সেইদিনই দার্ণতের একখানা চিঠি পেল টারজান; চিঠিতে লেখা ছিল, প্রিয়, তোমাকে আগের চিঠিখানা লেখার পর আমি একটি কাজে একবার লন্ডনে গিয়েছিলাম। সেখানে তিনদিন ছিলাম। প্রথম। দিনই হেনরিয়েটা স্ট্রীটে তোমার ফিলান্ডার নামে এক বন্ধুর সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে যায়। তাঁর অনুরোধে তার সঙ্গে তাঁদের হোটেলে যাই। সেখানে গিয়ে আমি অধ্যাপক পোর্টার, জেন পোর্টার ও এসমারাল্ডাকে দেখতে পাই। পরে ক্লেটনও সেখানে এসে উপস্থিত হয়। ওদের বিয়ে হবেই এবং বিয়ের দিনটা যেকোন দিন ঘোষিত হবে।
আমি যখন ফিলান্ডারের সঙ্গে একা ছিলাম তখন ভদ্রলোক আমাকে কতকগুলো গোপন কথা বললেন। তিনি বললেন, মিস পোর্টার এর আগে তিনবার বিয়েটা স্থগিত রাখে। তাঁর মতে মিস পোর্টার আসলে ক্লেটনকে বিয়ে করতে মোটেই উৎসাহী নয়।
তাঁরা অবশ্য সকলেই তোমার কথা জিজ্ঞাসা করেন। তবে আমি তোমার কথামত তোমার জন্মের ব্যাপারে কোন কথা বলিনি। শুধু বর্তমানে তুমি কোথায় আছ বা কি করছ সেই কথাই বলেছি। মিস পোর্টারকে অবশ্য তোমার ব্যাপারে খুবই উৎসাহী দেখা গেল এবং তোমার সম্বন্ধে সে অনেক কথাই জিজ্ঞাসা করল। আমি তোমার জঙ্গলে ফিরে যাওয়ার বাসনার কথাও বললাম।
তোমার কথা আলোচিত হবার সময় দেখলাম ক্লেটন যেন ঘাবড়ে গেল। তবু তোমার প্রতি সে তার মমতার পরিচয় দেয় এবং তোমার ব্যাপারে যথেষ্ট আগ্রহ প্রকাশ করে।
গত পরশু আমি প্যারিসে ফিরে এসেছি। গতকাল কাউন্ট ও কাউন্টপত্নীর সঙ্গে দেখা করেছি। তারা। তোমার কথা জিজ্ঞাসা করেছিল। আমি সুযোগ পেলেই তোমাকে আবার চিঠি দিচ্ছি। ইতি তোমার বন্ধু
পল দার্ণৎ।
চিঠিটা শেষ করে টারজনের মনে এক সকরুণ আনন্দের অনুভূতি জাগল।
এরপর তিনটি সপ্তা ধরে বিশেষ কোন ঘটনা ঘটল না। জার্নয় তাকে আগের থেকে বেশি করে এড়িয়ে চলত। সেই রহস্যময় অচেনা আরবটাকে দু’দিন দেখতে পায়।
বু সাদার জঙ্গল এলাকায় শিকার করে বেড়াতে লাগল টারজান।
সেদিন জঙ্গলে একটা পাহাড়ের ধারে শিকার করেত গিয়ে অল্পের জন্য বেঁচে গেল টারজান। ঘোড়ায় চড়ে সে যখন একটা জায়গায় যাচ্ছিল তখন একটা গুলি হঠাৎ তার মাথার শিরস্ত্রানটাকে অল্প ছুঁয়ে চলে যায়।
সেই রাত্রিতে তার বন্ধু ক্যাপ্টেন জিরার্দ টারজানকে খাবার সময় বলল, বুঝেছি এখানে শিকার করে তোমার সুখ হচ্ছে না। আমি আর জার্নয় একশো জন সৈনিক নিয়ে দেলফা যাচ্ছি আগামীকাল। ওখানকার একটা জেলায় ব্যাপকভাবে শান্তিভঙ্গ হওয়ায় সরকার আমাদের সেখানে যাবার আদেশ দিয়েছে। তুমি সেখানে সিংহ শিকার করতে চাও ত যেতে পার আমাদের সঙ্গে।
সঙ্গে সঙ্গে সানন্দে রাজী হয়ে গেল টারজান। জার্নয় কাছেই ছিল। সে কিন্তু এতে মোটেই খুশি হতে পারল না।
পরদিন সকালে রওনা হবার সময় টারজান দেখল তাদের সেনাদলের সঙ্গে দু’জন আরব ওদের সঙ্গ নিল। টারজনের এক প্রশ্নের উত্তরে জিরার্দ বলল, আমাদের সঙ্গে ওদের কোন সম্পর্ক নেই। ওরা এমনি সঙ্গে যাবে আমাদের।
টারজান আরবদের প্রকৃতি জানত। তারা বিদেশীদের মোটেই পছন্দ করে না। তারা কখনো বিনা কারণে ফরাসী সৈন্যদের সঙ্গে যাচ্ছে না। তার মনে সন্দেহ জাগায় সে তাদের উপর কড়া নজর রাখতে লাগল। আরবগুলো সেনাদলের শেষে অনেকটা পিছনে পিছনে আসছিল। টারজনের মনে হলো ওরা ভাড়াটে হত্যাকারী। আলজিরিয়ার জঙ্গলে তাকে হত্যা করলে কারো মনে কোন সন্দেহ জাগবে না।
দেলফাতে শিবির স্থাপন করে দু’দিন কাটানোর পর ঠিক হলো ওরা দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে যাবে কারণ সেখানে লুণ্ঠনকারীরা পাহাড়ের পাদদেশের অধিবাসী উপজাতিদের ধনপ্রাণ হানি করছে। এই মর্মে খবর আসায় ক্যাপ্টেন জিরার্দ সেখানে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু যাবার সময় টারজান দেখল সেই দু’জন আরব তাদের সঙ্গে যাচ্ছে না। অথচ আধঘন্টা আগেও জার্নয় সেই সব আরবদের একজনের সঙ্গে কথা বলেছে।
সেখান থেকে আবার যাত্রা শুরু করে একটা শিবিরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করল। সেখানে ক্যাপ্টেন জিরার্দ তার সেনাদলকে দু’দলে বিভক্ত করে দু’দিকে যাবার আদেশ দিল। একটা দলের নেতৃত্ব করবে সে নিজে আর একটা দলের সঙ্গে থাকবে জার্নয়। টারজান কোন দলে যাবে তা জিজ্ঞাসা করলে জার্নয় বলল, মঁসিয়ে টারজান আমার সঙ্গে চলুন।
ওরা একটা উপত্যকায় এসে পড়ল। চারদিকে ছোট ছোট পাহাড়। জার্নয় টারজানকে বলল, এবার আমরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ব। আমরা ফিরে না আসা পর্যন্ত তুমি এখানেই থাক।
টারজান বলল, আমিও তোমার সঙ্গে যাব। দরকার হলে লড়াই করব।
জার্নয় বলল, তুমি আমার অধীন। আমার আদেশ মেনে চলতে হবে তোমাকে।
এই বলে সে তার দলবল নিয়ে চলে গেল। টারজান একা সেখানে রয়ে গেল। তখন বিকেল হয়ে গেছে। টারজান একটা গাছের গুঁড়িতে ঘোড়াটাকে বেঁধে রেখে নিজে দাঁড়িয়ে রইল। সে রাইফেলটা পরীক্ষা করে দেখল তাতে গুলি ভরা আছে। ক্রমে সন্ধ্যে হয়ে গেলেও জার্নয় ফিরে এল না দেখে চিন্তিত হয়ে পড়ল টারজান।
ভাবতে ভাবতে অল্প সময়ের মধ্যেই গাছে ঠেস দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল টারজান। কিন্তু হঠাৎ ঘুমটা। ভেঙ্গে গেল টারজনের। টারজান দেখল ঘোড়াটা দড়ির বাঁধন ঘেঁড়ে জন্য ছটফট করছে এবং অদূরে একটা কালো সিংহ দাঁড়িয়ে রয়েছে। বহুদিন পর সামনাসামনি একটা সিংহ দেখে ভয়ের পরিবর্তে আনন্দের রোমাঞ্চ জাগল টারজনের মধ্যে। কিন্তু এখন কোন বর্শা বা বিষাক্ত তীর নেই তার হাতে। তাই রাইফেল নিয় তৈরি হলো সে।
