কথাটা শুনে মনে দারুণ আঘাত পেল টারজান। এবার সে রোকোফের চক্রান্তের কথাটা বুঝতে পারল।
পুলিশরা অবশ্যই মেয়েটি কি প্রকৃতির তা জানত। তার সঙ্গীদেরও চিনত। কিন্তু এক্ষেত্রে কে দোষী তা তারা ঠিক করতে না পেরে সকলকেই গ্রেফতার করতে চাইল।
টারজান বলল, আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ। এই মহিলার চীৎকার শুনে ছুটে আসি আমি। এর আগে কখনো দেখিনি এই মহিলাকে।
পুলিশ অফিসার বলল, আপনার যা বলার আদালতে বলবেন। এখন আমাদের সঙ্গে চলুন, এই বলে টারজনের কাঁধের উপর হাত দিতেই টারজান ঘুষি মেরে ফেলে দিল তাকে। তার সাহায্যে অন্য পুলিশরা। ছুটে যেতে তাদেরও এক এক ঘুষিতে ঘায়েল করে দিল টারজান। এরপর একজন অফিসার রিভলবার থেকে গুলি করতে যেতেই টারজান ঘরের বাতিটা নিভিয়ে দিলে ঘরখানা অন্ধকার হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশরা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল।
এদিকে টারজান রাস্তার দিকে জানালাটা দিয়ে বেরিয়ে একটা লাফ দিয়ে টেলিগ্রাফের পোস্টটা ধরে তাই দিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ল। পুলিশরা তার আগেই চলে গেছে।
ফরাসী উপনিবেশ আলজিরিয়ার অন্তর্গত সিদি বেল আব্বে নামক এক জায়গায় জনৈক আমেরিকান। শিকারীর ছদ্মবেশে টারজানকে পাঠানো হলো। সেখানে লেফটন্যান্ট জার্নয় নামে এক অফিসার ফরাসী সরকারের সৈন্যবিভাগের অধিকর্তারূপে কাজ করছিল। ছদ্মবেশে তার উপর নজর রাখার জন্য টারজনের উপর ভার পড়ল। জার্নয়ের কাজকর্ম কিছুদিন ধরে ভাল লাগছিল না ফরাসী সরকারের। সে কিছু রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক কাজে লিপ্ত আছে এমন সন্দেহও করা হয়। তাই তার কাজকর্মের উপর কড়া নজর রাখতে হবে টারজানকে।
আফ্রিকার নাম শুনে আনন্দে লাফিয়ে উঠেছিল টারজান। কিন্তু পরে দেখল এটা আফ্রিকার উত্তরাঞ্চল, এবং মধ্য আফ্রিকার বনাঞ্চল থেকে এর ভূ-প্রকৃতি সম্পূর্ণ আলাদা। ওখানে পৌঁছে প্রথম দিনটা সে এখানে সেখানে ঘুরে কাটাল। পরদিন বেল আব্বেতে গিয়ে সামরিক ও অসামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে তার পরিচয়পত্র দাখিল করল। সেখানকার ফরাসী ও আরব দেশীয় লোকদের সঙ্গে ইংরেজিতে কথাবার্তা বলত টারজান। তবে কোন ইংরেজ দেখতে পেলে তার সঙ্গে ফরাসী ভাষায় কথা বলত, পাছে সে যে একজন। ইংরেজ এটা ধরা পড়ে যায়।
অল্পদিনের মধ্যে সেখানকার ফরাসী অফিসারদের সঙ্গে মেলামেশা করে তাদের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠল টারজান। জার্নয়ের সঙ্গেও দেখা করল। জার্নয়ের বয়স চল্লিশ। মুখটা সব সময় ভার করে থাকে এবং কারো সঙ্গে মেলামেশা করে না।
ক্যাপ্টেন জিরার্দ নামে একজন অফিসারের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিল টারজনের। একদিন জিরা টারজানকে বলল, তাদের কিছুদিনের জন্য সাহারার কাছে বু সাদা নামে একটা জায়গায় যেতে হবে। তিনজন অফিসারসহ একদল সৈন্য সেখানে যাবে। শিকারের অছিলায় টারজানও জিরার্দের সঙ্গে যেতে। চাওয়ায় কারো কোন সন্দেহ হলো না বা কেউ তাকে বাধা দিল না।
যাবার সময় বুইরা নামে একটা জায়গায় টারজান দেখল ইউরোপীয় পোশাক পরা একটি লোক তাকে বিশেষভাবে লক্ষ্য করছে। টারজান কিন্তু ব্যাপারটাকে তেমন গুরুত্ব দিল না।
পরদিন প্রাতরাশ সেরে হোটেল থেকে আবদুল নামে আরবদেশীয় এক বিশ্বস্ত যুবককে পথ-প্রদর্শক ও দোভাষী হিসেবে সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল টারজান। এক সময় আবদুল টারজানকে বলল, ঐ দেখ মালিক, কালো আলখাল্লা আর সাদা পাগড়ী পরা একটা এদেশীয় লোক আমাদের অনেকক্ষণ ধরে পিছু নিয়েছে। লোকটার উদ্দেশ্য খারাপ, কারণ ওর মুখের নিচের দিকটা ঢাকা, শুধু চোখ দুটো বার করা আছে।
টারজান বলল, আমি ত আজই এখানে এসেছি, আগে কখনো এ দেশে আসিনি। সুতরাং এখানে আমার কোন শত্রু থাকতে পারে না। তবে যদি ডাকাত হয় তাহলে আমরা প্রস্তুত। যত পারে লুটপাট করুক।
হোটেলে আবদুলের মাধ্যমে কাদুর বেন সাদেন নামে আরবদেশীয় এক মুসলমানের সঙ্গে আলাপ হলো টারজনের। লোকটি ভদ্র এবং একজন অশ্ব বিক্রেতা হিসাবে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াত। টারজান শিকারী জেনে কাদুর তাকে তাদের দেশের অরণ্যে গিয়ে শিকার করার জন্য আমন্ত্রণ জানাল।
কাদুর চলে গেলে টারজান কিছু দূরে একটি হোটেলের সামনে এক নাচের আসর দেখে সেখানে গিয়ে বসল। সেখানে আউলেদ নাইন নামে এক সুন্দরী তরুণী নাচছিল। টারজানকে দেখেই মেয়েটি তার কাছে এসে তার ঘাড়ের উপর একটা সিল্কের রুমাল নাড়তে লাগল। টারজান তাকে একটা মুদ্রা দিল। মেয়েটি নাচতে নাচতে একবার একটু সরে গিয়ে দু’জন আরবের সঙ্গে ফিস ফিস করে কি কথা বলল। তারপর আবার টারজনের কাছে এল। এবারও সে তাকে একটা মুদ্রা দিল।
এবার মেয়েটি টারজনের কানের কাছে মুখটা নিয়ে গিয়ে চুপি চুপি ভাঙ্গা ভাঙ্গা ফরাসী ভাষায় বলল, তুমি এখনি চলে যাও এখান থেকে। বাইরে দু’জন লোক তোমার ক্ষতি করার জন্য অপেক্ষা করছে। তোমাকে ওদের হাতে ধরিয়ে দেব বলে প্রথমে কথা দিয়েছিলাম আমি। পরে দেখলাম তুমি দয়ালু এবং বড় দ্র। তাই বলছি, চলে যাও, ওরা দুষ্ট প্রকৃতির লোক।
টারজান বলল, ঠিক আছে, ধন্যবাদ।
কিন্তু সেখান থেকে চলে গেল না টারজান। আবদুলও তার পাশে বসে রইল। এমন সময় একজন। গোমরা মুখো আরব এসে তাদের ভাষায় গালাগালি করতে লাগল টারজানকে।
