এরপর আবার ওরা হাতি শিকার শুরু করতেই টারজান ওদের পিছনে দূরে বন্দুকের আওয়াজ শুনতে পেয়ে ওদের বলল, বন্দুকের আওয়াজ। নিশ্চয় তোমাদের গাঁ কেউ আক্রমণ করেছে।
ওয়াজিরিরা তখন দলবল নিয়ে গায়ের দিকে ছুটতে লাগল।
পরদিন সকালে টারজান তার দলের যোদ্ধাদের নিয়ে তাদের গায়ের চারদিকে একটু দূরে দূরে থেকে গাছের আড়ালে লুকিয়ে আক্রমণকারীদের লক্ষ্য করে তীর ছুঁড়তে লাগল।
টারজনের নির্দেশমত তার দলের যোদ্ধারা গাছের আড়াল থেকে তীর ছুঁড়তে থাকায় আরবরা ও তাদের নিগ্রো যোদ্ধাদের অনেকেই সেই তীরের আঘাতে ঘায়েল হতে লাগল। অথচ তারা তাদের শত্রুদের কাউকে দেখতে পেল না বা গুলি করতে পারল না।
আরবরা তখন গা ছেড়ে চলে যাবার কথা ভাবছিল। তারা গায়ের মধ্যে একটা কুঁড়ে ঘরের মধ্যে আশ্রয় নিল। এমন সময় টারজান একটা গাছ থেকে এমন জোরে ঘরটাকে লক্ষ্য করে একটা বর্শা ছুঁড়ল যে বর্শাটা খড়ের চাল ভেদ করে আরবদের একজনের মাথায় গিয়ে পড়ল। যন্ত্রণায় একটা আর্তনাদ নিজের কানে শুনল টারজান।
এদিকে টারজনের দলের লোকেরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠল। তাদের যখন একজনও আহত হলো না তখন শত্রুদের অনেকেই তাদের তীরের ঘায়ে ঘায়েল হলো।
টারজান তাদের বলল, এবার তোমরা সেই শিবিরে চলে যাও। আজ আর কিছু করতে হবে না। ওরা কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে আর ভয়ে ভয়ে থাকুক। টারজানও ওদের সঙ্গে শিবিরে গেল। মরা হাতিটার মাংস। খেয়ে দুপুর রাত পর্যন্ত ঘুমিয়ে একাই এক সময় বেরিয়ে পড়ল সে।
আরবরা যে ঘরে শুয়েছিল সেই ঘরটা লক্ষ্য করে টারজান আবার একটা গুলি ছুঁড়ল।
গুলির শব্দে আর চীৎকারে আরবরা ও তাদের ক্রীতদাসরা সব কুঁড়ে থেকে বেরিয়ে রাস্তায় ছোটা ছুটি করতে লাগল। কিন্তু কোথাও কোন শত্রু দেখতে পেল না। টারজান যখন দেখল তার গাছের তলায় রাস্তায় অনেক নিগ্রো ক্রীতদাস ভিড় করে গেটের দিকে একমনে তাকিয়ে আছে তখন সে গাছ থেকে একটা গুলি করল এবং তাতে একটা ক্রীতদাস মারা গেল।
বাকি ক্রীতদাসরা তাদের মালিকদের বলল, তারা আর এখানে থাকবে না। আরবরা তখন তাদের বুঝিয়ে বলল, তোমরা কোনরকমে আজকের রাতটা কাটিয়ে দাও। কাল সকালেই আমরা চলে যাব এখান থেকে।
পরদিন সকালে টারজান তার দলের যোদ্ধাদের নিয়ে গায়ের কাছে বনটায় এসে দেখল আরবরা তাদের দলবল নিয়ে গা ছেড়ে চলে যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
যাবার আগে গাঁয়ের সব কুঁড়েঘরগুলো পুড়িয়ে দিতে চাইল আরবরা। তাদের হুকুমে তাদের একজন। ক্রীতদাস একটা মশাল নিয়ে একটা ঘরে আগুন ধরাতে গেলে টারজান দূরে গাছের আড়াল থেকে আরবী ভাষায় চীৎকার করে বলল, ঘর পুড়িও না। তাহলে তোমাদের খুন করব।
একথা শুনে ক্রীতদাসটা মশাল ফেলে দিল। তখন আরবরা চারদিকে তাকিয়ে কে একথা বলল তাকে খুঁজে পেল না। কোন মানুষকে দেখতে পেল না। তখন একজন আরব নিজে একটা জ্বলন্ত মশাল তুলে নিয়ে একটা ঘরে আগুন ধরাতে গেল। এমন সময় টারজনের একটা বিষাক্ত তীর দূর থেকে এসে তার বুকটাকে বিদ্ধ করল। এতে আরবরা ভয় পেয়ে আর ঘড় পোড়াল না।
এরপর আরবদের নির্দেশে হাতির দাঁতের বোঝাগুলো ক্রীতদাসরা মাথার উপর একে একে তুলে নিতে গেলে টারজান আবার তাদের উদ্দেশ্যে বলল, হাতির দাঁতগুলো নিও না, মৃত লোকের হাতির দাঁতে কোন প্রয়োজন নেই।
পরদিন সকালে ক্রীতদাসরা বোঝা কাঁধে তুলতে অস্বীকার করলে আরবরা তাদের দু’জনকে গুলি করে মারল। তখন সুযোগ বুঝে টারজান গাছের আড়াল থেকে ক্রীতদাসদের উদ্দেশ্যে বলতে লাগল, তোমরা হাতির দাঁতের বোঝা তুলো না। তাহলে তোমরা মারা পড়বে। তোমরা তার থেকে তোমাদের নিষ্ঠুর মালিকদের হত্যা করো। তোমাদের প্রত্যেকের হাতের বন্দুক আছে। আমরা তাহলে তোমাদের কোন ক্ষতি করব না। আমরা তাহলে আমাদের গায়ে তোমাদের নিয়ে গিয়ে খাইয়ে তোমাদের দেশে পাঠিয়ে দেব।
বিদ্রোহের আভাস পেয়ে আরবরা এক জায়গায় জড়ো হলো। তাদের সর্দার যাত্রা শুরু করার জন্য হুকুম দিল ক্রীতদাসদের। কিন্তু ক্রীতদাসরা বোঝা তুলে যাত্রা শুরু না করায় সে রাইফেল তুলে গুলি করতে গেল ওদের লক্ষ্য করে। এমন সময় একজন ক্রীতদাস তার রাইফেলটা অতর্কিতে কেড়ে নিয়ে আরবদের লক্ষ্য করে গুলি করতে লাগল। তখন সব ক্রীতদাসরা একযোগে আক্রমণ করল আরবদের। দেখতে দেখতে সব আরবরা একে একে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।
টারজান এবার গাছের আড়াল থেকে বলল, এবার হাতির দাঁতের বোঝাগুলো তুলে নিয়ে আমাদের গাঁয়ে নিয়ে চল।
ক্রীতদাসরা বলল, গায়ে তোমরা আমাদের খুন করবে না তা কি করে জানব? তুমি কে কথা বলছ?
টারজান তখন আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে বলল, এই দেখ আমি। তোমরা আমাদের কথা শুনলে আমরা তোমাদের কোন ক্ষতি করবো না। আরবরাই আমাদের শত্রু।
যেদিন ক্রীতদাসরা হাতির দাঁতের সব বোঝা নিয়ে গায়ে গিয়ে পৌঁছল সেদিন রাতেই গাঁয়ের লোকরা নাচগানসহ এক বিজয়োৎসব করল। তারা সর্বসম্মতিক্রমে টারজানকে তাদের সর্দার নির্বাচিত করল।
জেন যে নৌকাটাতে ছিল তাতে যাত্রীরা সবাই ঘুমিয়ে পড়েছিল। সকালে জেনেরই প্রথমে ঘুম ভাঙ্গল। চোখ খুলে জেন দেখল আর নৌকা তিনটের কোন দেখা পাওয়া যাচ্ছে না।
ক্রমে ক্লেটনেরও ঘুম ভাঙ্গল। সে জেনকে বলল, ইশ্বরকে ধন্যবাদ যে আমরা এক সঙ্গে আছি।
