যুবকটি বলে উঠল, থাক! এমন ভাবে কথা বলছ যেন তুমি একটা একশ’ বছরের বুড়ো। তোমার বয়স তো তিরিশও হয় নি। আমাদের দেখা হবার পরেই তোমার বয়সটা আমাকে বলেছিলে।
অপরজন বলল, আরে, তিরিশ হলেই তো বুড়ো। মানুষ হতে হলে তিরিশের অনেক আগেই শুরু করতে হয়। আরে, এমন অনেক লোককে আমি জানি যারা মাল-কড়ি কামিয়ে তিরিশ বছরেই অবসর নিয়ে বসেছে। আমার বাবার কথাই ধর না-হঠাৎ সে চুপ করে গেল। হাসতে হাসতে যুবকটি বলে উঠল, মনে হচ্ছে ফিরে গেলে আমরা যুগল নিষ্কর্মা বনে যাব।
বুড়ো টাইমার বলল, কিন্তু এভাবে কতদিন কাটবে? দেখেশুনে মনে হচ্ছে আফ্রিকার সব হাতি কোন অজ্ঞাত জগতে চলে গেছে।
কিড বলল, বুড়ো বোবোলো দিব্যি গেলে বলেছিল যে এখানেই হাতির দেখা পাব; এখন বুঝছি লোকটা মিথ্যাবাদী।
টাইমার বুড়ো বলল, সে সন্দেহ আমার মনেও জেগেছে। কিন্তু বলে সব চুপচাপ বসে থাকলে তো চলবে না। এইসব অনুগত লোকগুলো যদি অবিলম্বে কিছু হাতির দাঁত চোখে না দেখে তাহলে নির্ঘাৎ আমাদের মত, তারাও ভাল করেই জানে যে এখানে হাতির দাঁত নেই তো মাইনেও নেই।
তা তো বুঝলাম। কিন্তু আমরা করবটা কি? হাতি বানাব?
খুঁজে বের কর। দুরের পাহাড়ে হাতি আছে; কিন্তু তারা তো তোমার গুলি খাবার জন্য নাচতে নাচতে এই শিবিরে এসে হাজির হবে না। কাজেই দু’জন করে লোক আর দিন কয়েকের খাবার সঙ্গে নিয়ে আমাদেরই বের হতে হবে। তাতে যদি হাতির খোঁজ না মেলে তো আমার নামে একটা জেব্রা পুষো।
কিড বলল, আমি রাজী।
টাইমার বুড়ো বলল, বেশ, কালই যাত্রা করব।
অনেক নির্জন দিন। অনেক আতংকের রাত। সঙ্গী লোজনদের দ্বারা পরিত্যক্ত হবার পরে একমাত্র অন্তরের নির্ভিকতাই মেয়েটিকে পাগল হয়ে যাবার হাত থেকে বাঁচিয়েছে। তারপর অনন্তকাল বুঝি পার হয়ে গেছে; প্রতিটি দিন যেন এক একটি যুগ।
আজ সে একটা শিকার করেছে। রাইফেল চালিয়ে মেরেছে একটা শুয়োর।
কাজ করতে করতেই একটা শব্দ শুনে চোখ তুলতেই দেখতে পেল চারটি লোক নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে তাকেই দেখছে। একজন সাদা, বাকি তিনজন আদিবাসী। একটা যেন আশার আলো দেখতে পেল। তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল। ওরা এগিয়ে এল। সাদা মানুষটি সকলের আগে। ভাল করে তাকাতেই আশার আলো যেন নিভে এল। কোন সাদা মানুষের এ রকম অভদ্র চেহারা সে আগে কখনও দেখে নি। নোংরা জামা-পাকড় শতছিন্ন ও তালিমারা; মুখময় দাড়ি; টুপিটার এতই ভগ্নদশা যে মাথায় পরা আছে বলেই সেটাকে টুপি বলে চেনা যাচ্ছে; মুখটাও রুক্ষ, কঠিন।
বলল, তুমি কে? এখানে কি করছ?
ও দুটোর কোনটা নিয়েই তোমার মাথা ঘামাবার দরকার নেই। মেয়েটি ঘুরে দাঁড়াল।
লোকটির মুখ আরও বিকৃত হল; কিছু কড়া কথা ঠোঁটের ডগায় এসেওছিল; কিন্তু নিজেকে সংযত করে সে মেয়েটিকেই দেখতে লাগল। মেয়েটি সুন্দরী। নোংরা পোশাক, মুখ ঘামে ভেজা, শরীরে রক্তের দাগ; তবু তাকে সুন্দরী দেখাচ্ছে। দুই বছর পরে বুড়ো টাইমার এই প্রথম একটি সাদা মেয়ে মানুষকে দেখল।
সে প্রশ্ন করল, নিশ্চয় তুমি একাকি এ দেশের এত ভিতরে ঢোক নি। দলের অন্য সকলে কোথায় গেল?
তারা আমাকে ফেলে চলে গেছে।
আর তোমার সাদা সঙ্গীরা-তারা?
সে রকম সঙ্গী কেউ ছিল না। মেয়েটি ঘুরে দাঁড়াল।
এখন তুমি কি করবে? একা তো এখানে থাকতে পারবে না। তাছাড়া কুলির সাহায্য ছাড়া থাকবেই বা কেমন করে?
একাই তিন দিন কাটিয়েছি; আরও কাটাব যতদিন
যতদিন মানে?
জানি না।
লোকটি বলল, আমার কথা শোন। বল তো, এখানে থেকে তুমি কি করছ?
একটু আসার আলো যেন দেখতে পেল মেয়েটি। বলল, একজনের খোঁজ করছি। তুমি হয় তো তার কথা শুনেছ, হয় তো সে কোথায় আছে তাও জান। আগ্রহে মেয়েটির গলা কাঁপছে।
তার নাম কি? বুড়ো টাইমার জিজ্ঞাসা করল।
জেরি জেরোম। মেয়েটি অনেক আশা নিয়ে চোখ তুলল।
লোকটি মাথা নাড়ল। তার কথা কখনও শুনি নি।
মেয়েটির চোখ থেকে আশার সামান্য আলোটুকুও নিভে গেল। দুই চোখ বুঝি বা তার অজ্ঞাতেই জলে ভরে উঠল। তা দেখে বুড়ো টাইমার বলল, খুব হয়েছে; এখন চল।
কোথায়?
আমার সঙ্গে।
কেন?
এই জঙ্গলে একটা সাদা ইঁদুরকেও আমি রেখে যেতে পারতাম না; আর তুমি তো একটা সাদা মেয়ে।
মেয়েটি উদ্ধত ভঙ্গীতে বলল, তোমার সঙ্গে যদি না যাই তাহলে?
না যাই-টাই নয়, তোমাকে যেতেই হবে। মাথায় ঘিলু থাকলে সে জন্য তোমার কৃতজ্ঞ হবার কথা। কিন্তু তোমাদের কাছে তো ও সব কথা বলাই বৃথা। তুমিও তো অন্য সব মেয়েরই মত- স্বার্থপর, অবিবেচক, অকৃতজ্ঞ।
মেয়েদের সম্পর্কে তোমার ধারণা দেখছি খুব ভাল, কি বল?
ঠিক ধরেছ।
এবার নরম সুরে মেয়েটি শুধাল, আচ্ছা তোমার শিবিরে গেলে আমাকে নিয়ে কি করবে?
সঙ্গী-সাথী পেলেই যত তাড়াতাড়ি পারি আফ্রিকার বাইরে পাঠিয়ে দেব।
আফ্রিকা ছেড়ে আমি যাব না। একটা উদ্দেশ্য নিয়ে আমি এখানে এসেছি।
তোমার উদ্দেশ্য তো সেই জেরোম নামক ভদ্দর লোককে খুঁজে বের করা; কিন্তু তার ভালর জন্যই একটি পুরুষ মানুষ হিসেবে আমার কর্তব্য তুমি তাকে খুঁজে পাবার আগেই তোমাকে এ দেশ থেকে বের করে দেয়া।
লোকটা পাগল নাকি? মেয়েটি শুনেছে, পাগলের কথা মত চলতে হয়; নইলে তারা হিংস্র হয়ে ওঠে। তাই সে ভয়ে ভয়ে বলল, হয়তো তোমার কথাই ঠিক। আমি যাব তোমার সঙ্গে।
