অসীম ধৈর্যের সঙ্গে টারজান জার্মানদের শেষ ঘাঁটিটা পার হয়ে গেল। বন্দীকে আগে আগে হাঁটতে বাধ্য করে সে তাকে ঠেলে নিয়ে চলল পশ্চিম দিকে।
বর্শার খোঁচায় খোঁচায় স্নাইডারের দেহ রক্তাক্ত হল। দীর্ঘ রাত এইভাবে কেটে গেল।
তৃতীয় দিন দুপুরে পাহাড় বেয়ে কিছুটা হেঁটে চূড়ায় উঠে একটা খাড়া খাদের সামনে দু’জন থামল। স্নাইডার নিচে তাকিয়ে দেখল, সংকীর্ণ খাদের অনেক নিচে নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আছে একটি মাত্র গাছ।
টারজান বলল, আমিই লর্ড গ্রেস্টোক। ওয়াজিরিদের দেশে আমার স্ত্রীকে তুমিই খুন করেছ। এবার বুঝতে পারছ কেন আমি তোমার খোঁজে এসেছি। নেমে যাও!
জার্মানটি নতজানু হয়ে বলে উঠল, তোমার স্ত্রীকে আমি খুন করিনি, দয়া কর। এ ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না।
নেমে যাও! টারজান বর্শা উঁচিয়ে হুকুম করল। স্নাইডার একটু একটু করে নামতে লাগল। পিছনে টারজান। এক ঠেলায় স্নাইডারকে নিচে ফেলে দিয়ে বলল, এবার ছুট পালাও।
ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে জার্মানটি গাছ লক্ষ্য করে ছুটল। প্রায় গাছটার কাছে পৌঁছে গেছে এমন সময় ভয়ঙ্কর গর্জন করে ক্ষুধার্ত সিংহটা খাদের মধ্যে লাফিয়ে লাগাও।
চূড়ায় উঠে টারজান একবার নিচে তাকাল। জার্মানটি আপ্রাণ চেষ্টায় গাছের একটা ডালকে আঁকড়ে ধরে আছে। তার নিচে নুমা অপেক্ষমান।
টারজান সূর্য কুড়ুর দিকে মুখ তুলল। তার প্রশস্ত বুকের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল একটা বন্য গোরিলার বিজয় হুংকার।
রাতের অন্ধকারে দুই বিবদমান পক্ষকেই পাশ কাটিয়ে টারজান হাজির হল অনেক দূরে ব্রিটিশ শিবিরে। কেউ তাকে দেখতে পেল না। তার উপস্থিতিটাও টের পেল না।
শত্রুপক্ষের দৃষ্টির আড়ালে সুবিধাজনক দূরত্বে গড়ে উঠেছে দ্বিতীয় রোডেশীয় বাহিনীর হেডকোয়ার্টার। একটা ফিল্ড-টেবিলের সামনে বসে আছে কর্নেল ক্যাপেল। সঙ্গে কয়েকজন অফিসার। মাথার উপর একটা বড় গাছ। টেবিলের উপর একটা লণ্ঠন জ্বলছে।
গাছের ডালে খসখস আওয়াজ হল। সঙ্গে সঙ্গে তাদের সামনে নেমে এল একটা কঠিন বাদামী দেহ। সকলেরই হাত পড়ল পিস্তলের উপর। তারা বিস্মিত। কে এই প্রায় নগ্নদেহ শ্বেতকায় মানুষটি!
একজন অফিসার বলল, কে হে তুমি মহাশয়?
অরণ্যরাজ টারজান, নবাগত জবাব দিল।
ও হো, গ্রেস্টোক! বলে মেজর সাহেব হাতটা বাড়িয়ে দিল।
টারজান হেসে কর্নেলের দিকে ফিরে বলল, তোমাদের আলোচনা কিছুটা শুনেছি। জার্মান শিবিরের পিছন থেকেই আমি আসছি। হয়তো তোমাদের কিছুটা সাহায্য করতে পারব।
কর্নেল প্রশ্ন করল, তুমি তাহলে আমাদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছ?
টারজান জবাব দিল, নিয়মিতভাবে নয়। আমি লড়ব আমার নিজের মত করে। সংক্ষেপে নিজের সব কথাই সে খুলে বলল।
একটু চুপ করে থেকে ক্যাপেল শুধাল, তুমি কার সঙ্গে এসেছ?
খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে টারজান বলল, আমি একাই এসেছি। আচ্ছা, এখনকার মত চলি। দ্বিতীয় রাতে আবার দেখা হবে।
টারজান মুচকি হেসে পা চালিয়ে দিল। কিছুদূর এগোতেই অফিসারের ভারী ওভারকোটে গা ঢেকে একটি ছোটখাট লোককে পাশ দিয়ে যেতে দেখল। কোটের কলার তোলা, আর সামরিক টুপিটা চোখ পর্যন্ত টেনে নামানো। কিন্তু টারজনের মনে হল, মুখটা তার চেনা। হয়তো লন্ডনের পরিচিত কোন অফিসার। টারজান এগিয়ে গেল।
পূর্ব আফ্রিকার ছোট ব্রিটিশ বাহিনীটি প্রাথমিক বিপর্যয়ের পরে এখন ধীরে ধীরে পায়ের নিচে মাটি ফিরে পাচ্ছে। জার্মান আক্রমণে ভাটা পড়েছে; হুনরা ক্রমেই পিছু হটে যাচ্ছে রেলপথ বরাবর টাঙ্গার দিকে।
প্রচণ্ড মার খাবার পরে জার্মানরা বাঁ দিককার ট্রেঞ্চগুলো ছেড়ে চলে গেছে, আর দ্বিতীয় রোডেশীয় রেজিমেন্ট সেগুলো দখল করে নিয়েছে।
তারপর বেশ কয়েক সপ্তাহ কেটে গেছে। আন্ডার লেফটেন্যান্ট ভন গসের মৃত্যু হয়েছে টারজনের হাতে। তারপর থেকে টারজনের আর কোন হদিস নেই। অনেকেই মনে করে জার্মানদের হাতে তার মৃত্যু ঘটেছে।
কিন্তু সেরকম কিছুই ঘটেনি। একটি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে সে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একটি জার্মান গুপ্তচরকে জীবিত অবস্থায় গ্রেপ্তার করে সে ব্রিটিশদের হাতে তুলে দিতে চায়। গুপ্তচর মেয়েটিকে সে প্রথম দেখেছে জার্মান জেনারেলের হেডেকোয়ার্টারে। তারপর দেখেছে ব্রিটিশ শিবিরে একজন ব্রিটিশ অফিসারের ছদ্মবেশে। তার সন্ধানই টারজান বার বার হানা দিয়েছে জার্মান হেডকোয়ার্টারে।
একদিন রাতে দেখা গেল সে ছুটে চলেছে ছোট্ট শৈলশহর উইলহেলস্টলের দিকে-জার্মান পূর্ব আফ্রিকা সরকারের সেটাই গ্রীষ্মবাস।
ফ্রলিন বার্থা কিরচার পথ হারিয়ে ফেলেছে। বিনা দানা-পানিতে তার ঘোড়াটা সারাদিন পথ চলেছে। রাত নেমে আসছে। কোন মতে কিছু শুকনো কাঠ-খড় যোগাড় করে একটা ধুনি জ্বালাল। পাশেই বড় বড় ঘাসে ঢাকা খানিকটা জমি দেখতে পেয়ে সেখানে ঘোড়াটাকে ঘাস খেতে দিল। আর নিজে একটা বিছানার মত তৈরি করে ধুনির পাশে শুয়ে পড়ল।
সেই রাতেই অরণ্যরাজ টারজনের সঙ্গে তার দেখা হয়ে গেল। টারজানই তাকে রক্ষা করল সিংহ নুমার হাত থেকে।
একটু সুস্থ বোধ করে সে বলল, মৃত্যুর একেবারে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমি কেমন যেন বিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম। এখন ভাল বোধ করছি। তোমাকে কি বলে যে ধন্যবাদ দেব।
মেয়েটির একেবারে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এতক্ষণে সে তাকে ভালভাবে দেখার সুযোগ পেল। মেয়েটি খুব সুন্দরী। কিন্তু তাতে টারজনের মন গলল না। সে যে একজন জার্মান-জার্মান গুপ্তচর।
