ছবিটা দেখেই টারজানকে চিনতে পারল জেন। কাতরভাবে বলতে লাগল, মারা গেছে ওকথা বলো না হেজেল। বল, তুমি ঠাট্টা করছ আমার সঙ্গে।
এই কথা বলে মুর্ছিত হয়ে মেঝের উপর পড়ে গেল জেন। হেজেলের চেষ্টায় কিছুক্ষণের মধ্যেই জেনের জ্ঞান ফিরে এলে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে তার মুখপানে তাকিয়ে রইল হেজেল। ব্যাপারটা কিছুই বুঝতে না পেরে বোকার মত বলল, তুমি জন কডওয়েলকে এমন অন্তরঙ্গভাবে ভালবাসতে তা আমি জানতাম না জেন।
জেন বলল, ও জন কডওয়েল নয় হেজেল। ও ছবি হচ্ছে টারজনের। ও ছবি আমার মনের মধ্যে গাঁথা রয়ে গেছে।
হেজেল বলল, উনি বলতেন, আফ্রিকায় ওঁর জন্ম, ফ্রান্সে শিক্ষালাভ করেন।
জেন বলল, হ্যাঁ, তাই।
হেজেল বলল, তাহলে উনি জন কডওয়েল ছদ্মনাম নিয়ে জাহাজে ভ্রমণ করছিলেন। প্যারিসে কেনা ওঁর মালপত্রে জে. সি. টি. এই তিনটি অক্ষর লেখা ছিল। টি-টি টারজনের আদি অক্ষর।
চারদিন তার কেবিনে শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে রইল জেন। সে ঘর থেকে একবারও বার হত না। একমাত্র হেজেল আর এসমারান্ডা ছাড়া তার ঘরে কেউ ঢুকতে পেত না কেউ।
জেনের অসুখের পর একটার পর একটা করে বিপর্যয় দেখা দিতে লাগল জাহাজে। প্রথমে জাহাজের ইঞ্জিন খারাপ হয়ে গেল। ইঞ্জিনের মেরামত চলাকালে দুদিন জাহাজটা আপনা থেকে ভেসে বেড়াতে লাগল মাঝ সমুদ্রে। আর একদিন দু’জন নাবিক ঝগড়া ও মারামারি করতে লাগল। একজন অন্য জনকে ছুরি মারল। একজন আহত হলো আর একজনকে লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হলো। কোন এক রাত্রিতে একটা নাবিক সমুদ্রের জলে ঝাঁপ দিয়ে ডুবে গেল। অনেক খুঁজেও তার মৃতদেহ পাওয়া গেল না।
তখন নাবিকরা বলাবলি করতে লাগল, জাহাজ ছাড়ার সময় ওরা কুলক্ষণ দেখতে পায়। কপালে আরো কষ্ট আছে ওদের।
সত্যিই সে কষ্টের জন্য বেশিদিন অপেক্ষা করতে হলো না ওদের। একদিন বেলা একটার সময় জাহাজের গায়ে একটা ফাটল দেখা দিল। জাহাজটা হঠাৎ কাত হয়ে গেল অনেকখানি। এমন সময় একজন নাবিক তলা থেকে ছুটে এসে খবর দিল, জাহাজে জল ঢুকছে, আর কুড়ি মিনিটের বেশি ভেসে থাকতে পারবে না জাহাজটা।
জাহাজের মালিক টেনিংটন ও সব যাত্রীরা তখন ডেকের উপর জড়ো হয়েছে। টেনিংটন সবাইকে সাহস দিয়ে বলল, ভয়ের কিছু নেই। মহিলারা জিনিসপত্র নিয়ে সব তৈরি হয়ে নিন। যে চারখানা নৌকা আছে তা প্রস্তুত করো।
চারখানা নৌকা যাত্রী বোঝাই হয়ে সমুদ্রে নেমে পড়ল। ওদের চোখের সামনে জাহাজটা ধীরে ধীরে ডুবে গেল।
নৌকার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছিল জেন। পরদিন সকাল হবার অনেক পরে কড়া রোদ উঠতে তার ঘুম ভেঙ্গে গেল। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখল নৌকার উপর রয়েছে সে, ক্লেটন, মঁসিয়ে থুরান আর তিনজন নৌকার মাঝি। অন্য নৌকাগুলোর কোন চিহ্ন দেখতে পেল না কোথাও। চারিদিকে ধূ ধূ করছে শুধু আটলান্টিক মহাসাগরের অনন্ত জলরাশি।
সে রাতে জাহাজ থেকে জলে পড়ার পর টারজনের হুশ হলো। বুঝলো কত সহজে রোকোফের হাতে বোকা বনে গেছে সে। হাত দিয়ে জল কেটে সাঁতার কেটে যেতে লাগল সে। দেখল জাহাজের আলোটা ক্রমে দূরে মিলিয়ে গেল। একবারও সাহায্যের জন্য চীৎকার করল না। জীবনে কখনো সে সাহায্য চায়নি কারো কাছে।
সকালের আলো দিগন্ত ফুটে উঠতেই টারজান দেখল দূরে একটা ভাঙ্গা জাহাজের একরাশ কাঠ ভেসে যাচ্ছে। টারজান কোনরকমে তার উপর উঠে বসল যাতে সাঁতার না কেটেই বিনা আয়েশে বেশ কিছুক্ষণ যাওয়া যায়। সেই ভাঙ্গা কাঠগুলোর উপর চেপেই অল্প সময়ের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল টারজান।
ঘুম ভাঙ্গতেই দুটো জিনিস চোখে পড়ল তার। সে দেখল যে স্থূপাকৃত কাঠগুলো ভেসে চলেছিল পাশে তার মাঝখানে একটা লাইফবোট আছে। আর দূর দিগন্তে বনচাপে ঘেরা একটা উপকূল দেখা যাচ্ছে। তার খুব পিপাসা পেয়েছিল। সে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাশ দিয়ে লাইফবোটটাতে চেপে বসল। সমুদ্রের ঠাণ্ডা জলে সে কিছুটা শীতল হলো। পিপাসাটা কিছু নিবারিত হলো।
নৌকাটা পরীক্ষা করে দেখল সেটা ঠিকই আছে। সেটাতে চেপে কুলের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। বিকালবেলায় সে কূলের কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছল। কুলের গাছপালাগুলো তার অনেক দিনের চেনা মনে। হলো। অনেকদিন পরে তার প্রিয় কেবিনটাকে দেখতে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠল টারজান।
সেখান থেকে অন্য এক জনবসতির সন্ধানে এগিয়ে চলল টারজান। পথে বাঁদর-গোলিরাদের মত পড়ে থাকা পচা কাঠের গায়ে গজিয়ে ওঠা কিছু ব্যাঙের ছাতা তুলে খেল সে। সে রাতটা গাছের উপর ঘুমিয়ে কাটাল টারজান। পরদিন দেখল বনটা পাতলা হয়ে অদূরে কয়েকটা পাহাড়ের দিকে উঠে গেছে। পাহাড়ের মাঝখানে উপত্যকা দেখা যাচ্ছে। সেখানে কত হরিণ আর জেব্রা ঘুরে বেড়াচ্ছে।
সহসা দূরাগত মানুষের গন্ধ পেল সে বাতাসে। টারজান একটা গাছের উপর ওৎ পেতে বসে রইল। দেখল একজন নিগ্রো যোদ্ধা বর্শা ও তীর ধুনক হাতে সেইদিকেই আসছে। তার গলায় ফাঁস লাগাবার জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠল টারজান। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে হলো, তাকে হত্যা না করেও তার অস্ত্রগুলো সে পেতে পারে।
এমন সময় একটা সিংহ সেই কৃষ্ণকায় লোকটাকে আক্রমণ করতে উদ্যত হলো। কিন্তু সিংহটা লোকটাকে লক্ষ্য করে পা তুলে ঝাঁপ দিতেই তার গলাটায় টারজনের ফেলে দেওয়া ফাসটা আটকে গেল। টারজান দড়ি ধরে সিংহটাকে তুলতে গিয়ে তার ভার সামলাতে না পেরে হঠাৎ পড়ে গেল গাছ থেকে। সিংহটা এবার এক নতুন শত্রু পেয়ে টারজনের উপর ঝাঁপ দিতে যাচ্ছিল। কিন্তু নিগ্রোটা তখন তার হাতের বর্শাটা সজোরে ছুঁড়ে দিল সিংহটাকে লক্ষ্য করে। বর্শাটা সিংহের বাঁ দিকের ঘাড়টাকে বিদ্ধ। করল। সময় পেয়ে টারজান তার হাতের দড়িটা গাছের গুঁড়িতে শক্ত করে বেঁধে নিল। নিগ্রোটা এবার এক বিষাক্ত তীর মারল সিংহটার পাঁজরে। টারজান তার হাত থেকে ছুরিটা নিয়ে সিংহটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বার বার সেটা বসিয়ে দিতে লাগল তার গায়ে। পরে সিংহটা মরে গেলে দু’জনে দু’জনের মুখপানে তাকাল। দু’জনেই দু’জনকে তাদের উদ্ধারকর্তা হিসাবে মেনে নিল। দু’জনেই দু’জনকে ধন্যবাদ দিল আপন আপন ভাষায়।
