একদিন জিব্রাল্টার প্রণালী থেকে দুটো জাহাজ ছাড়ল। দু’টোর গতিপথ একই দিকে। অপেক্ষাকৃত ছোট জাহাজটাতে বসে জেন তখন আফ্রিকার জঙ্গল আর জঙ্গলের সেই মানুষটার কথা ভাবছিল।
এদিকে বড় জাহাজটা যখন জেনদের ছোট জাহাজটাকে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল তখন তার ডেকে কডওয়েল নামধারী টারজান স্ট্রং-এর সঙ্গে কথা বলছিল।
কথা প্রসঙ্গে একসময় টারজান বলল, আমি আমেরিকা সত্যিই ভালবাসি। এই আমেরিকাতে আমার পরিচিত এমন দু’জন আছেন যাদের কথা আমি কখনো ভুলব না। তাঁরা হলেন জেন পোর্টার আর অধ্যাপক পোর্টার।
হেজেল আশ্চর্য হয়ে বলল, আপনি জেন পোর্টারকে চেনেন? সে ত আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু। ছোটবেলা থেকে একসঙ্গে আমরা মানুষ হয়েছি বোনের মত। কিন্তু এখন আমি তাকে হারাতে বসেছি।
টারজান বলল, তার মানে ওঁর কি বিয়ে হয়ে গেছে?
হেজেল বলল, সবচেয়ে দুঃখের কথা কি জানেন ও যাকে ভালবাসে তাকে ও বিয়ে করছে না। ও শুধু কর্তব্যের খাতিরে বিয়ে করছে অন্য একজনকে। আমি তাকে স্পষ্ট বলে দিয়েছি এটা খুব খারাপ। যার জন্য আমি তার বিয়েতে যাবও না।
টারজান বলল, আমি তার জন্য দুঃখিত।
হেজেল বলল, আমি দুঃখিত সেই মানুষটির জন্য যাকে ও ভালবাসে এবং যে ওকে ভালবাসে। আমি তাকে জীবনে কখনো দেখিনি, কিন্তু জেনের কাছে শুনেছি সে এক অদ্ভুত মানুষ। আফ্রিকার জঙ্গলে তার জন্ম হয় এবং ভয়ঙ্কর বাদর-গোরিলাদের দ্বারা নালিত-পালিত হয়। সে ওদের সকলকে কয়েকবার মৃত্যুর কবল থেকে উদ্ধার করে এবং আরো কত উপকার করে। সে জেনের প্রেমে পড়ে যায় এবং জেনও যে তাকে ভালবাসে একথা সে ক্লেটনকে বিয়ে করার কথা দেওয়ার আগে পর্যন্ত জানতে পারেনি।
হেজেলের মুখ থেকে জেনের কথা শুনতে ভাল লাগছিল টারজনের। কিন্তু যখন সে কথার মধ্যে তার নাম এসে পড়ল তখন অস্বস্তি বোধ করতে লাগল টারজান। তাই প্রসঙ্গটা পাল্টে দেবার চেষ্টা করতে লাগল সে।
একদিন টারজান দেখল মঁসিয়ে থুরান নামে জাহাজের এক যাত্রীর সঙ্গে কথা বলছে হেজেল। হেজেল তার সঙ্গে ঘুরানের পরিচল করিয়ে দিল। থুরানকে দেখে টারজনের মনে হলো সে যেন কোথায় তাকে দেখেছে এর আগে। অথচ ঠিক মনে করতে পারছে না। থুরান বসবার চেয়ারটাকে সরাতে গেলে টারজান লক্ষ্য করল তার বাঁ হাতটা ভাঙ্গা; আর রোকোফই দাড়ি কামিয়ে থুরানের নাম ধরে বেড়াচ্ছে।
কোন একটা অজুহাত দেখিয়ে রোকোফ সেখান থেকে চলে যেতে রোকোফের কাঁধে একটা হাত রেখে টারজান বলল, এখানে কি খেলা খেলছ রোকোফ?
রোকোফ বলল, আমি তোমার কথামতই ত ফ্রান্স ত্যাগ করেছি।
টারজান বলল, তা ত দেখছি। কিন্তু ছদ্মবেশ ধারণ করে এ জাহাজে নিশ্চয় বিনা মতলবে আসনি।
রোকোফ বলল, ছদ্মনাম তুমিও ত ধারণ করেছ। সুতরাং আমারও এতে অধিকার আছে।
এরপর ক’দিন রোকোফকে আর দেখতে পেল না টারজান। কিন্তু টারজান তাকে দেখতে না পেলেও চুপ করে বসে ছিল না রোকোফ। সে পলভিচের সঙ্গে সব সময় টারজনের উপর চরম প্রতিশোধ নেওয়ার কথা ভাবছিল।
সেদিন রাত্রিতে ডেকের উপর কোন লোক ছিল না। টারজান একা রেলিং ধরে আনমনে দাঁড়িয়েছিল। ডেকের উপরটা অন্ধকার দেখাচ্ছিল। টারজান আনমনে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকায় সে বুঝতে পারেনি দু’জন লোক পা টিপে টিপে চুপিসারে এগিয়ে আসছে তার দিকে।
রোকোফ আর পলভিচ দু’জনে অতর্কিতে টারজনের দুটো পা পিছন থেকে ধরে টারজান কিছু বুঝতে পারার আগেই তাকে জলে ফেলে দিল।
জাহাজের যাত্রীরা কেউ জানতে পারল না ব্যাপারটা। একমাত্র হেজেল স্ট্রং তার কেবিল থেকে জলের উপর একটা ভারী জিনিস পড়ার শব্দ শুনেত পেল। মনে হলো কে যেন জলে ঝাঁপ দিল। কিন্তু ব্যাপারটাকে তেমন কোন গুরুত্ব দিল না সে।
প্রতিদিন হেজেলের সঙ্গে প্রাতঃরাশ খেত টারজান। কিন্তু এই ঘটনার পরদিন সকালে প্রাতঃরাশের টেবিলে এল না টারজান।
এবার জাহাজের ক্যাপ্টেনকে ব্যাপারটা জানাল হেজেল। ক্যাপ্টেন সঙ্গে সঙ্গে কডওয়েল নামধারী একজনকে খোঁজ করার হুকুম দিল। কিন্তু কোথাও কডওয়েলকে পাওয়া গেল না। হেজেল শুধু বলল, গত রাতে সে জলে ঝাঁপ দেওয়ার মত একটা শব্দ শুনতে পেয়েছিল। এর বেশি কিছু জানে না।
দু’দিন দুশ্চিন্তায় কেবিন থেকে বার হলো না হেজেল। তার চোখে মুখে গভীর উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। চোখের কোণে কোণে কালি পড়েছিল। একদিন সে ডেকের উপর বার হতেই মঁসিয়ে থুরান নামধারী রোকোফ এসে তাকে বলল, আমিও ব্যাপারটা মন থেকে কিছুতেই মুছে ফেলতে পারছি না মিস স্ট্রং।
হেজেল ক্রমে জানতে পারল টেনিংটনের জাহাজে করে জেনরা আফ্রিকা ভ্রমণে বার হয়েছে। এক সপ্তা কেপটাউনে থাকার পর জাহাজটা আবার রওনা হয়ে পশ্চিম উপকূল হয়ে ইংল্যান্ডে ফিরে যাবে।
তখন দুই বান্ধবীতে ক’দিন ধরে খুব আনন্দে কাটাল।
অবশেষে ঠিক হলো হেজেলরাও একই জাহাজে জেনদের সঙ্গে ইংল্যান্ডে যাবে। ক্লেটন হেজেলদের তাদের বাড়িতে যাবার জন্য আমন্ত্রণ জানাল।
কেপটাউন ছাড়ার দু’দিন পর জাহাজে একদিন হেজেলের কেবিনে জেন বসে কথা বলছিল হেজেলের সঙ্গে। হঠাৎ একটা ছবি জেনকে দেখাতে গিয়ে হেজেল বলল, ইনি হচ্ছেন জন কডওয়েল। ইনি বলেছিলেন ইনি তোমাকে চেনেন। জাহাজে আসার পথে আলাপ হয়। ভদ্রলোক একদিন সমুদ্রের জলে পড়ে মারা যান।
