একটা গুলি খেয়েই ভয়ঙ্করভাবে ঝাঁপ দিল সিংহটা। কিন্তু টারজানও এক আশ্চর্য ক্ষিপ্রতার সঙ্গে সব বিপদকে কাটিয়ে পর পর তিন চারটে গুলি করল। অবশেষে সিংহটা মরে গেল। তখন মরা সিংহটার। গায়ের উপর পা দিয়ে চাঁদের দিকে মুখ তুলে এমন জোরে বাঁদর-গোরিলাদের মত গর্জন করে উঠল যে আধ মাইল দূরে. একদুল আরব তা শুনতে পেয়ে চমকে উঠল।
টারজান বুঝল জার্নয় আর আসবে না। এটা তার এক চক্রান্ত। তাই সে সেখান থেকে হাঁটতে লাগল। কারণ সিংহটা গুলি খেয়ে লাফ দেবার সময় ঘোড়াটা দড়ি ছিঁড়ে পালিয়ে যায়।
সহসা একদল মানুষের চাপা পদশব্দ শুনে চমকে উঠল টারজান। চাঁদের আলোয় সে দেখল সাদা আলখাল্লা পরা একদল আরব হাতে লম্বা লম্বা বন্দুক নিয়ে আসছে তার দিকে। টারজান ফরাসী ভাষায় জিজ্ঞাসা করল তারা কি চায়। সঙ্গে সঙ্গে বন্দুকের একটা গুলি এসে তার কপালটা একটু ছিঁড়ে দিয়ে চলে গেল। মুখ থুবড়ে পড়ে গেল টারজান।
তখন তারা টারজানকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে একটা ঘোড়ার উপর চাপিয়ে দিল। তারপর সেখান থেকে ঘোড়া ছুটিয়ে সকলে যাত্রা শুরু করল। এইভাবে ছ’ঘণ্টা মরুভূমির উপর দিয়ে দ্রুতবেগে যাবার পর পরদিন দুপুরে ওরা একটা আরবদের বস্তিতে গিয়ে উঠল। বস্তিটা ছোট, মাত্র কুড়িটা তাবু আছে। একটা আরব সর্দারের বাড়িতে গিয়ে বন্দী টারজানকে নিয়ে উঠল ওরা।
এমন সময় একজন বুড়ো শেখ এসে সবাইকে বলল, কেউ বন্দীর গায়ে হাত দেবে না। আলি বেন আমেদ বলেছে, ও একজন বীর; একটা সিংহ মেরে পাহাড়ের ধারে একা বসেছিল। বন্দী যেই হোক, একজন বীর পুরুষ এবং তাকে আমরা শ্রদ্ধা করব যতক্ষণ সে আমাদের এখানে থাকবে। ছাগলের চামড়া দিয়ে তৈরি একটা তাঁবুর মধ্যে বন্দী টারজানকে রেখে তাকে কিছু খাবার দেওয়া হলো। দরজার কাছে। পাহারাদার বসিয়ে দেওয়া হলো। ওদের কথা শুনে টারজান বুঝল যেসব আরব ওকে ধরে এনেছে তারা তাকে একজন লোকের হাতে তুলে দেবে। সেই লোকটার দ্বারাই একাজে নিযুক্ত হয়েছে তারা।
গোধূলিবেলায় একদল আরব টারজনের তাবুর সামনে এসে দাঁড়াল। তাদের মধ্যে একজন টারজনের কাছে আসতেই টারজান তাকে চিনতে পারল। সে হচ্ছে নিকোলাস রোকোফ। রোকোফ বলল, কি মঁসিয়ে টারজান, ওঠ, আমাকে অভ্যর্থনা করো কুকুর কোথাকার!
এই বলে সে পর পর কয়েকটা লাথি মারল টারজানকে।
টারজান কোন কথা বলল না। তখন সেই বুড়ো শেখ সর্দার এগিয়ে এসে বলল, পরে যা করো করবে, আমার সামনে কোন বীর পুরুষকে মারতে বা অপমান করতে দেব না কাউকে। আমি তাহলে ওর বাঁধন খুলে দেব। তখন দেখব তুমি কেমন মার ওকে।
রোকোফ শেখকে চটাতে চাইল না। সে থেমে গেল। বলল, ঠিক আছে, পরে আমি ওকে খুন করব।
শেখ বলল, আমার বাড়ির সীমানার মধ্যে নয়। আগামীকাল সকালে তুমি একে নিয়ে মরুভূমিতে গিয়ে যা পার করবে। তবে যাই করো আমাদের গায়ের সীমানা পার হবার আগে নয়।
রোকোফ তাতেই রাজী হয়ে চলে গেল সেখান থেকে।
ক্রমে রাত বাড়তে লাগল। তাঁবুতে একা পড়ে রইল টারজান। হঠাৎ সিংহের ডাক শুনতে পেয়ে চমকে উঠল সে। বস্তিটার বাইরে কিছু দূরে একটা সিংহ গর্জন করছিল। ক্রমে সেই সিংহটা তাঁবুর দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। টারজান ভাবতে লাগল সে ত আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাঁচবে। তাতে যদি সিংহের হাতে প্রাণ যায় ত যাবে।
তাঁবুর ভিতরটা ভীষণ অন্ধকার। সে অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না। সহসা টারজান বুঝতে পারল তাঁবুটা সরিয়ে এক পাশ থেকে কে ঢুকছে। ওর মনে হলো রাতের অন্ধকারে নির্জনে তাকে হত্যা করতে আসছে রোকোফ। কিন্তু এক নারীকণ্ঠ তার নাম ধরে ডাকতেই টারজান বলল, হ্যাঁ আমি। কিন্তু তুমি কে?
নারীকণ্ঠ উত্তর করল, আমি সিদি এইসার আউলেদ নাইন।
সঙ্গে সঙ্গে টারজান দেখল আউলেদ তার ছুরি দিয়ে তার বাঁধনগুলো কেটে দিচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে গেল টারজান।
টারজান বলল, তুমি কেন এখানে এলে? কি করে জানলে আমি এখানে বন্দী হয়ে পড়ে আছি?
আউলেদ বলল, আমি কাদুর বেন সাদেনের মেয়ে। আমাকে যে একদিন উদ্ধার করেছে তার জন্য আমার জীবনকে বিপন্ন করব সে আর বেশি কথা কি?
টারজান বলল, কিন্তু কেমন করে তুমি জানলে যে আমি বন্দী হয়েছি?
আচমেত তয়েব নামে আমার এক জ্ঞাতি ভাই তার কোন বন্ধুর সঙ্গে এখানে দেখা করতে এসেছিল। তোমাকে এখানে যারা ধরে এনেছিল তাদেরই একজন তার বন্ধু। সে গিয়ে আমাদের বলে একজন ফরাসীকে অন্য একজন ফরাসীর হাতে তুলে দেবার জন্য তারা বন্দী করে আনে। তার বিবরণ থেকে বুঝতে পারি তুমিই সেই ফরাসী। তখন আমার বাবা বাড়িতে ছিল না। আমি দুটো ঘোড়া নিয়ে চলে আসি এখানে। কাল সকালে আমরা আমাদের বাড়ি গিয়ে পৌঁছব। তখন আমার বাবা এসে যাবে। তখন, দেখব ওরা কেমন করে কাদুরের বন্ধুকে ছিনিয়ে আনে তার কাছে থেকে।
এক জায়গায় এসে আউলেদ সভয়ে বলল, আমি ত ঠিক এইখানে ঘোড়া দুটোকে ছেড়ে রেখে যাই। কিন্তু এখানে নেই ত।
টারজান বলল, সিংহ দেখে ঘোড়া দুটো বোধ হয় ছুটে পালিয়ে গিয়েছে।
অগত্যা আবার হাঁটতে লাগল ওরা। এখানকার পথঘাট আউলেদের সব চেনা।
সহসা এক সময় একটা কালো সিংহ ওদের পথ রোধ করে সামনে এসে দাঁড়ালো। তার হলুদ চোখ দুটো জ্বলছিল। আউলেদ হতাশ হয়ে বলল, সব শেষ।
