তারপর টারজানকে সশরীরে দেখতে পেয়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন তিনি। তিনি বুঝতে পারলেন না তার মাথা ঠিক আছে কি না। কারণ অনেক আগেই জেনের বনদেবতা টারজনের মৃত্যু সংবাদ শুনেছেন।
ক্লেটনের মৃত্যু সংবাদ শুনে সত্যিই দুঃখে অভিভূত হয়ে পড়লেন অধ্যাপক পোর্টার। তিনি বললেন, মঁসিয়ে থুরান অনেকদিন আগেই খবরটা দিয়েছিল আমাদের।
টারজান বলল, থুরান কোথায়?
অধ্যাপক বললেন, কেবিনে। সে-ই ত আমাদের কেবিনে নিয়ে যায়। সে তোমাদের দেখে খুব খুশি হবে।
টারজান বলল, চরম বিস্মিতও হবে।
এবার ওরা কেবিনের দিকে এগিয়ে গেল সবাই মিলে। কেবিনে তখন অনেক লোক আনাগোনা করছে। টারজান সেখানে গিয়েই প্রথমে দার্ণকে দেখে আশ্চর্য হয়ে বলল, পল, একি তুমি এখানে কি করছ?
দার্ণৎ বুঝিয়ে বলল, কিভাবে এই উপকূলভাগের পাশ দিয়ে যেতে যেতে কেবিনটা দেখে নেমে পড়ে। কেবিনটাকে দেখার বড় ইচ্ছা হয় তার।
জেন টারজানকে এক সময় বলল, মঁসিয়ে থুরান যাকে রোকোফ বলছ, মিস্টার টেনিংটনের সঙ্গে সে বেড়াতে গেছে, তোমাকে দেখে সে দারুণ বিস্মিত হবে।
টারজান দাঁতে দাঁত চেপে বলল, কিন্তু তার বিস্ময়টা বড়ই ক্ষণস্থায়ী হবে।
তার এই কণ্ঠস্বর শুনে ভয় পেয়ে গেল জেন। বলল, জঙ্গলের নিয়ম আর সভ্য জগতের নিয়মকানুন। এক নয় প্রিয়তম। ওকে তুমি নিজে না মেরে ক্যাপ্টেন দাফ্রেনের হাতে তুলে দাও। আইনে ওর যা শাস্তি হয় হবে। তুমি নিজের হাতে ওকে মারলে সবাই তোমাকে দোষ দেবে, গ্রেফতার করতে বলবে। আমি তোমাকে আর হারাতে পারব না।
জেনের কথাটা মেনে নিল টারজান। এমন সময় জঙ্গল থেকে টেনিংটন আর থুরান নামধারী রোকোফ বেড়াতে বেড়াতে ফিরছিল কেবিনের দিকে। টারজানকে প্রথম টেনিংটন দেখল। টারজনের চোখে চোখ পড়তেই রোকোফের মুখটা ভয়ে সাদা হয়ে গেল।
টেনিংটন কিছু বুঝতে পারার আগেই রোকোফ তার বন্দুকটা উঁচিয়ে ধরে টারজানকে লক্ষ্য করে একটা গুলি করল। তার হাতটা টলতে থাকায় গুলিটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে টারজনের মাথার উপর দিয়ে চলে গেল। দ্বিতীয়বার গুলি করার জন্য রোকোফ প্রস্তুত হতেই টারজান এসে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তার। বন্দুকটা ছিনিয়ে নিল।
গুলির আওয়াজ শুনে কেবিন থেকে সবাই বেরিয়ে এল। টারজান নীরবে ক্যাপ্টেন দাফ্রেনের হাতে, রোকোফকে সমর্পণ করল। রোকোফের সব কথা আগেই ক্যাপ্টেনকে বলে রেখেছিল।
জেন এবার জাহাজ মালিক লর্ড টেনিংটনের সঙ্গে টারজনের পরিচয় করিয়ে দিল। টারজানই লর্ড গ্রেস্টোক একথা শুনে বিস্ময়ে অবাক হয়ে গেল লর্ড টেনিংটন। দার্ণৎ তাকে টারজনের পূর্বজীবনের সব। কথা বুঝিয়ে বলল।
বিকেলের দিকে কেবিনের পাশে টারজনের বাবা জন ক্লেটনের সমাধির কাছে ক্লেটনকে সমাহিত করা হলো।
তারপর টারজান ক্যাপ্টেন দাফ্রেনকে দিনকতক অপেক্ষা করার জন্য অনুরোধ করল। বলল, দূর বনের ভিতরে তার কিছু জিনিসপত্র আছে। সেগুলো সে ওয়াজিরিদের সাহায্যে নিয়ে আসবে।
এই বলে তখনি চলে গিয়ে পরদিন বিকালেই এসে পড়ল টারজান। ওয়াজিরিদের সাহায্যে সোনার তালগুলো সব মটির তলা থেকে নিয়ে এসে জাহাজে তুলে দিল। খাঁটি সোনার তালগুলো দেখে সবাই অবাক হয়ে গেল। কিন্তু কোথা থেকে কি করে পেয়েছে তা কাউকে বলল না টারজান।
পরদিনই জাহাজ ছাড়ার কথা ছিল। দার্ণত্রা যে জাহাজে করে এসেছিল সেই সামরিক জাহাজে করেই ওরা সবাই আপাতত ফ্রান্সে যাবে।
কিন্তু তার আগে টারজান জেনকে এক সময় বলল, আমার বড় ইচ্ছা, কেবিনেই আমাদের বিয়েটা অনুষ্ঠিত হোক। এই কেবিনেই আমার জন্ম হয়, এখানেই আমার বাবা মা দুজনেই মারা যান। এখানেই আমার কৈশোর আর যৌবনের অনেকখানি কেটেছে। এটাই আমার বাড়ি।
জেন বলল, খুব ভাল হবে।
একথা শুনে সকলেই একবাক্যে সমর্থন করল তাদের।
টারজনের সঙ্গে জেনের বিয়েটা হয়ে যাবার পর টেনিংটনের একান্ত ইচ্ছানুসারে হেজেলের সঙ্গে তার বিয়েটাও হয়ে গেল। অবশেষে প্রস্থান সময় উপস্থিত হলো। নব দম্পতিদের ও আর সকলকে নিয়ে জাহাজ ছেড়ে দিল। ওয়াজিরিরা কূলে দাঁড়িয়ে বর্শাধরা হাত নাড়িয়ে তাদের মালিক দম্পতিকে বিদায় দিল। টারজানও জেনকে পাশে নিয়ে জাহাজের ডেকের উপর দাঁড়িয়ে তার বিশ্বস্ত ওয়াজিরি বন্ধু ও সহচরদের হাত নেড়ে বিদায় জানাল।
দুর্দমনীয় টারজান (টারজান দি আনটে্মড)
হাউটম্যান ফ্রিজ স্নাইডার ক্লান্ত পায়ে হেঁটে চলেছে অন্ধকার অরণ্যের গা ঘেঁষে। লেফটেন্যান্ট হাঁটছে তার পাশাপাশি, আর আন্ডার লেফটেন্যান্ট ভন গস জনাকয়েক মাত্র আস্কারিকে সঙ্গে নিয়ে ক্লান্ত তল্পিবাহকদের পিছন পিছন হাঁটছে।
হাউটম্যানের সামনে দলের অর্ধেক লোক, আর বাকি অর্ধেক তার পিছনে-এইভাবেই অসভ্য মানুষদের বাসভূমি এই জঙ্গলে জার্মান ক্যাপ্টেনটি তার বিপদকে যথাসম্ভব কমিয়ে নিয়েছে।
কিন্তু গাইড দু’জন পুরো দলটাকে ভুল পথে নিয়ে চলেছে। আফ্রিকার অধিকাংশ গাইডরা তাই করে থাকে।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই অপ্রত্যাশিতভাবে একটি দৃশ্য তাদের চোখের সামনে ফুটে উঠল। খুশির হাসি হেসে ফিল্ড-গ্লাসটা চোখে লাগিয়ে সে দূরে তাকাল। বলল, আমাদের কপাল ভাল। দেখতে পাচ্ছ?
লেফটেন্যান্ট ও তার গ্লাস চোকে লাগিয়ে বলল, হ্যাঁ, একটা ইংরেজ গোলাবাড়ি। ওরা নিশ্চয় গ্রেস্টোকের গোলাবাড়ি, কারণ ব্রিটিশ পূর্ব আফ্রিকার এই অঞ্চলে আর কোন গোলাবাড়ি নেই।
