সিংহের সঙ্গে ওরা যখন লড়াই করছিল তখন সিংহের গর্জন শুনে গ্রামবাসীরা সেদিকে ছুটে আসতে থাকে। সিংহটা মরে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই তারা ভিড় করে দাঁড়াল টারজান আর সেই শিকারিটার চারদিকে তারা প্রথমে টারজানকে সেখানে দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল। কিন্তু নিগ্রোটা তার গ্রামবাসীদের সব কথা বুঝিয়ে বলার পর তারা মেয়ে পুরুষ সবাই মিলে টারজানকে প্রচুর খাতির করতে লাগল। তারা তাকে গায়ে নিয়ে গিয়ে অনেক উপহার দিল। টারজান অস্ত্র চাইলে তারা বর্শা তীর প্রভৃতি অনেক অস্ত্র দিল। সেই নিগ্রো শিকারিটি তার ছুরিটা টারজানকে উপহারস্বরূপ দিয়ে দিল।
সে রাতে টারজনের সম্মানে এক নাচগানের উৎসব করল গ্রামবাসীরা। নাচের সময় টারজান দেখল তারা নরখাদক নিগ্রো নয়। রাত্রিতে টারজান তাদের গায়ের ভিতরে একটা বড় কুঁড়েতে থাকতে বলল। কন্তু টারজান জঙ্গলে গিয়ে একটা গাছের উপর ঘুমিয়ে রাত কাটাল। পরদিন সকালে আবার সেই গাঁয়ে ফরে এল টারজান। তখন গাঁয়ের লোকেরা তাকে দেখে আনন্দে চীৎকার করতে লাগল। গায়ের শকারিদের সঙ্গে জঙ্গলে শিকার করতে গেল টারজান। শিকারে তার পারদর্শিতা দেখে বিস্ময়ে অবাক হয়ে গেল গাঁয়ের শিকারিরা। তার প্রতি তাদের শ্রদ্ধা আরো বেড়ে গেল।
টারজান তাদের কাছে সেই গাঁয়েই রয়ে গেল। ক্রমে সে তাদের ভাষায় কথা বলতে শিখল। গায়ের সর্দার বাসুলি টারজানকে বন্ধুভাবে তাদের জাতির পূর্ব ইতিহাস সব শোনাল। বাসুলি বলল, বহু বছর আগে তারা উত্তরাঞ্চলে বাস করত। তারা তখন সংখ্যায় অনেক বেশি ছিল। তারা ছিল এক শক্তিশালী উপজাতি। কিন্তু ক্রীতদাস ব্যবসায়ীরা বন্দুক নিয়ে ক্রমাগত আক্রমণ ও পীড়ন চালিয়ে তাদের শক্তি ও গৌরবের অনেকখানি নষ্ট করে দেয়।
টারজান বাসুলিকে বলল, আক্রমণকারীরা এখানে আসেনি কখনো?
বাসুলি বলল, বছরখানেক আগে একবার একদল আরব এখানে আসে। কিন্তু আমরা লড়াই করে তাদের তাড়িয়ে দিই।
কথা বলার সময় টারজান লক্ষ্য করল বাসুলির বাঁ হাতে একটা সোনার তাগা রয়েছে। টারজান তাকে। জিজ্ঞাসা করল, এই হলুদ ধাতু কোথায় পাও তোমরা?
আগে সোনা বা কোন মূল্যবান ধাতু সম্বন্ধে কোন আগ্রহ বা কৌতূহল ছিল না টারজনের। সভ্য জগতে যাওয়ার পর সে বুঝেছে এই সোনার কত দাম, কত শক্তি।
বাসুলি দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, এখান থেকে এক পক্ষকালের পথ একটা জায়গায়।
টারজান বলল, সেখানে কখনো গেছ তুমি?
বাসুলি বলল, আমি যাইনি। আমার যখন যুবক বয়স ছিল তখন আমাদের জাতির একদল লোক এখানে বসতি স্থাপন করার পর জনপদের সন্ধানে এক জায়গায় গিয়ে হাজির হয়। সেখানকার অধিবাসীরা। এই হলুদ ধাতুর গয়না পরত। সে গাঁয়ের লোকগুলো তোমাদের মত শ্বেতকায় বা আমাদের মত কৃষ্ণকায়। নয়। তারা অদ্ভুত রকমের। বাঁদর-গোরিলাদের মত বড় বড় লোম আছে তাদের গায়ে।
টারজান বলল, তোমাদের মধ্যে যারা তখন সেখানে গিয়েছিল তাদের কেউ আছে এখন?
বাসুলি বলল, আমাদের বৃদ্ধ সর্দার ওয়াজিরি তখন বয়সে যুবক ছিল। সে তখন চৌআম্বির সঙ্গে গিয়েছিল সেখানে।
এবার ওয়াজিরিকে সেই গাঁয়ের কথা জিজ্ঞাসা করল টারজান।
ওয়াজিরি বলল, সে অনেক দূরের পথ। তাছাড়া আমি এখন বৃদ্ধ। তবে যদি একান্তই যেতে চাও তোমাকে এই বর্ষাকালটা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
পরের দিন একদল শিকারি এসে খবর দিল এক জায়গায় অনেকগুলো দাঁতওয়ালা হাতি চরে বেড়াচ্ছে বনের ভিতরে। এই সব হাতি শিকার করতে পারলে দাঁতগুলো পাওয়া যাবে।
পরদিন সকাল হতেই ওয়াজিরি ও বাসুলিসহ পঞ্চাশজন যোদ্ধা শিকারে বার হলো। তাদের মধ্যে। টারজানও ছিল।
দু’ঘণ্টা হাঁটার পর ওরা বনের সেই জায়গাটাতে পৌঁছল গতকাল যেখানে হাতির পাল দেখা। গিয়েছিল। ওরা এখানে সেখানে খোঁজ করে হাতির পাল দেখতে না পেলেও টারজান বাতাসে গন্ধ শুঁকে বলল, আর বেশি দূরে যেতে হবে না। কাছাকাছিই আছে হাতির পালটা।
ওরা তখন এগিয়ে গিয়ে দেখল দল থেকে আলাদা হয়ে দুটো দাঁতওয়ালা পুরুষ হতি গাছের পাতা খাচ্ছে। তখন তীর ধনুক আর বর্শা নিয়ে ওরা হাতি দুটোকে আক্রমণ করল। টারজান গাছের উপর থেকে। সব দেখতে লাগল। দরকার হলে ও নেমে সাহায্য করবে ওদের।
একটা হাতির গায়ে ও বুকে অস্ত্রগুলো লাগায় সে পড়ে মারা গেল। কিন্তু অন্য হাতিটার গায়ে তেমন অন্ত্র না লাগায় সে ক্ষেপে গিয়ে গঁড় উঁচিয়ে তেড়ে গেল ওদের দিকে। হাতিরা পাগল হয়ে গেলে বড় ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। তাই তার সামনে কেউ দাঁড়াতে পারল না ওরা। টারজান উপর থেকে দেখল আর একটু হলেই বাসুলিকে ধরে ফেলবে হাতিটা। তাই আর দেরি না করে বাসুলি আর হাতিটার মাঝখানে হঠাৎ গাছ থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়ল টারজান।
হাতিটা এবার তার শিকার হাতছাড়া হয়ে যাবার ফলে একবার থমকে দাঁড়িয়ে টারজানকেই আক্রমণ করল। কিন্তু তার আগেই টারজান একটু ঘুরে গিয়ে তার হাতের বর্শাটা হাতিটার বুকে বিঁধিয়ে দিল। বর্শার ফলকটা তার বুকে আমূল বসে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল হাতিটা। তখন সব নিগ্রো শিকারিরা টারজনের চারদিকে ভিড় করে দাঁড়াল। টারজান হাতির মৃতদেহটার উপর দাঁড়িয়ে মুখ তুলে ভয়ঙ্কর শব্দে গর্জন করে উঠল।
