জেন তখন বলল, দেখ অন্য নৌকাগুলো কোথাও দেখা যাচ্ছে না।
ক্লেটন তখন মাঝিদের জিজ্ঞাসা করতে একজন মাঝি বলল, হয়তো পিছিয়ে পড়েছে।
কিন্তু মাঝিরা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করতে লেগে গেল। দু’জন নৌকা বাইতে বাইতে দাঁড় ছেড়ে বসে রইল। মাঝিরা ক্লেটনের কাছ থেকে খাবারের টিন আর জলের ফ্লাস্কগুলো চাইল। ক্লেটন তখন খাবারের টিনগুলো মাঝিদের হাতে দিয়ে দিল।
কিন্তু খাবারের টিনগুলো দেখা গেল তেলে ভর্তি। জলের ফ্লাস্কগুলো দেখা গেল গানপাউডারে ভর্তি। মাঝিরা এতে রেগে গেল।
ক্রমে অবস্থা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল। মাঝিরা পেটের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে চামড়া খেতে লাগল। তাতে ওরা অসুস্থ হয়ে পড়ল। টমকিন নামে এক মাঝি মারা গেল। তার মৃতদেহটা নৌকার পাটাতনে পড়ে রইল সারাদিন। ক্ষিদে আর পিপাসায় ওরা প্রত্যেকেই কাতর হয়ে উঠল। ওদের গলা শুকিয়ে গেল। তার উপর সারাদিন ধরে কড়া রোদ ভোগ করে ওদের অবস্থা আরো খারাপ হয়ে উঠল।
জেন মৃতদেহটাকে আর সহ্য করতে পারছিল না। সে ক্লেটনকে বলল, ওটাকে জলে ফেলে দাও।
ক্লেটন মৃতদেহটাকে একা সরাতে পারছিল না। তাছাড়া সে সেটাকে সরাতে গেলে উইলসন নামে এক মাঝি তাকে বাধা দিল। রোকোফ বা মঁসিয়ে থুরান ক্লেটনের সাহায্যে এগিয়ে গেলে উইলসন বলল, ও ত মারা গেছে, আমাদের বেঁচে থাকতে হবে। ওকে সরিও না।
এ কথার অর্থ বুঝতে পারল ক্লেটন। অর্থাৎ পেটের জ্বালায় ওরা নরমাংস খেতে চায়। অবশেষে অন্য এক মাঝি স্পাইডার ক্লেটনদের সঙ্গে একমত হলে উইলসন আর আপত্তি করল নার। মৃতদেহটাকে ক্লেটন আর রোকোফ দুজনে মিলে নৌকা থেকে তুলে সমুদ্রের জলে ফেলে দিল।
রাত্রিতে ক্লেটনের চোখে যখন ঘুম জড়িয়ে ধরেছিল তখন সে এক সময় দেখল উইলসন কেমন। অদ্ভুতভাবে তার পানে তাকাচ্ছে। সে দৃষ্টির অর্থ বুঝতে দেরি হলো না তা। ভয়ে গা শিউরে উঠল আর। কতক্ষণ ঘুমে অচেতন হয়ে ছিল সে তা সে জানে না। কিন্তু একটা খসখস আওয়াজ শুনে তার ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। চাঁদের আলোয় সে চোখ মেলে দেখল উইলসন গুঁড়িমেরে তার দিকে এগিয়ে আসছে। ক্লেটন তার মুখটা সরিয়ে নিল। তার মুখ থেকে জিবটা বেরিয়ে পড়ে ঝুলছিল। তার চোখগুলো জ্বলছিল।
জেনও জেগে উঠেছিল। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সে ভয়ে চীৎকার করে উঠল। তার চীৎকারে থুরান ও স্পইডারও জেগে উঠল। ততক্ষণে দুর্বল ক্লেটনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে দাঁত দিয়ে তার গলাটাকে ছেঁড়ার চেষ্টা করছে উইলসন। অবশেষে তিনজনে মিলে উইলসনকে টেনে সরিয়ে নৌকার পাটাতনের উপর ফেলে দিল। উইলসন পাগলের মত হাসতে হাসতে নৌকা থেকে সমুদ্রের জলে ঝাঁপ দিল।
পরদিন সকালে রোকোফ ওরফে থুরান ক্লেটনের কাছে তার একটা প্রস্তাব রাখল। বলল, আমাদের এখন ক’দিন এভাবে যেতে হবে তার ঠিক নেই। আরো চার পাঁচদিনের আগে কূল পাওয়া যাবে বলে। মনে হয় না। কিন্তু এভাবে চললে আমাদের সবাইকে মরতে হবে। তার থেকে আমাদের মধ্যে যেকোন একজনকে মরতে হবে যাতে আর সবাই দিনকতক বাঁচতে পারে। তাই আমি ভাগ্য পরীক্ষা করতে চাই।
এ কথার মানে বেশ বুঝতে পারল ক্লেটন। এ কথায় জেন বা ক্লেটন কেউই রাজী হলো না। তখন সুচতুর রোকোফ বলল, মিস পোর্টার এই লটারী বা ভাগ্য পরীক্ষা থেকে বাদ, কারণ তিনি মেয়ে মানুষ। বাকি তিনজনের মধ্যে বেশিরভাগ যা চাইবে তাই হবে। তখন মাঝি স্পাইডারও রোকোফের মতে সায় দিল। ক্লেটন নিরুপায়। রোকোফের কিছু তাস ছিল। সে তাসের খেলা জানত। একটা নম্বরের কথা জানিয়ে নিজে তোলার পর বাকি ছ’জনকে একে একে সাত তুলতে বলল রোকোফ। এই তাসের লটারীতে ক্লেটন হেরে গেল। রোকোফ হয়ত তাই চেয়েছিল।
জেন তখন অচেতন হয়ে পড়েছিল, তিনদিন সে কোন কথা বলেনি। ক্লেটন বলল, এখন বিকেল, সন্ধ্যা হোক। জেন যেন দেখতে না পায়।
রোকোফ তার পায়জামার পকেট থেকে একটা ছুরি বার করল। তার লোভাতুর চোখদুটো ক্লেটনের উপর সদা সর্বদা নিবদ্ধ ছিল। না খেয়ে খেয়ে সেও দুর্বল হয়ে পড়েছিল। সন্ধ্যে হতেই দুর্বলতায় ক্লেটনও শুয়ে পড়ল। সে একপাও নড়তে পারছিল না। তার কথা বলারও ক্ষমতা ছিল না।
রোকোফ ক্লেটনকে বলল, তুমি আমার কাছে এস।
ক্লেটন উঠে বসে যাবার চেষ্টা করছিল। কিন্তু পারল না। টলে পড়ল। টলতে টলতে অসার হয়ে শুয়ে পড়ল। রোকোফ বলল, তুমি তোমার দায় এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করছ। আমার সঙ্গে ছলনা করছ।
ক্লেটন বলল, না ছলনা করছি না। তুমি এস, আমি প্রস্তুত।
রোকোফ ফিস ফিস করে বলল, হ্যাঁ, আমিই যাচ্ছি।
অবশেষে ক্লেটন বুঝতে পারল রোকোফ তার খুব কাছে এসে পড়েছে। সে রোকোফের ক্রুর হাসির শব্দ শুনতে পেল। কে যেন মুখটা তার চেপে ধরল। তার পরেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলল সে।
ওয়াজিরিদের সর্দার হবার পর সোনার সন্ধানে এক অভিযানে যাবার জন্য প্রস্তুত হতে লাগল টারজান। যারা তার সঙ্গে স্বেচ্ছায় যেতে চায় এমন শক্ত সমর্থ পঞ্চাশজন যোদ্ধাকে বেছে নিল সে। কত পাহাড়, প্রান্তর, বন, নদী পার হয়ে পঁচিশ দিন পর তারা এক পাহাড়ের ধারে এসে এক শিবির স্থাপন। করল। সেই পাহাড়টার উপর থেকে সেই আশ্চর্য নগরটাকে দেখার আশায় পরদিন সকালেই ওরা পাহাড়টার চূড়ায় ওঠার চেষ্টা করতে লাগল। অনেক চেষ্টার পর টারজান একা পাহাড়টার চূড়ার উপর। উঠে দাঁড়াল। সামনে দেখল এক বিরাট উপত্যকা প্রসারিত হয়ে আছে। সেই উপত্যকার শেষ প্রান্তে একটা উঁচু পাথরের পাঁচিল দিয়ে ঘেরা এক বিরাট নগরী রয়েছে মনে হলো।
