টারজান বলল, মঁসিয়ে থুরানই আমাকে অতর্কিতে জলে ফেলে দিয়েছিল। পরে তোমাকে সব কথা। বলব।
জেন এবার পায়ের উপর ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল। বলল, এখনো আমি বিশ্বাস করতে পারছি না, জাহাজ ডুবির পর থেকে ক’মাস ধরে এত কষ্ট পাবার পর আর এত সুখ ভোগ করব। আমার মনে হচ্ছে আমি স্বপ্ন দেখছি।
জেন বলল, এখন কোথায় যাবে, কি করবে?
টারজান বলল, বল কোথায় যেতে চাও তুমি?
হঠাৎ ক্লেটনের কথা মনে পড়ে যাওয়ায় টারজান বলল, তোমার স্বামী কোথায়? তার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম।
জেন বলল, ক্লেটনকে স্পষ্ট তোমার প্রতি আমার ভালবাসার কথা জানিয়ে দিই। আমি তাকে বিয়ে করতে পারব না।
এবার টারজনের মুখপানে তাকিয়ে জেন বলল, টারজান, তুমিই নিশ্চয় সেদিন সেই বর্শাটা ছুঁড়ে আমাদের প্রাণ বাঁচাও।
লজ্জায় মুখটা নামাল টারজান।
জেন বলল, কেমন করে তুমি আমাকে ফেলে পালালে?
টারজান বলল, ঈর্ষাজনিত এক রাগে ফেটে পড়ে আমি তখন চলে এসেছিলাম।
তারপর টারজান কিভাবে সমুদ্র থেকে ওয়াজিরিদের সঙ্গে মেশে এবং বাঁদর-গোরিলাদের দলে যোগ দেয় সে সব কথা একে একে বলল। ফ্রান্সে সে কি করেছিল তাও সব খুলে বলল।
জেন বলল, আমি থুরানের কথা বিশ্বাস করিনি। ওঃ, লোকটা কি ভয়ঙ্কর!
একদিন টারজান গাছের উপর থেকে তাদের দিকে অগ্রসরমান একদল মানুষের গন্ধ পেল বাতাসে। লোকগুলো কাছে এলে টারজান দেখল তারা তারই দলের লোক আর তাদের সঙ্গে বাসুলি রয়েছে। তাদের দেখে তাদের সামনে জেনকে নিয়ে নেমে পড়ল। বাসুলিরা তাদের নেতা টারজানকে ফিরে পেয়ে আনন্দে নাচতে লাগল। জেনকে তার সঙ্গে দেখে তার কথা বাসুলি জিজ্ঞাসা করায় টারজান বলল, এর সঙ্গে আমার বিয়ে হবে।
তখন জেনকে ঘিরেও ওরা নাচতে লাগল। তারপর তার দলের ওয়াজিরিদের সঙ্গে নিয়ে টারজান। জেনরা যেখানে থাকত সেই মাচাটায় গিয়ে হাজির হল।
টারজন দেখল ক্লেটনের অবস্থা সত্যিই খুব খারাপ। তার দেহটা বিছানায় মিশে গেছে। চোখগুলো কোটরে ঢুকে গেছে। বাসুলিকে নদী থেকে জল আনতে বলল। ক্লেটনের অবস্থা দেখে জেনের চোখে জল এল। টারজান বলল, আমাদের আসতে বড় দেরী হয়ে গেছে। যাই হোক দেখি কি করতে পারি।
বাসুলি জল নিয়ে এলে সেই জল ক্লেটনের চোখে মুখে ও কপালে দিয়ে কিছুটা জল তার মুখের ভিতরে ঢেলে দিল। ক্লেটন এবার চোখ মেলে তাকিয়ে টারজানকে দেখতে পেয়ে কিছুটা আশ্বস্ত হলো। টারজান বলল, আর ভয় নেই। আমরা তোমাকে আবার ভাল করে তুলব।
ক্লেটন বলল, আর আমি ভাল হব না। আমি মারা যাব। তবু তোমরা এসেছ ভালই হয়েছে।
জেন জিজ্ঞাসা করল, থুরান কোথায়?
ক্লেটন বলল, শয়তানটা আমাকে একা ফেলে চলে গেছে। প্রবল জ্বরের ঘোরে তার কাছে আমি একটু পিপাসার জল চেয়েছিলাম। কিন্তু সে আমার সামনে নিজে জল খেয়ে বাকি জলটা ফেলে দেয়।
সহসা উত্তেজনার বশে কনুই-এর উপর ভর দিয়ে উঠে বসল একবার ক্লেটন। বলল, হ্যাঁ বাঁচব। তাকে মেরে তবে মরব।
টারজান বলল, তার জন্য তোমার ভাবতে হবে না। আমি তার সঙ্গে বোঝাপড়া করব।
ক্লেটন আবার বিছানায় ঢলে পড়ল।
সন্ধ্যার দিকে ক্লেটন জেনকে ডেকে বলল, আমি তোমাদের উপর অবিচার করেছি জেন। তোমার প্রতি আমার ভালবাসার খাতিরে আমার অন্যায় আশা করি ক্ষমা করবে তুমি। যে কথা অনেক আগে তোমায় বলা উচিৎ ছিল আমার সে কথা একটি বছর ধরে বলিনি তোমায়।
এই বলে সে তার কোটের পকেট থেকে একটুকরো কাগজ বার করে জেনের হাতে দিল। তার খুব শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। জেন তার মাথাটা তার হাতের উপর তুলে নিল। কিন্তু মাথাটা ঢলে পড়ল, তার দেহটা শক্ত ও স্থির হয়ে গেল।
ক্লেটনের মৃতদেহটার দুপাশে দু’জনে নতজানু হয়ে কিছুক্ষণ প্রার্থনা করল। তারপর দুজনেই উঠে দাঁড়াল। টারজনের চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছিল। চোখে জল নিয়েই জেন কাগজটা খুলে দেখল সেটা একটা টেলিগ্রাম। দার্ণ সেটা ফ্রান্স থেকে টারজানকে পাঠিয়েছিল। তাতে লেখা আছে, তোমার আঙ্গুলের ছাপগুলো এই কথাই প্রমাণ করে যে তুমিই লর্ড গ্রেস্টোক।- ইতি দার্ণ
কাগজটা টারজনের হাতে দিয়ে জেন বলল, কথাটা সে জানলেও তোমাকে বলেনি?
টারজান বলল, আমি একথা জানতাম জেন। ইউসকনসিনের স্টেশনেই আমি এই টেলিগ্রামটা পাই। আমি সেখানেই এটা ফেলে এসেছিলাম। পরে ক্লেটন এটা পায়।
জেন বলল, কিন্তু এটা জানার পর তুমি আমাদের বলেছিলে, এক বাঁদর-গোরিলা তোমার মা আর তুমি তোমার বাবা কে জান না।
টারজান বলল, বলেছিলাম কারণ তোমাকে ছাড়া পদমর্যাদা ও ভূ-সম্পত্তির কোন প্রয়োজন অনুভব করিনি আমি।
পরদিন সকালে তার কেবিনের পথে যাত্র শুরু করল টারজান। চারজন ওয়াজিরি ক্লেটনের মৃত দেহটাকে বয়ে নিয়ে যেতে লাগল। টারজনের ইচ্ছা কেবিনের ধারে তার পিতার সমাহিত কঙ্কালের পাশে ক্লেটনকে সমাহিত করা হবে।
টারজনের মানবতাবোধ ও মমতা দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল জেন।
মাইল তিনেক পথ অতিক্রম করেই কেবিনের কাছাকাছি এসে পড়ল ওরা। সহসা টারজনের দলের লোকেরা একজন বুড়ো লোকের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করল টারজনের। ইতোমধ্যে জেন বুড়ো লোকটিকে চিনতে পেরে ছুটে গেল তার দিকে। বাবা বলে চীৎকার করতে লাগল সে।
জেনের কণ্ঠস্বর শুনে তার পানে তাকালেন অধ্যাপক পোর্টার। হারানো মেয়েকে দীর্ঘদিন পরে ফিরে পেয়ে আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে ধরলেন তাকে।
