এমন সময় পূজারীদের মধ্যে একটা তর্কাতর্কি শুরু হলো। কে প্রথমে দাঁড়াবে কে পরে দাঁড়াবে এই নিয়ে বিবাদ বাঁধল। গোরিলার মত একটা বর্বর লোক একটা বেঁটে লোককে সরিয়ে তার জায়গায় দাঁড়াবার চেষ্টা করছিল। বেঁটে লোকটা তখন প্রধান পুরোহিতের কাছে নালিশ জানাতে প্রধান পুরোহিত লোকটাকে সবচেয়ে শেষে দাঁড়াবার হুকুম দিল।
এমন সময় সেই বিক্ষুব্ধ পূজারীটা কোন অনুশাসন না মেনে তার পাশের এক পূজারীকে একটা লাঠি দিয়ে সজোরে আঘাত করল। তখন জোর গোলমাল শুরু হলো এবং টারজান শুয়ে শুয়ে সেদিকে তাকাল।
ক্রমে জনশূন্য হয়ে উঠল সমস্ত জায়গাটা। শুধু বেদীতে শায়িত টারজান, প্রধান পুরোহিত আর সেই বিক্ষুব্ধ উন্মত্তপ্রায় পূজারীটা ছাড়া আর কেউ ছিল না সেখানে।
এমন সময় টারজান তার সমস্ত শক্তি দিয়ে তার হাতের বাঁধন খুলে ফেলল। কিন্তু তখন দেখল সেই বিক্ষুব্ধ পূজারীটা প্রধান পুরোহিতকে জোর করে ধরে টানতে টানতে কোথায় নিয়ে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে নারীকণ্ঠের এক আর্তচিৎকার শুনে পালাবার কথা ভুলে সেই চীৎকারের শব্দ শুনে একটা ঘরে গিয়ে। হাজির হলো টারজান। সেই ঘরটায় গিয়ে টারজান দেখল প্রধান পুরোহিতকে সেই বর্বর লোকটা দু’হাতে তাকে গলা টিপে হত্যার চেষ্টা করছে। তার হলুদ বড় বড় দাঁতগুলো চকচক করছিল বাদর-গোরিলাদের মত।
টারজান এবার লোকটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তার গলাটা দুহাত দিয়ে সজোরে ধরে তাকে শ্বাসরোধ করে তার প্রাণহীন দেহটা মেঝের উপর ফেলে দিয়ে তার উপর দাঁড়িয়ে এক বিজয়সূচক চীৎকার করল। এদিকে প্রধান পুরোহিত তাদের দুজনের ধস্তাধস্তি দেখে ভয়ে স্তব্ধ হয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তার আক্রমণকারী বর্বর লোকটা মরে যেতে সে ঘর থকে বেরিয়ে যাচ্ছিল একটি দরজা দিয়ে। টারজান তার একটা হাত ধরে বাঁদর-গোরিলাদের ভাষায় বলল, থাম।
প্রধান পূজারিণী বলল, কে তুমি, আমাদের মাতৃভাষায় কথা বলছ?
টারজান বলল, আমি হচ্ছি বাঁদর-দলের অধিপতি টারজান।
যুবতী বলল, কি চাও তুমি? কেন তুমি আমাকে রক্ষা করলে?
আমি নারী হত্যা চাইনি।
কিন্তু এখন কি চাও?
প্রধান যুবতী টারজানকে আপাদমস্তক একবার দেখে নিয়ে বলল, তুমি এক আশ্চর্য মানুষ। একটু আগে আমি তোমাকে বধ করতে গিয়েছিলাম নিজের হাতে আর এখন তুমিই আমাকে বাঁচালে সাক্ষাৎ মৃত্যুর কবল থেকে।
টারজান বলল, আমি তোমাকে কোন দোষ দিই না, কারণ তুমি যা করছিলে তা তোমাদের ধর্মীয় প্রথার বশবর্তী হয়েই করছিলে।
যুবতী তখন বলতে লাগল, আমার নাম লা, আমি এখানকার প্রধান পুরোহিত ও পূজারিণী। এই নগরীর নাম ওপারে। আজ হতে প্রায় দশ হাজার বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষেরা খনি থেকে সোনা তুলে এখানে সভ্যতার পত্তন করে এবং এক বিরাট নগরী গড়ে তোলে।
টারজান বলল, কিন্তু আমার কি হলো? আমাকে পালাবার পথ দেখিয়ে দাও।
লা বলল, কিন্তু এখন সব পথ বন্ধ। এখন তোমাকে একটা ঘরে লুকিয়ে রাখব। সন্ধা হলে আমি এসে তোমায় গুপ্ত পথ দিয়ে বাইরে নিয়ে যাব। আমি ওদের বলব, আমি অচৈতন্য হয়ে যাবার পর বন্দী। পালিয়ে গেছে।
একটা অন্ধকার ঘরে টারজানকে লুকিয়ে রেখে লা চলে গেল।
সহসা জ্ঞান ফিরে পেয়ে ক্লেটন দেখল মুষলধার বৃষ্টি পড়েছে। বৃষ্টির জলে তার সর্বাঙ্গ ভিজে গেছে। সে হাঁ করে কিছু বৃষ্টির জল পান করে একটু সুস্থ হলো। চোখ মেলে দেখল থুরান তার উপর অচেতন হয়ে পড়ে আছে। তার পায়ের কাছে জেন হতচেতন অবস্থায় নিথর হয়ে পড়ে আছে। তার মনে হলো। জেন মারা গেছে।
ক্লেটন কোন রকমে একটু উঠে একটা চাদরের আঁচল জলে ভিজিয়ে জেনের ঠোঁটদুটো একটু ফাঁক করে তার মধ্যে একটু জল ঢেলে দিল। শুকনো গলাটা ভিজতেই চোখ মেলে তাকাল জেন।
জেন ভয়ে ভয়ে বলল, মঁসিয়ে থুরান কোথায়? সে তোমায় মারেনি?
ক্লেটন বলল, ঐ দেখ ঐখানে পড়ে আছে। না মরলে বৃষ্টির জল পেয়ে জ্ঞান ফিরে পাবে। দেখি ওকে বাঁচাতে পরি কি না।
কিন্তু জেন হাত বাড়িয়ে তাকে নিষেধ করল। বলল, না, ওকে বাঁচিও না। ও তোমাকে খুন করবে।
দ্বিধাগ্রস্ত মনে ভাবতে লাগল ক্লেটন। ভাবতে ভাবতে এক সময় সামনে চোখ ফেলতেই আনন্দে চীৎকার করে উঠল সে, জেন, ঐ দেখ কুল।
ক্রমে নৌকাটা বেলাভূমির কাছে এসে ভিড়ল। ক্লেটন আগে নেমে পড়ে নৌকার দড়িটা একটা গাছে বেঁধে দিল যাতে নৌকাটা স্রোতের টানে ভেসে যেতে না পারে। তারপর সে জঙ্গলে গিয়ে কিছু ফল নিয়ে এসে সবাই মিলে ভাগ করে খেল।
আধ ঘণ্টা ধরে চেষ্টা করার পর থুরানের চেতনা ফিরিয়ে আনে ক্লেটন। ফল খেয়ে সবাই একটু সুস্থ হলে তারপর সবাই নৌকা থেকে নেমে বেলাভূমি পার হয়ে সেই গাছটার তলায় শুয়ে একটু ঘুমিয়ে নিল।
দিনকতক পর একদিন থুরানের কাছে জেনকে রেখে নদীতে জল আনতে যেতে বাধ্য হয়েছিল ক্লেটন। থুরান তখন জেনকে একা পেয়ে অসম্মানসূচক কি একটা কথা বলতেই জেন বলল, আজ যদি টারজান থাকত তাহলে তোমাকে সমুচিত শিক্ষা দিত।
থুরান রেগে গিয়ে বলল, সেই শুয়োরটাকে তুমি চেন?
জেন হাসতে লাগল থুরানের কথা শুনে। বলল, যারা তোমাকে ও টারজানকে দেখেছে তারা তোমার কথা বিশ্বাস করবে না।
ওরা যখন এইভাবে কথা বলছিল তখন ওরা কেউ জানত না ওদের এই বাসা থেকে উপকূলভাগের মাত্র পাঁচ মাইলের মধ্যে টারজনের কেবিন আর তারই কিছুদূরে বাকি তিনটি হারানো নৌকার যাত্রীরা সবাই নিরাপদে উপকূলবর্তী জঙ্গলেই বাস করছে। তবে ডুবে যাওয়া জাহাজের মালিক টেনিংটনের নৌকায় সব অস্ত্র থাকায় শিকারের বস্তু আর নিরাপত্তার কোন অভাব ঘটেনি তাদের। তাছাড়া তাদের নৌকাগুলোও সোজা পথে অল্পদিনের মধ্যেই কূল পেয়ে যায়। ফলে ক্ষুধা তৃষ্ণার জ্বালায় তাদের তেমন কষ্ট পেতে হয়নি।
