টারজান আবদুলকে বলল, ওকে বলে দাও, আমি ওর কোন ক্ষতি করিনি। ও যেন এখান থেকে চলে যায়।
আবদুল আরবি ভাষায় লোকটাকে তাই বললে সে টারজানকে কুকুর বলে গাল দিল। বলল, তার বাবা কুকুর আর তার মা হায়েনা। একথা শুনে উপস্থিত অন্যান্য আরবরা হাসতে লাগল।
যে লোকটা গালাগালি করছিল তার মুখে একটা জোর ঘুষি মেরে দিল টারজান ৷ সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত আরবরা ছুটে এল শ্বেতাঙ্গ টারজানকে মারার জন্য।
টারজান আর আব্দুলকে আক্রমণ করার জন্য একসঙ্গে অনেক লোক এসে তাদের সামনে ঝাঁক বেঁধে তেড়ে এল। হঠাৎ টারজান একটা আরব যুবককে ধরে তার হাত থেকে অস্ত্রটা কেড়ে নিয়ে তাকে ঢাল হিসেবে তুলে ধরে সামনে পথ করে দু’জনে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। তারপর অন্ধকার উঠোনটার এক প্রান্তে গিয়ে তারা দাঁড়াতেই ওরা দেখল দু’জন আরব রিভলবার থেকে গুলি করতে করতে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। তাদের গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হতেই টারজান তাদের উপর লাফিয়ে পড়ল। একটা লোকের একটা হাতের কব্জি ভেঙ্গে যেতে সে পড়ে গেল। আর একটা লোকের পেটে ছুরি মেরে আবদুল তার নাড়িভুঁড়ি বার করে দিল।
সহসা টারজনের পিছন থেকে আউলেদ নামে সেই নাচিয়ে মেয়েটি তাদের ডেকে ঘরের ভিতর দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে তিনতলার ছাদের ঘরের উপর নিয়ে গেল। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই একদল আরব সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে আসতে লাগল। কিন্তু একসঙ্গে অনেক লোক তাড়াহুড়ো করে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গেলে পুরনো সিঁড়ি অত লোকের ভার সহ্য করতে না পেরে ভেঙ্গে গেল। অনেক লোক পড়ে গিয়ে আহত হল।
আউলেদ বলল, এখানে বেশিক্ষণ আমাদের থাকা চলবে না। এখনি ওরা এসে পড়বে। ওরা ছাড়বে না। আমাকেও পালাতে হবে। কারণ ওরা জেনে গেলে আমি তোমাদের এখানে নিয়ে এসেছি।
টারজান বলল, ভেবো না, তুমি যেখানে যেতে চাও, আমি পাঠিয়ে দেব নিরাপদে।
আউলেদ বলল, আসলে আমি বন্দী।
টারজান আশ্চর্য হয়ে বলল, বন্দী!
আউলেদ বলল, হ্যাঁ, এদেশের দক্ষিণাঞ্চলে আমাদের বাড়ি। আমাকে দুবৃত্তরা বাড়ি থেকে চুরি করে এনে এই হোটেলওয়ালার কাছে বিক্রি করে দেয়। সেই এই হোটেলে নাচিয়ের কাজ করতে দেয় আমাকে। আমার বাবার নাম কাদুর বেন সাদেন।
টারজান বলল, তিনি ত এই শহরেই আছেন। কিছুক্ষণ আগে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়।
টারজান এবার ছাদে উঠে গিয়ে পাশের বাড়ির একটা ছাদে চলে গেল। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর টারজান সেই বাড়ির জানালা ও পাইপ বেয়ে আউলেদকে কাঁধে নিয়ে রাস্তায় নেমে এল। আবদুলও তার মত নামল।
এরপর টারজান আউলেদ আর আবদুলকে নিয়ে কাদুর যে হোটেলে ছিল সেই হোটেলে তার খোঁজে গেল। গিয়ে দেখল কাদুর বাইরে গেছে। কিছু পরে আসবে। তারা অপেক্ষা করতে লাগল।
কিছুক্ষণের মধ্যে কাদুর এসে তার হারানো মেয়েকে দেখেই তাকে জড়িয়ে ধরল। চোখে আনন্দাশ্রু বইতে লাগল। বলল, আল্লা কত দয়ালু।
তার মেয়ের কাছে তার উদ্ধারকর্তা টারজনের সব কথা শুনে কাদুর বলল, কাদুর বেন সাদেনের যথাসর্বস্ব, এমন কি তার জীবন পর্যন্ত বিলিয়ে দেবে তোমার কাছে।
হোটেলে কিছুটা ঘুমিয়ে নিয়ে ওরা শেষ রাতের দিকে ঘোড়ায় করে বু সাদার পথে রওনা হলো। ভাবল সন্ধ্যার আগেই ওরা সেখানে গিয়ে পৌঁছবে। টারজান আর আবদুল ছাড়া শেখ কাপুরের সঙ্গে চারজন সশস্ত্র সহচর ছিল। ওদের কাছে মোট সাতটা বন্দুক ছিল।
পথটা বড় খারাপ। বন্ধুর পাথুরে মাটি। মাঝে মাঝে একটা করে ছোট পাহাড়। কোথাও কোন জনপদ বা লোকালয় নেই। চারদিকে দেখা গেল শুধু দিগন্ত জোড়া শূন্য প্রান্তর আর পাহাড়।
যেতে যেতে প্রায়ই পিছন ফিরে তাকাচ্ছিল আবদুল। তার ধারণা শত্রুরা পিছু নিতে পারে তাদের। বিকেলের দিকে দেখা গেল তার ধারণাই ঠিক। দেখা গেল তাদের পিছনে অনেক দূরে একদল অশ্বারোহী আসছে।
বিপদের গন্ধ পেয়ে অনেক করে বুঝিয়ে শেখ কাদুর আর আউলেদকে পাঠিয়ে দিল টারজান। আবদুল তার সঙ্গ কিছুতেই ছাড়ল না। বু সাদা আর বেশি দূরের পথ নয়। টারজান আবদুলকে নিয়ে পথের ধারে একটা বড় পাথরের আড়ালে লুকিয়ে রইল।
আরব অশ্বারোহীরা কাছে আসতেই টারজান চীৎকার করে উঠল, থাম, না হলে গুলি করব।
প্রথমে অশ্বারোহীরা একটু থেমে নিজেদের মধ্যে কিছু আলোচনা করে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে টারজানদের ঘিরে ফেলল। তারপর গুলি করতে লাগল তাদের লক্ষ্য করে। টারজানরা পাথরের আড়াল থেকে গুলি চালাতে থাকায় তাদের গায়ে একটা গুলিও লাগল না। কিন্তু টারজানদের গুলিতে ছয়জন মারা। গেল। এমন সময় বু সাদার দিকে একদল আরব অশ্বারোহী এসে আক্রমণকারীদের লক্ষ্য করে গুলি করতে থাকায় অবশিষ্ট চারজন অশ্বারোহী ভয়ে পালিয়ে গেল। আসলে কাদুর সাদেনই বু সাদা শহর। থেকে তাদের দলের লোকদের নিয়ে আসে টারজানদের সাহায্যের জন্য।
টারজানদের গায়ে কোন আঘাত লাগেনি দেখে কাদুর খুশি হলো। তারা এক সঙ্গে বু সাদার দিকে রওনা হলো। সেখানে দু’দিন থাকার পর কাদুর তার মেয়েকে নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে একদিন যাত্রা করল। টারজানকে তাদের সঙ্গে যাবার জন্য অনেক করে অনুরোধ করল। কিন্তু টারজান বলল, তার কাজ আছে। কাদুরের মত আরবদেরও খুব ভাল লেগে গেল টারজনের।
কাদুরকে বিদায় দিয়ে টারজান সাহারায় হোটেল দু’পেতিতে চলে এল সোজা। তার দলের লোকেরা তখন এই হোটেলেই ছিল। খাবার ঘরে ঢুকে টারজান দেখল জার্নয় একজন অপরিচিত আরবের সঙ্গে ফিস ফিস করে কথা বলছে। টারজান দেখল আরবটা তার সাদা আলখাল্লার মধ্যে একটা ভাঙ্গা হাত ঝোলানো অবস্থায় লুকিয়ে রেখেছে। সেখানে না দাঁড়িয়ে থেকে হোটেলের অন্য দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল টারজান।
