যাও।
টারজান দৃঢ়কণ্ঠে শুধাল, তুমিই হাউম্যান স্নাইডার?
তাতে তোমার কি? জেনারেল গর্জে উঠল।
আমি অরণ্যরাজ টারজান। এবার বুঝতে পারছ কেন আমি এঘরে ঢুকেছি।
কোটটাকে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে টারজান ট্রাউজারটাও খুলে ফেলল। এখন তার পরিধানে একটিমাত্র কটি-বস্ত্র। এবার মেয়েটি তাকে চিনতে পারল।
টারজান চীৎকার করে বলল, পিস্তলে হাত দিও না। মেয়েটির হাত সোজা নেমে গেল।
এবার এদিকে এস।
মেয়েটি এগিয়ে গেল। টারজান তার অস্ত্রটা তুলে নিয়ে জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল।
স্নাইডার ভয়ে-ভয়ে বলল, আমার কাছে কি চাও তুমি?
টারজান বলল, ওয়াজিরিদের দেশে একটা ছোট বাংলোতে যে অপকর্ম তুমি করে এসেছ তারই দামটা মিটিয়ে দিতে চাই।
এক লাফে এগিয়ে টারজান লোকটির গলা টিপে ধরে শিকারী-ছুরিটা টেনে বের করল। সেটাকে আমূল বসিয়ে দিল স্নাইডারের তলপেটে। ভয়ঙ্কর গলায় হিসহিসিয়ে বলল, এইভাবে তুমি হত্যা করেছিলে আমার সঙ্গিনীকে। এইভাবেই তুমিও মরবে।
মেয়েটির দিকে মুখ ফিরিয়ে হাতটা বাড়িয়ে টারজান বলল, আমার লকেটটা দাও।
মৃত অফিসারকে দেখিয়ে মেয়েটি বলল, ওর কাছে আছে। লকেটটা খুঁজে পেয়ে টারজান বলল, এবার কাগজপত্রগুলো দিয়ে দাও।
বিনা বাক্যব্যয়ে মেয়েটি ভাঁজ করা দলিলগুলো টারজনের হাতে তুলে দিল।
জানালার কাছে এগিয়ে গিয়ে শার্সিটা তুলে মুহূর্তের মধ্যে টারজান বাইরের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
ফ্রলিন বার্থা কিরচার অতি দ্রুত মেঝের উপর পড়ে থাকা মৃত দেহটার কাছে গিয়ে তার জামার ভিতরে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে একটা কাগজের বান্ডিল বের করে নিজের কোমরের মধ্যে ঢুকিয়ে নিল। তারপর জানালার কাছে গিয়ে সাহায্যের জন্য চীৎকার করতে লাগল।
রয়্যাল এয়ার সার্ভিসের লেফটেন্যান্ট হারল্ড পার্সি স্মিথ-ওল্ডইউক অনুসন্ধানে বেরিয়েছে। জার্মান পূর্ব আফ্রিকার ব্রিটিশ হেডকোয়ার্টারে একটা খবর এসেছে-বরং বলা যায় যে, একটা গুজব ছড়িয়েছে যে শত্রুপক্ষ সসৈন্যে এসে পশ্চিম উপকূলে নেমেছে এবং ঔপনিবেশিক বাহিনীকে জোরদার করতে অন্ধকার মহাদেশের ভিতরেও ঢুকে পড়েছে। এমনকি তারা দশ-বারো দিনের মত এগিয়েও গেছে।
