খুশি মনেই সকলে এগিয়ে চলল লর্ড গ্রেস্টোক জন ক্লেটনের ছিমছাম গোলাবাড়িটা লক্ষ্য করে। কিন্তু হায় কপাল! টারজান বা তার ছেলে কেউ বাড়িতে নেই।
ব্রিটেন ও জার্মানির যুদ্ধের কোন খবরই লেডী জেন রাখে না। কাজেই সে অফিসারদের সাদরে গ্রহণ করল।
সুদূর পূর্বাঞ্চলে অরণ্যরাজ টারজনের দ্রুতপায়ে নাইরোবি থেকে ফিরছে তার গোলাবাড়ির দিকে। নাইরোবিতেই সে বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবার খবর পেয়েছে। জার্মানরা যে কোন সময় ব্রিটিশ পূর্ব আফ্রিকা আক্রমণ করতে পারে এই আশংকা করে স্ত্রীকে কোন নিরাপদ অঞ্চলে সরিয়ে নিতেই সে বাড়ির দিকে ছুটে চলেছে। সঙ্গে জনাবিশেক কালো যোদ্ধা।
দূর থেকে গোলাবাড়ির উপর নজর পড়তেই টারজনের চোখ দুটি কুঁচকে গেল। গোলাটার চিহ্ন মাত্র নেই; সেখান থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলি পাকিয়ে পাকিয়ে উঠছে।
বাড়িতে ঢুকেই টারজান আতংকে শিউরে উঠল। শোবার ঘরের দেওয়ালে ক্রুশবিদ্ধ করে মারা হয়েছে প্রভুবক্ত মুভিরোর দৈত্যসদৃশ পুত্র ওয়াসিষুকে। এক বছরের বেশি কাল ধরে সে ছিল লেডী জেনের দেহরক্ষী।
ঘরের আসবাবপত্র ইতস্তত ছড়ানো। মেঝেতে চাপ চাপ জমাট রক্ত। সব কিছুতেই এক ভয়ঙ্কর যুদ্ধের স্বাক্ষর।
ঘরের দরজা বন্ধ। নতমুখে বিবর্ণ চোখে টারজান নীরবে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। ঘরের এক পাশে ছোট কোচটায় মুখ থুবড়ে পড়ে আছে একটি নিষ্প্রাণ দেহ। দেহটা এমনভাবে পুড়ে গেছে যে টারজান তাকে চিনতে পারল না। মৃতদেহকে উল্টে ধরতেই মৃত্যুর সেই ভয়ঙ্কর রূপ দেখে শোকে, আতংকে ও ঘৃণায় সে আর্তনাদ করে উঠল।
টারজনের বুকের মধ্যে বোবা জানোয়ারের অসহ্য যন্ত্রণা। তার মস্তিষ্ক জুড়ে শুধু একটিই অব্যক্ত বাণী ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হল : সে নেই! সে নেই! সে নেই!
টারজান পথে নামল।
দু’দিন পরে কিলিমাঞ্জারের দক্ষিণ সানুদেশ থেকে বহুদূর পূর্বে কামানের শব্দ শুনতে পেল। বুঝতে পারল, সেখানে জার্মানদের সঙ্গে ইংরেজদের যুদ্ধ বেঁধেছে। সারাদিন ভেসে এল গুলি-গোলার শব্দ। টারজান লক্ষ্য করল, গুলি-গোলা সবচাইতে বেশি চলে ভোরে আর সন্ধ্যার দিকে; রাতে প্রায় থাকেই না সে শব্দ।
সন্ধ্যা নাগাদ সে পৌঁছে গেল পর্বতমালার সানুদেশে একটা বড় গুপ্ত ঘাঁটিতে। সন্ধ্যার অন্ধকারে লুকিয়ে একটা তাবুর কাছে পৌঁছতে টারজনের কানে এল একজন বলছে : ওয়াজিরিরা দানোবের মতই লড়াই করল; কিন্তু আমাদের বাঘা-বাঘা যোদ্ধারা তাদের একেবারে কচুকাটা করে ফেলল। শেষ পর্যন্ত ক্যাপ্টেন এসে মেয়েটাকে খতম করল।
টারজান তখন শিকারী জানোয়ারের মত ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গেল তাঁবুটার আরও কাছে। কথা শেষ করে সৈনিকটা উঠে দাঁড়িয়ে সকলকে কি যেন বলে শিবিরের পিছন দিকে এগিয়ে চলল। শিকারী চিতার মত টারজান নিঃশব্দে একটা ঝোপের ছায়ায় পৌঁছেই সে লাফিয়ে পড়ল। লোকটার ঘাড়ে।
তারপর টানতে টানতে তাকে একটা ঝোপের মধ্যে নিয়ে গিয়ে টারজান ফিসফিসিয়ে বলল, যে অফিসার বাংলোতে মেয়েটিকে খুন করেছে তার নাম কি?
লোকটি মুহূর্তমাত্ৰ ইতস্তত করে জবাব দিল, হাউটম্যান স্নাইডার।
সে কোথায়?
এখানেই আছে। হয়তো হেডকোয়ার্টারে গেছে।
টারজান আদেশ করল, আমাকে সেখানে নিয়ে চল।
ঝোপের আড়ালে বেশ কিছুটা এগিয়ে দূরে একটা দোতলা বাড়ি দেখিয়ে লোকটি বলল, ওটাই হেডকোয়ার্টার।
টারজান বলল, ওয়াজিরি ওয়াসিমুকে ক্রুশাবদ্ধ করার কাজে কে হুকুম দিয়েছিল?
আন্ডার লেফটেন্যান্ট ভন গস! সেও এখানে আছে।
টারজান দৃঢ়কণ্ঠে বলল, তাকে আমি খুঁজে পাবই।
আর একটি কথাও না বলে টারজান আবার তার গলা ধরে টেনে তুলল। দুই হাতে তাকে মাথার উপরে তুলে ধরে এক, দুই, তিন পাক ঘুরিয়ে সবেগে তাকে ছুঁড়ে দিল। তারপর এগিয়ে গেল জেনারেল ক্রাউটের হেডকোয়ার্টারের দিকে।
জানালা দিয়ে টারজনের চোখে পড়ল, সামনে একটা বড় ঘর- সেখানে বেশ কয়েকজন অফিসারের জটলা; পিছনের ছোট ঘরটায় টেবিলের পিছনে বসে আছে একটা লাল-মুখো লোক। একজন এড়-ডি ঘরে ঢুকে স্যালুট করে জানাল, ফ্রলিন কিরচার এসে গেছে স্যার।
ভিতরে আসতে বলল, জেনারেল হুকুম করল।
ফ্রলিন ঘরে ঢুকল। মেয়েটি খুব সুন্দরী। উনিশের বেশি বয়স হবে না।
জেনারেলের টেবিলের কাছে গিয়ে কোটের ভিতরের পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করে তার হাতে দিল।
জেনারেল বলল, বস ফ্রলিন। একজন অফিসার একটা চেয়ার এনে দিল। জেনারেল কাগজটা খুলে পড়তে লাগল।
ঘরের সবগুলো লোকের উপর চোখ বুলিয়ে নিল টারজান। দুই ক্যাপ্টেনের একজন তো হাউটম্যান স্নাইডার হতে পারে। মেয়েটি নিশ্চয় গোয়েন্দা বিভাগের লোক-গুপ্তচর।
জেনারেল মুখ তুলে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল, খুব ভাল। এ-ডিকে বলল, মেজর স্নাইডারকে ডেকে পাঠাও।
এড-ডি ফিরে এল। সঙ্গে মাঝারি আকারের একজন অফিসার। জেনারেল ঘাড় কাত করে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল, ফ্রলিন কিরচার, ইনি মেজর স্নাইডার।
বাকিটা শোনার ধৈর্য হল না। জানালার গোবরাটে একটা হাত রেখে এক লাফে টারজান ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল। কাইজারের অফিসাররা তো হতভম্ব। আর এক লাফে টেবিলের কাছে পৌঁছে এক ঘুষিতে টারজান টেবিল-ল্যাম্পটাকে ছিটকে ফেলে দিল জেনারেলের মোটা খুঁড়ির উপর। দুই এ-ডি ধেয়ে গেল টারজনের দিকে সেও পাল্টা একজনকে তুলে ধরে ছুঁড়ে দিল অপর এড়-ডির মুখের উপর। মেয়েটি চেয়ার থেকে লাফ দিয়ে দেয়ালের গায়ে সেঁটে দাঁড়িয়ে পড়ল। অন্য অফিসাররা সাহায্যের জন্য চেঁচামেচি শুরু করে দিল। মুহূর্তের মধ্যে মেজর স্নাইডারকে ধরে মাথার উপর তুলে এত দ্রুত জানালা দিয়ে বেরিয়ে গেল যে উপস্থিত কেউ ব্যাপারটা বুঝতেই পারল না।
