টারজান আউলেদের কাছ থেকে ছুরিটা নিয়ে তাকে বলল, তুমি চলে যাও। আমি দেখছি।
আউলেদ চলে গেল না। শুধু একটু সরে দাঁড়াল। সিংহটা এবার টারজনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠল। সিংহের সঙ্গে কিভাবে লড়াই করতে হয় টারজান তা জানত। সে সিংহটার পিছন দিক দিয়ে এক আশ্চর্য ক্ষিপ্রতার সঙ্গে তার পিঠের উপর উঠে পড়ে তার কেশরগুলো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তারপর তার হাতের ছুরিটা বারবার সিংহটার গলায় ও পাঁজরে আমূল বসিয়ে দিতে লাগল। অবশেষে সিংহটা নিষ্প্রাণ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে তার মৃতদেহের উপর পা তুলে দিয়ে চাঁদের দিকে মুখ তুলে বাঁদর-গোরিলাদের ভঙ্গিতে এক বিকট গর্জন করে উঠল।
আউলেদ ভয় পেয়ে গেল। তার মনে হলো টারজান যেন পাগল হয়ে গেছে। আউলেদ বলল, কি ধরনের মানুষ তুমি। তুমি যেভাবে সিংহটাকে মারলে তা ভাবাই যায় না। এমন কথা কখনো শুনিনি আমি। কিন্তু ওভাবে চীৎকার করলে কেন তুমি?
টারজান বলল, যখন আমি কাউকে হত্যা করি তখন আমি যেন মানুষ থাকি না, আমি যেন পশু হয়ে যাই।
আবার তারা যাত্রা শুরু করল। পাহাড়ি পথ পার হয়ে মরুপথে গিয়ে পড়ল। কিছুদূর যাবার পর ওরা একটা ছোট নদীর ধারে এসে দেখলো ঘোড়া দুটো চরছে। সেই ঘোড়া দুটোতে দু’জন চেপে ওরা যখন কাদুর বেন সাদেনের বাড়িতে পৌঁছল তখন বেলা নটা বাজে। কাদুন তখন বাড়ি ফিরে তার মেয়েকে দেখতে না পেয়ে পঞ্চাশজন সশস্ত্র লোক নিয়ে মেয়ের খোঁজে বার হবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল। এমন সময় মেয়েকে দেখতে পেয়ে তার মুখ থেকে সব কথা শুনে টারজনের প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে গেল কাদুরের। টারজান শুধু একটা ছুরি দিয়ে একটা সিংহকে বধ করেছে একথা শুনে আরবরা সবাই টারজানকে অপরিসীম শ্রদ্ধা ও সম্মানের সঙ্গে দেখতে লাগল।
এক সপ্তাহ কাদুরের বাড়িতে অতিথি হিসাবে রইল টারজান। তারপর সে বিদায় নেবার সময় কাদুর পঞ্চাশজন সশস্ত্র আরবকে সঙ্গে নিয়ে টারজনের সঙ্গে বু সাদা পর্যন্ত গেল। টারজান এখন ওখানে গিয়ে তার দলের সঙ্গে মিলিত হবে।
পরদিন সকালে টারজান একটা ঘোড়ায় চেপে বুইরা ও আলজিয়ার্সের পথে রওনা হলো। জার্নয় যে হোটেলে ছিল, তার সামনে দিয়ে যাবার সময় দেখল হোটেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে রয়েছে জার্নয়। টারজান হাত তুলে নমস্কার করতে জার্নয়ও যন্ত্রচালিতের মত প্রতিনমস্কার জানাল। তার মুখে স্পষ্ট ভয়ের চিহ্ন ফুটে ছিল।
সিদি এই সাথে টারজান পৌঁছতেই এক ফরাসী অফিসারের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল টারজনের।
অফিসার তাকে জিজ্ঞাসা করল, আজ সকালেই বু সাদ। ত্যাগ করেছ? জার্নয়কে দেখেছিলে?
টারজান বলল, হা, কি ব্যাপার?
জার্নয় আজ সকাল আটটার সময় গুলি করে আত্মহত্যা করেছে।
দুদিন পর সেখান থেকে আলজিয়ার্স শহরে গিয়ে পৌঁছল টারজান। এখান থেকে সে সরকারের নির্দেশে একটা জাহাজে করে কেপটাউন শহরে যাবে। যাবার আগে সে কর্তব্য ভার গ্রহণ করার পর থেকে যা যা ঘটেছে তার একটা পূর্ণ বিবরণ লিখল।
টারজান জাহাজে ওঠার সময় দেখল দু’জন সৌখিন পোশাক পরা লোক তাকে লক্ষ্য করছে বিশেষভাবে। দু’জনেরই মুখ দাড়ি কামানো। কর্তৃপক্ষের নির্দেশে এক ছদ্মনাম গ্রহণ করেছিল টারজান। জাহাজে যাত্রাকালে তার নাম হবে কডওয়েল, লন্ডন।
সেদিন রাত্রিতে জাহাজে এক তরুণীর সঙ্গে আলাপ হলো। তরুণীটির সঙ্গে তার মা ছিল। তরুণীর নাম হেজেল স্ট্রং। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল টারজনের এই হেজেল স্ট্রংকে উদ্দেশ্য করেই জেন পোর্টার একখানি চিঠি লিখেছিল তার কেবিনে থাকাকালে। হেজেল জেনের বিশেষ অন্তরঙ্গ বন্ধু।
কয়েক মাস আগে টারজান যখন ইউসকনসিন স্টেশনে জেনদের কাছ থেকে বিদায় নেয় তার কিছু পরে টারজনের কাছে পাঠানো দার্ণতের টেলিগ্রামটা পায় ক্লেটন। টেলিগ্রামটায় লেখা ছিল, তোমার আঙ্গুলের ছাপ থেকে একথাই প্রমাণিত হয় যে তুমিই লর্ড গ্রেস্টোক।
এই কথাগুলো পড়েই মুহূর্তে টারজনের জন্ম রহস্যটা উদ্ঘাটিতে হয়ে পড়ে ক্লেটনের কাছে। বুঝতে পারল সে নিঃস্ব। তার কিছু নেই। যে বিরাট ভূ-সম্পত্তি ও লর্ড উপাধি সে ভোগ করছে আসলে তা সব টারজনের।
জেনরা ক্লেটনকে ডাকতেই প্লাটফরমে গাড়ি এসে গেল। ক্লেটন ওদের জিজ্ঞাসা করল, টারজান কোথায়?
জেন বলল, ও তার গাড়িতে করে চলে গেছে। ও এখান থেকে নিউ ইয়র্ক যাবে।
ক্লেটন তখন টেলিগ্রামটার কথা কাউকে বলল না।
বাল্টিমোরে পৌঁছে ক্লেটন তাড়াতাড়ি বিয়েটা সেরে ফেলতে চাইল। বলল, আমি লন্ডনে ফিরে যাব। বিয়ের পর তোমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চাই।
জেন বলল, এত তাড়াতাড়ি সম্ভব নয়। এখনো এক মাস দেরী হবে।
বাবার সঙ্গে লন্ডনে আসার পরেও জেনের মতের পরিবর্তন হলো না। বিয়েটা সে কিছুতেই সেরে ফেলতে চাইল না। এমন সময় টেনিংটন নামে এক ভদ্রলোক অধ্যাপক পোর্টারের কাছে জলজাহাজে আফ্রিকা ভ্রমণের এক প্রস্তাব আনতেই রাজি হয়ে গেল জেন। জেন তখন একটা অজুহাত পেয়ে গেল। ক্লেটনকে বলল, আমাদের ফিরতে অন্তত এক বছর লাগবে। তার আগে বিয়েটা সম্ভব নয়। টেনিংটনের জাহাজটা প্রথমে ভূমধ্য সাগর হয়ে লোহিত সাগরে যাবে। সেখান থেকে ভারত মহাসাগর। আফ্রিকার পূর্ব উপকূল বরাবর যাবার পথে বড় বড় বন্দরগুলোতে থামবে।
