তার ডাক শুধু একটা সিংহের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। সিংহ দেখে কাছাকাছি একটা গাছের উপর উঠে পড়ল সে। সিংহটা চলে গেলেও অন্ধকারে ভয়ে গাছ থেকে নামল না।
পরদিন সকালে গাছ থেকে নেমে এসে দু’জনের আহারের সন্ধানে বার হলো ক্লেটন। এদিকে থুরানের জ্বর ছেড়ে যাওয়ায় তাড়াতাড়ি সেরে উঠতে লাগল সে। এমন সময় ক্লেটন হঠাৎ জ্বরে পড়ে গেল। দিনে দিনে তার জ্বর বাড়তে লাগল। কিন্তু থুরান এবার বাইরে বেরিয়ে তার জন্য আহার সংগ্রহ করতে পারলেও ক্লেটনকে সে কিছুই দিত না। প্রথম প্রথম ক্লেটন কোনরকমে নিজেই উঠে নদী থেকে একটা পাত্র ভরে খাবার জল নিয়ে আসত। একদিন সে আর উঠতে পারল না। সে থুরানের কাছে একটু। জল চাইল।
কিন্তু থুরান এক পাত্র জল নিজে ক্লেটনের সামনে পান করে বাকি জলটা ফেলে দিল। ক্লেটনকে দিল না। বলল, তুমি জেনের সামনে আমাকে অপমান করতে।
ক্লেটন ক্ষীণকণ্ঠে বলল, সে আর বেঁচে নেই। তার কথা আর বলো না।
পরদিন থুরান তাকে একা ফেলে রেখে ক্লেটনের বর্শটা নিয়ে জনপদের উত্তর দিকে রওনা হলো।
এদিকে টেনিংটন তার দলবল নিয়ে কেবিনটা থেকে মাইলকতক দূরে সমুদ্রের ধারেই একটা জায়গায় বস করছিল। তারা রোজ বলত হারানো নৌকাটা একদিন তাদের কাছে কুলে এসে ভিড়বে।
সকলেই জেন, ক্লেটন আর থুরানের জন্য খুবই ভাবতে লাগল। টেনিংটন একদিন মিস হেজেল স্ট্রংকে বলল, আপনি কি থুরানকে বিয়ে করবেন বলে কথা দিয়েছেন?
হেজেল বলল, ভদ্রলোককে আমি পছন্দ করতাম। বড় ভাল লাগত। কিন্তু বিয়ের কথা ভাবিনি।
একদিন যখন হেজেলের সঙ্গে কথা বলছিল তখন অদূরে একজন দাড়িওয়ালা ঘেঁড়া ময়লা পোশাক পরা একটা লোককে আসতে দেখে রিভলবার থেকে গুলি করতে যাচ্ছিল টেনিংটন। কিন্তু লোকটা কাছে আসতে দেখল সে উঁসিয়ে থুরান। থুরানকে অন্যান্য যাত্রীদের সম্বন্ধে সবাই প্রশ্ন করতে সে বলল, আমরা। পথ হারিয়ে নৌকাতে প্রচুর খাদ্যাভাব ও জলকষ্ট পাই। তিনজন নাবিক একে একে মারা যায়। তারপর কুলে উঠে একটা মাচা তৈরি করে বাস করছিলাম। আমি যখন একদিন জ্বরে বেহুশ হয়ে ভুল বকছিলাম। তখন এক বন্য জন্তু তুলে নিয়ে যায় জেনকে। ক্লেটন জ্বরে মারা যায়।
এদিকে জেন সেই অন্ধকার ঘরখানায় কতদিন বন্দী ছিল তা বলতে পারবে না সে। কারণ মাটির তলায় সেই অন্ধকার ঘরখানায় দিবারাত্রি সমান ছিল তার কাছে। দিনকতক পরে একদল মেয়ে এসে তাকে নিয়ে কি একটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান করল। তারপর তাকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে একটা ফাঁকা উঠোনে আনল। মন্দিরের বেদীর সামনে তাকে থামতে বলল। বেদীতে রক্তের দাগ দেখে ভয় পেল জেন।
এরপর জেনকে যখন বেদীর উপর শুইয়ে দেওয়া হলো এবং প্রধান পূজারিণী তার বুকের উপর একটা ছুরি ধরে রইল তখন জেনের ভয় আরো বেড়ে গেল। ধীরে ধীরে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল সে।
এদিকে টারজান বনটা পার হয়ে ওপার নগরীর দিকে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে লাগল। বনের ভিতরটা গাছে গাছে এসেছে। তারপর থেকেই ছুটতে শুরু করেছে। একে একে পাহাড় আর উপত্যকা পার হয়ে সে। সামনের দিকে না গিয়ে গুপ্ত পথ দিয়েই প্রবেশ করল ওপারে নগরীতে।
টারজান দেখল মন্দিরের কোন ঘরে কোন পূজারী বা পূজারিণী নেই। সবাই নরবলি দেখতে গেছে। বেদীর সামনে উঠোনটায় গিয়ে টারজান যখন অকস্মাৎ এক উন্মত্ত সিংহের মত উপস্থিত হল তখন সকলেই ভয় পেয়ে গেল। প্রধান পুরোহিত লা-এর হাত থেকে ছুরিটা পড়ে গেল। এদিকে একজন পূজারীর হাত থেকে একটা খাড়া কেড়ে নিয়ে যাকে তাকে বধ করে যেতে লাগল টারজান। সকলেই ভয়ে পালাতে লাগল।
টারজান এবার লা-এর কাছে গিয়ে বলল, আমি তোমার কোন ক্ষতি করব না। আমি এই নারীকে নিয়ে যাব। একে উদ্ধার করার জন্য এসেছি। যদি তুমি আমাকে বাধা ধাও তাহলে তোমাকেও হত্যা করব।
লা ভয়ে ভয়ে বলল, কে এই নারী?
টারজান বলল, এ আমার স্ত্রী।
এই বলে অচৈতন্য জেনকে কাঁধে তুলে নিয়ে যে গুপ্তপথ দিয়ে এসেছিল সেই পথ দিয়েই চলে গেল, টারজান।
প্রথমে ভয়ে সবাই পালালেও পরে আবার দল বেঁধে পূজারীরা ফিরে এল। তারা বলাবলি করতে লাগল মন্দিরের পিছনের দিকের যে পথ দিয়ে ওরা পালিয়েছে সে পথে ওরা পালাতে পারবে না। ওদের আবার এখানেই ফিরে আসতে হবে। কিন্তু অনেকক্ষণ কেটে গেলেও টারজান যখন ফিরে এল না তখন ওরা আবার পঞ্চাশজন লোককে টারজনের খোঁজে পাঠাল।
ওপার নগরীটাকে পিছনে ফেলে এক মাইলের উপর উপত্যকাটা দিয়ে এগিয়ে যাবার পর টারজান পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখল একদল লোক তার পিছনে আসছে। টারজান দ্রুত চোখের নিমেষে উপত্যকাটা পার হয়ে পাহাড়টার মাথার উপরে অবলীলাক্রমে উঠে গেল। তারপর অদৃশ্য হয়ে গেল পাহাড়টার ওপারে।
পাহাড়টার উপরে ওরা উঠে টারজানকে আর দেখতে না পেয়ে ফিরে গেল তারা।
এদিকে টারজান যখন দেখল তাকে আর অনুসরণ করছে না ওরা তখন একটা নদীর ধারে গিয়ে জেনকে নামিয়ে তার চোখে মুখে জলের ছিটে দিল টারজান।
জেন এবার ধীরে ধীরে চোখ মেলে বলল, টারজান তুমি?
টারজান বলল, হ্যাঁ, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, ঠিক সময়েই আমি গিয়ে হাজির হয়েছিলাম। তাই তোমায় বাঁচাতে পেরেছি।
জেন বলল, হেজেল আর মঁসিয়ে থুরান যে বলল, মাঝ সমুদ্রে তুমি পড়ে গিয়ে মারা গেছ।
