পাহাড় থেকে নেমে এসে টারজান তার দলের লোকদের নিয়ে সেই নগরীর দিকে এগিয়ে চলল।
অবশেষে সেই নগরপ্রাচীরের বাইরে গিয়ে হাজির হলো ওরা। পঁচিলটা পঞ্চাশ ফুট উঁচু। তার উপর ওঠা বা সেটা পার হওয়া সত্যিই এক কঠিন ব্যাপার।
সেই পাঁচিলটার বাইরেই রাতটা কাটাবার জন্য এক শিবির স্থাপন করল টারজান। শোবার সময় নগরীর ভিতর এক অদ্ভুত চীৎকার শুনে ভয় পেয়ে গেল ওয়াজিরিরা। চীৎকারটা মানুষের আর্তনাদের মত শোনালেও ঠিক বুঝতে পারল না তারা।
পাঁচিলটার এক জায়গায় একটু ফাঁক ছিল। সেই দিকে ঢুকে তারা দেখল ভিতরে সেই ধরনের আর একটা পাঁচিল রয়েছে। দুটো পাঁচিল পার হয়ে ভিতরে গিয়ে টারজান দেখল সামনে একটা ফাঁকা জায়গায় অনেক বড় বড় পাথর ও ভগ্ন সৌধমালার অনেক ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে রয়েছে। ফাঁকা মাঠটার ওদিকে মন্দিরের মত একটা বড় বাড়ি রয়েছে। ওদের মনে হলো আধো অন্ধকার সেই মন্দিরের মধ্যে ছায়া মূর্তির মত কারা ঘুরে বেড়াচ্ছে ইতস্তত।
টারজান তার লোকদের ডাক দিল, এস, ভিতরে কি আছে দেখা যাক।
কিন্তু তার দলের লোকেরা যেতে চাইছিল না তার সঙ্গে। তারা তখনি ফিরে যেতে চাইছিল নিজেদের দেশে। কিন্তু টারজান যখন নীরবে এগিয়ে গেল তখন তারা তার অনুসরণ না করে পারল না।
একটা বড় বাড়িতে ঢুকল টারজান। তার মনে হলো কারা যেন তাকে দেখছে। তখন কোন জীবন্ত মানুষ দেখতে পেল না। তবু তাদের মনে হতে লাগল অসংখ্য ছায়ামূর্তি যেন নিঃশব্দ পদক্ষেপে তাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওয়াজিরিরা টারজানকে এক সময় বলল, ফিরে চল মালিক, কোন লাভ নেই এতে। এই শহরটা অনেকদিন আগে ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু মৃত লোকদের প্রেতাত্মাগুলো ছেয়ে আছে গোটা শহরটাকে।
টারজান তার লোকদের বলল, বন্ধুগণ, তোমরা যদি চাও সূর্যালোকে বাইরের জগতে ফিরে যেতে পার, কিন্তু প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সব খুঁটিয়ে দেখব আমি। দেখব কোথায় সোনা আছে।
এক সময় টারজনের দলের লোকেরা ইতস্তত করতে লাগল। তারা কি করবে কিছু ভেবে পেল না। এমন সময় গতকাল রাতে যে অদ্ভুত, চীৎকারটা শুনেছিল সেই চীৎকারটা তাদের কানের কাছে ধ্বনিত হয়ে উঠল তীক্ষ্ণভাবে। চীৎকারটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে বাসুলি সমেত দলের সবাই ছুটে পালিয়ে গেল। টারজান একা সেই শূন্য ঘরটায় দাঁড়িয়ে রইল।
টারজান একা তখন মন্দিরের আরো ভিতরে চলে গেল। একটা রুদ্ধদ্বার ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে দরজাটা ঠেলে ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করল টারজান। কিন্তু দরজাটা ঠেলার সঙ্গে সঙ্গে আবার সেই চীৎকারটা ধ্বনিত হয়ে উঠল। টারজান ভাবল এই ঘরটাই হয়তো সোনার ভাণ্ডার। তাই তাকে সতর্ক করে। দেওয়া হচ্ছে। হয়ত এবার অদৃশ্য শত্রুরা তার সামনে এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে তার উপরে।
তবু টারজান তার দেহের সমস্ত শক্তি দিয়ে দরজাটা ফাঁক করে ভিতরে ঢুকে পড়ল। ভিতরটা দারুণ অন্ধকার। ঘরের মধ্যে কোন জানালা নেই। টারজান ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল আপনা থেকে আর সঙ্গে সঙ্গে কতকগুলো হাত ধরে ফেলল টারজানকে।
যে হাতগুলো টারজানকে ধরেছিল প্রচুর লড়াই করে সেগুলোর থেকে নিজেকে ছাড়াবার চেষ্টা করেও তা পারল না টারজান। হাতগুলো সংখ্যায় ছিল অগণ্য এবং তারা টারজানকে বেঁধে ফেলল। কিন্তু সেগুলো। কাদের হাত, কারা তাকে বাধল তা বুঝতে পারল না টারজান।
টারজনের হাত পা শক্ত করে বেঁধে তারা তাকে তুলে ঘরগুলো পার করে একটা ফাঁকা উঠোনে নিয়ে গেল। সেখানে তাকে তারা চিৎ করে শুইয়ে রেখে দিল। টারজান দেখল জায়গাটা চারদিকে উঁচু পাঁচিল। দিয়ে ঘেরা। মাথার উপর নীল আকাশ দেখা যাচ্ছে। টারজান দেখল তাকে যারা বেঁধে এনেছিল সেই লোকগুলোর গায়ের রং সাদা। তাদের মাথার জটা বুকের উপর পর্যন্ত ঝুলে পড়েছে। পাগুলো ছোট এবং মোটা। হাতগুলো লম্বা লম্বা আর পেশীবহুল।
টারজান বাঁধনের দড়িগুলো পরীক্ষা করে দেখল। কিন্তু সে তার থেকে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করল না। তখন বেলা দুপুর।
কিছুক্ষণ পর টারজান দেখল কিছু লোক এসে পাঁচিলের ধারে গ্যালারিতে এসে বসে পড়ল। আর কুড়িজন লোক হাতে খাড়া নিয়ে এক ধর্মীয় গান গাইতে লাগল। এমন সময় হঠাৎ কোথা থেকে এক নারী খাঁড়া হাতে এসে সেই লোকগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে তাদের বাধা দিয়ে কি বলতে তারা থেমে গেল।
সেই মেয়েটি এবার টারজনের সব বাঁধন কেটে দিল। তারপর তাকে উঠে দাঁড়াতে বলল ইশারায়। এরপর তার গলায় দড়ি বেঁধে তাকে সেখান থেকে মন্দিরের অভ্যন্তরে একটা বেদীর কাছে নিয়ে গেল। টারজান দেখল বেদীর চার পাশে মানুষের রক্তের দাগ রয়েছে এবং দেয়ালে অনেক মানুষের মাথার খুলি রয়েছে। সে বুঝতে পারল এই বেদীর সামনে তাকে বলি দেওয়া হবে।
এরপর বেদীর উল্টো দিকের একটি অন্ধকার পথ দিয়ে এক যুবতী পূজারিণী একা এসে হাজির হলো সেখানে। টারজান বুঝল সেই যুবতীই হলো প্রধান পুরোহিত। তার গায়ের সোনার গয়নাগুলো হীরক খচিত ছিল। তার মুখটা ছিল বেশি বুদ্ধিদীপ্ত।
টারজান বুঝতে পারল এই সুন্দরী যুবতী কিভাবে একটু পরে রক্তপিপাসু ঘাতকীতে পরিণত হবে। প্রধান পুরোহিত ছুরি হাতে তৈরি হতেই পূজারী ও পূজারিণীরা সারবন্দীভাবে কাপ হাতে দাঁড়াল। বন্দীর দেহে ছুরিকাঘাতের সঙ্গে সঙ্গেই তারা সবাই আপন আপন কাপে রক্ত নিয়ে পান করবে।
