ওরা জিজ্ঞাসা করল, তুমি?
টারজান বলল, আমি দিনকতক এখানে আমার বাসায় থাকব। পরে তোমাদের ওখানে যাব।
তার দলের লোকেরা চলে গেলে টারজান আগে যেখানে অধ্যাপক পোর্টারের সিন্দুকটা পুঁতে রেখেছিল মাটিতে এবং সেখানে কোদালটা পড়ে ছিল তখনো সেখানে একটা বড় খাল করে সব সোনার তালগুলো পুঁতে রাখল।
রাতটা সেখানে কাটিয়ে পরদিন সকালে কেবিনের পথে যাত্রা শুরু করলো টারজান। কিছুদূর যাওয়ার পর বাতাসে মানুষের গন্ধ পেল। একজন শ্বেতাঙ্গ মানুষ আর সেই সঙ্গে একটা সিংহেরও গন্ধ পেয়ে গেল। একটা গাছের উপর থেকে টারজান দেখল একটা মই লাগানো মাচার নিচে একজন শ্বেতাঙ্গ মহিলা নতজানু হয়ে প্রার্থনা করছে আর একজন ভেঁড়া ময়লা পোশাক পরা শ্বেতাঙ্গ পুরুষ হাতে মুখ ঢেকে বসে। আছে। তার থেকে মাত্র তিরিশ হাত দূরে একটা ক্ষুধিত সিংহ তার উপর ঝাঁপ দেবার উদ্যোগ করছে। টারজান দেখল ধনুকে তীর লাগিয়ে ছোঁড়ার সময় নেই। এক মুহূর্ত দেরী হলে লোকটাকে আর বাঁচানো যাবে না। তাই সে তার বর্শাটা দেহের সমস্ত শক্তি দিয়ে সিংহটাকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ে দিল। বর্শাটা সিংহটার পিঠের উপর দিয়ে ঢুকে পেট দিয়ে বেরিয়ে এল।
টারজান দেখল মেয়েটি জেন পোর্টার। সে যেন নিজের চোখকে নিজেই বিশ্বাস করতে পারছে না। সে দেখল যে লোকটি ধীরে ধীরে চোখ মেলে মরা সিংহটার পানে তাকাল সে হচ্ছে ক্লেটন। টারজান কি মনে করে ওদের দেখা না দিয়ে ওয়াজিরিদের গায়ের দিকে পা চালিয়ে যেতে লাগল।
এদিকে জেন ও ক্লেটন কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার পর জেন প্রথমে কথা বলল, কে এই বর্শাটা ছুঁড়ল?
ক্লেটন বলল, ঈশ্বর জানেন। তারপর জেনকে বলল, তুমি মাচায় চলে যাও। আমি তো তোমাকে রক্ষা করতে পারব না।
পরের দিন থুরানের অবস্থা আরো খারাপ হলো। ক্লেটন সিংহটার মৃতদেহ থেকে বর্শাটা তুলে নিয়ে জঙ্গলে শিকারের খোঁজে বেরিয়ে গেল। জেন মাচা থেকে নেমে গাছের নিচে ঘোরাফেরা করতে লাগল। সে জঙ্গলের দিকে পিছন ফিরে থাকায় দেখতে পায়নি বাঁদর-গোরিলাদের মত দেখতে কতকগুলো বর্বর জাতীয় লোক চুপিসারে ঝোপের ভিতর দিয়ে এগিয়ে আসছে তার দিকে। ঘাসের খসখস শব্দে মুখ তুলে তাকিয়ে ভয়ে চীৎকার করে উঠল। কিন্তু তার মুখ চেপে ধরে তাকে তুলে নিয়ে চলে গেল ওরা।
জেন চেতনা ফিরে পেয়েই দেখল সে এক গভীর জঙ্গলের মধ্যে রয়েছে। তখন রাত্রিকাল। কাছেই একটা বড় অগ্নিকুণ্ড জ্বলছিল। তাতে একটা পাত্রে মাংস সিদ্ধ হচ্ছিল। তার থেকে কিছু ঝোল তুলে জেনকে খেতে দিল ওরা। কিন্তু নাকে একটা দুর্গন্ধ আসতে ঘৃণায় চোখ বন্ধ করল জেন।
দিনের পর দিন ধরে বনপথের মধ্য দিয়ে জেনকে হটিয়ে নিয়ে যেতে লাগল ওরা।
অবশেষে একটা প্রাচীরঘেরা এক প্রাচীন নগরীতে গিয়ে ঢুকল। ওরা ঢুকতেই জেনকে দেখে নারী পুরুষ সবাই জেনকে ঘিরে দাঁড়াল। মেয়েগুলোকে দেখে জেনের একটু আশা হলো, কারণ তাদের মুখগুলোকে দেখে কম নিষ্ঠুর বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু মেয়েগুলো তাকে দেখে একটা সহানুভূতির কথাও বলল না। জেনকে মাটির তলায় একটা অন্ধকার ঘরের মধ্যে নিয়ে যাওয়া হলো। তাকে দুটো পাত্রে কিছু জল ও খাবার দেয়া হলো। এই ঘরটাতেই এক সপ্তাহ রাখা হলো তাকে। রোজ একজন করে মেয়ে এসে তাকে খাবার আর জল দিয়ে যেত। এক সপ্তাহ এইভার যাবার পর গায়ে একটু বল পেল জেন। কিন্তু সে জানত না এরপর জ্বলন্ত দেবতা সূর্যের উদ্দেশ্যে বলি দেয়া হবে তাকে।
এদিকে বর্শা ছুঁড়ে সিংহটাকে মারার পর মনের দুঃখে ওয়াজিরিদের গায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। টারজান। কিন্তু সে আর কোন মানুষের সমাজে ফিরে যাবে না। জঙ্গলের মাঝেই একা রয়ে যাবে সে।
একথা ভাবতে ভাবতে টারজান বনের মধ্যে আগে যেখানে তার দলের বাঁদরগুলো নাচগানের উৎসব করত সেইখানে থাকতে লাগল। একদিন সেখানে একদল বাঁদর-গোরিলা ঘুরতে ঘুরতে এসে হাজির হলো।
পুরনো দিনের কথা ভেবে বয়স্ক গোরিলারা টারজানকে তাদের দলের একজন হিসেবে মেনে নিল। ফলে টারজান সেই থেকেই বাঁদরদলেই রয়ে গেল। এক সঙ্গে শিকার করতে লাগল। শিকারে টারজনের দক্ষতা ও বুদ্ধিমত্তা দেখে অবাক হয়ে গেল তারা। তার বুদ্ধির জন্য তাকেই তারা রাজা নির্বাচিত করল।
একদিন একটা বাঁদর অন্য কোথায় চলে গিয়েছিল ঘুরতে। ফিরে এসে সে বলল, পঞ্চাশজন অদ্ভুত ধরনের লোক একটা মেয়েকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে।
টারজান আগ্রহসহকারে জিজ্ঞাসা করল, লোকগুলো বাঁদরের মত দেখতে আর তাদের চেহারাগুলো বেঁটে বেঁটে? তাদের পাগুলো বাঁকা বাঁকা?
বাঁদর-গোরিলাটা বলল, হ্যাঁ।
তারা কি সিংহ আর চিতাবাঘের চামড়া পরেছিল?
হ্যাঁ, তাদের পরনে তাই ছিল।
তারা যে মেয়েটিকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল তার গায়ের চামড়াটা খুব সাদা?
হ্যাঁ, তার মাথায় অনেক চুল ছিল। তাকে ওরা টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।
টারজান বলল, হা ভগবান! কোথায় দেখেছ?
গোরিলাটা দক্ষিণ দিকে হাত বাড়িয়ে দেখাল।
একথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে টারজান লাফ দিয়ে গাছে উঠে তীরবেগে দক্ষিণ দিকে চলে গেল।
ক্লেটন শিকার থেকে ফিরে এসে দেখল জেন মাচার উপর নেই।
জেনের কথা থুরানকে জিজ্ঞাসা করতে সে আশ্চর্য হয়ে বলল, আমি ত জানি না। কোন শব্দও শুনতে। পাইনি।
ক্লেটন একাই বনের মধ্যে জেনের খোঁজ করে বেড়াতে লাগল। তখন সন্ধ্যে হয়ে আসছিল। কোথাও জেনের কোন সন্ধান না পেয়ে তার নাম ধরে বারবার ডাকতে লাগল। কিন্তু কোন সাড়াশব্দ পেল না।
