একদিন কালাজ্বরে আক্রান্ত হয়ে থুরান যখন মাচার উপর ঘাসের বিছানায় শুয়েছিল তখন ক্লেটন জঙ্গলে শিকার করতে গিয়েছিল। জেন মাচার নিচে দাঁড়িয়ে কি করছিল। হঠাৎ ক্লেটন ছুটে এসে বলল, জেন পালাও, মাচায় যাও।
জেন দেখল তার পিছনে একটা সিংহ। কিন্তু সে ছুটে পালাল না। নতজানু হয়ে বসে প্রার্থনা করতে লাগল। যখন দেখল সিংহটা ক্লেটনের উপর ঝাঁপ দেবার জন্য উদ্যোগ করছে তখন সে তাদের প্রাণের সব আশা ত্যাগ করল। যুরান তা দেখে ভয়ে মূৰ্ছিত হয়ে পড়ল। এমন সময় জেন দেখল বনের ভিতর থেকে অদৃশ্য কোন এক মানুষের হাত থেকে ছোঁড়া বর্শা এসে সিংহটার বুকটাকে এফোড় ওফোঁড় করে দিল। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল সিংহটা।
সন্ধ্যার অন্ধকার ঘন হয়ে ওঠার পর প্রধান পূজারিণী লা টারজনের ঘরে ঢুকল। তার হাতে কোন আলো ছিল না। সে টারজনের জন্য কিছু খাবার এনেছিল। অন্ধকারের মাঝেই লাকে চিনতে পারল টারজান।
লা বলল, তারা ক্ষেপে উঠেছে তোমাকে না পেয়ে। তাই এরই মধ্যে পঞ্চাশজন লোক তোমার খোঁজ করতে বেরিয়ে গেছে। এই ঘরটা ছাড়া মন্দিরের সর্বত্র খুঁজে বেড়িয়েছে তোমায়।
টারজান বলল, কিন্তু এ ঘরে আসতে ভয় পায় কেন তারা?
লা বলল, কারণ এ ঘর মৃতদের ঘর। যেসব লোককে বলি দেয়া হয় তাদের আত্মারা মৃত্যুর পর এ ঘরে এসে উপাসনা করে। জীবিত কোন লোক এ ঘরে এলে মৃতরা তাদের ধরে। যে বেঁচে রয়েছে তাকে। বলি দেয় তারা। এইভাবে তারা তাদের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেয়। এইজন্য এ ঘরে কেউ ঢোকে না।
টারজান বলল, কিন্তু তুমি ঢুকলে কি করে?
লা বলল, আমি প্রধান পূজারিণী-আমি মৃতদের হাত থেকে নিরাপদ, এখন এস।
লা টারজানকে নিয়ে বলির বেদীর তলদেশে যে একটা অন্ধকার ঘর ছিল তার মধ্যে নিয়ে গেল। তারপর অনেকগুলো অন্ধকার বারান্দা পার হয়ে আবার একটা ঘরে রুদ্ধ দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। লা একটা চাবি বার করে তালাটা খুলে সেই ঘরের মধ্যে ঢুকে বলল, আগামীকাল রাত পর্যন্ত তুমি এই ঘরের মধ্যেই থাকবে।
টারজান দেখল একই মাপের বড় পড় পাথর দিয়ে দেওয়ালগুলো তৈরি। সহসা হাত দিয়ে পরীক্ষা করতে করতে সে দেখল দরজার উল্টোদিকের দেওয়ালটা আলগা করে গাঁথা। একটু চেষ্টা করতেই পাথর খণ্ডগুলো একটা একটা করে খুলে যেতে লাগল। টারজনের দেহটা বার হবার একটা পথ হয়ে গেল।
ওপারে গিয়ে টারজান আবার পাথর খণ্ডগুলো যথাস্থানে বসিয়ে যেমন ছিল তেমনি করে দিল। টারজান দেখল মাথার উপরে ছাদের মাঝখানে এক জায়গায় গোলাকার একটা ফাঁক রয়েছে। সেই ফাঁক দিয়ে ঝরে পড়া এক ঝলক চাঁদের আলোয় টারজান দেখল সেখানে একটা জলের কূয়ো রয়েছে। কুয়োটার। পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে তার মনে হলো এই পথটা নিশ্চয় বাইরে যাবার একটা গোপন পথ। এ পথে সে বাইরে যেতে শেষ পর্যন্ত না পারলেও অন্তত একবার পরীক্ষা করে দেখতে চাইল। এগিয়ে গিয়ে দেখল সামনের দেওয়ালে আগের দেওয়ালটার মত আলগা করে পাথর গাঁথা একটা পথ রয়েছে। ওপারে গিয়ে আগের মত পাথরগুলো ঠিক জায়গায় বসিয়ে দিল। এরপর একটা সুড়ঙ্গ পথ পেল সে। সে পথে কিছুদূর যাবার পর খিল আঁটা একটা কাঠের দরজা পেল সে। খিলটা জোর করে খোলার সময় একটা জোর আওয়াজ হলো। টারজান কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে দেখল এই শব্দের কোন প্রতিক্রিয়া হয় কি না।
এরপর একটা বড় ঘরে গিয়ে দেখল সারা ঘরখানা তাল তাল ধাতুতে ভর্তি। তালগুলো অদ্ভুত আকারের কিন্তু একই মাপের। সেগুলো ভারী, কিন্তু সোনার কি না তা অন্ধকারে বুঝতে পারল না। একটা তাল নিয়ে উল্টো দিকের আর একটা দরজা দিয়ে ঘর হতে বেরিয়ে গেল টারজান।
ঘর থেকে বেরিয়ে অনেকটা পথ যাবার পর উপরে ওঠার পাথরের সিঁড়ি পেল। তারপর সেখান থেকে দেখল একটা পড় পাথর রয়েছে। তার ওপারেই নগরপ্রান্তের সেই বিরাট উপত্যকা। এবার মাথার উপর মুক্ত আকাশ থেকে চাঁদের আলো ঝরে পড়ছিল। সে আলোয় টারজান দেখল তার হাতের ধাতুর তালটা সোনার।
আপন মনে ভাবল টারজান, এই সেই প্রাচীন ওপার নগরী, সেই ভয়ঙ্কর সোনার দেশ। বিভীষিকা আর মৃত্যুর দেশ। উপত্যকার ওপারে সেই খাড়াই পাহাড়টা দেখা যাচ্ছে যে পাহাড় হয়ে তারা গতকাল সকালে এখানে আসে। পা চালিয়ে উপত্যকাটা পার হয়ে সেই পাহাড়ের মাথায় উঠতে রাত কেটে গেল।
পাহাড় থেকে নেমে ধীরপায়ে সাবধানে এগিয়ে গেল টারজান। কিছুদূর গিয়ে গাছপালা দিয়ে তৈরি একটা ঝুপড়ি বা শিবির দেখতে পেল। তারপর পিছন থেকে তার দলের লোকদের চিনতে পারল।
ওয়াজিরিরা চমকে উঠে টারজানকে দেখতে পেয়ে আনন্দে লাফিয়ে উঠল। বলল, আমরা তোমার কথাই ভাবছিলাম মালিক। ভাবছিলাম এখুনি তোমাকে উদ্ধার করতে যাব ওখানে।
টারজান বলল, পঞ্চাশজন লোককে এদিকে দেখেছ? তারা আমায় খুঁজছে।
বাসুলি বলল, বাঁদর-গোরিলাদের মত দেখতে ছোট ছোট পায়ে হাঁটতে হাঁটতে পঞ্চাশজন লোকের একটা দল এই পথেই গেল। আমরা ওদের দেখা দিইনি।
দিনটা সেইখানে কাটিয়ে তার দলের সবাইকে নিয়ে রাত্রিতে আবার সেই গোপন পথটা দিয়ে সেই ঘরটায় গিয়ে পঞ্চাশজন লোকের প্রত্যেকের হাতে দুটো করে সোনার তাল তুলে দিল টারজান। তারপর তারা দেশের পথে রওনা হলো। প্রায় একমাস চলার পর ওরা ওদের দেশের সীমানায় এসে পৌঁছল। কিন্তু এবার উত্তর দিকে ওদের গায়ে না গিয়ে পশ্চিম দিকের উপকূলভাগে যাবার মনস্থ করল। ওদের। বলল, তোমরা সোনাগুলো বনের এক জায়গায় রেখে দিয়ে গায়ে ফিরে যাও।
