লণ্ঠনটা জ্বেলে চেয়ারে বসল; রাইফেলটাকে পাশে রাখল। বাকি রাতটা জেগেই পাহারা দেবে। কিন্তু সে রাতে আর কিছুই ঘটল না। এক সময় সে তন্দ্রায় ঢলে পড়ল।
যখন ঘুম ভাঙল তখন ঘণ্টাখানেক মত বেলা হয়েছে। ঝড় থেমে গেছে, কিন্তু তাঁবুর চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে তার চিহ্ন। তাবুর দরজার কাছে এগিয়ে মেয়েটি তার চাকরকে ডেকে স্নানের জল ও প্রাতরাশ দিতে বলল। দেখল, কুলিরা বাধা-ছাদা করছে। ব্যান্ডেজ-বাঁধা হাতটা গলার সঙ্গে ঝুলিয়ে গোলাটো ঘুরে বেড়াচ্ছে।
কুলিরা মালপত্র বেঁধে যাত্রার আয়োজন করছে, অথচ সে তো যাত্রার হুকুম জারি করে নি।
এগিয়ে গিয়ে গোলাটোর বদলে আর একটি লোককে জিজ্ঞাসা করল, এ সবের অর্থ কি?
লোকটি জবাব দিল, আমরা ফিরে যাচ্ছি।
আমাকে একা রেখে তোমরা ফিরে যেতে পার না।
লোকটি বলল, তুমিও আমাদের সঙ্গে আসতে পার। তবে তোমার ব্যবস্থা তোমাকেই করতে হবে।
বেপরোয়া ভঙ্গীতে মেয়েটি বলল, এ কাজ তোমরা করতে পার না। আমি যেখানে যাব সেখানেই তোমরা আমার সঙ্গে যাবে- এই শর্তেই তোমরা রাজী হয়েছিলে। মালপত্র নামাও; আমি হুকুম না দেয়া পর্যন্ত অপেক্ষা কর।
লোকটি তবু ইতস্তত করছে দেখে মেয়েটি রিভলবার বের করল। এবার গোলাটো হস্তক্ষেপ করল রাইফেলধারী অস্কারিদের দিকে এগিয়ে এসে ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল, থাম! তোমরা তাঁবুতে ফিরে যাও। আমরা নিজেদের দেশে ফিরে যাচ্ছি। গোলাটোর সঙ্গে যদি ভাল ব্যবহার করতে তাহলে এসব ঘটত না; কিন্তু তা তুমি কর নি; আর এটা তারই শাস্তি।
মেয়েটির চোখের সামনে সকলে সার বেঁধে জঙ্গলের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। ভগ্ন হৃদয়ে সে তাঁবুতে ফিরে গেল।
ওদিকে সংঘের প্রতীক চিতাবাঘের চামড়ায় সজ্জিত চারমূর্তি ওরান্ডোকে ঘিরে ধরতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল বন্ধুর বিকৃত মৃতদেহের ছবি। মনের পটে আঁকা পড়ল নিজেরে শোচনীয় পরিণতির ছবি। কিন্তু সে ঘাবড়াল না। সে সৈনিক; মরতে হয় মরবে, তবু নিয়ামওয়েগির মৃত্যুর প্রতিশোধ সে নেবে। প্রাণপণ শক্তিতে বর্শাটাকে চেপে ধরে আঘাত হানল। একজন শত্রু আর্তনাদ করে মাটিতে পড়ে গেল। বাকি তিনজন ধীর পায়ে এগোতে লাগল।
দ্রুত মুখ ফিরিয়ে এনে সে বাকি শত্রুদের মোকাবিলার জন্য রুখে দাঁড়াল। পিছন থেকে কানে এল একটা বর্বর হুংকার। তা শুনে তার মাথার চুল খাড়া হয়ে উঠল। ফিরে তাকাবার অবসর নেই। বীভৎস মূর্তিগুলো ইস্পাতের বাঁকা নখরগুলো থাবার মত মেলে ধরে এগিয়ে আসছে তাকে ধরতে।
পিছন থেকে একটা মূর্তি হুংকার দিয়ে লাফিয়ে উঠে ওরান্ডোকে পাশ কাটিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল প্রথম চিতা-মানুষটার উপর। মূর্তিটি ওয়ান্ডোর মুজিমো। এও কি সম্ভব যে তার গলা থেকেই বেরিয়েছে সেই পাশবিক ভয়ংর হুংকার! যাইহোক, বেগতিক বুঝে চতুর্থ শত্রুটি মুখ ঘুরিয়ে জঙ্গলের দিকে ছুট দিল; শেষ সঙ্গীটিকে ছেড়ে দিয়ে গেল তার ভাগ্যের হাতে।
মুজিমো তখন দুটি যুবক চিতা-মানুষের বড়টির সঙ্গে লড়ছে। শক্ত মুঠোর দুটো থাবাওয়ালা হাতকে এক সঙ্গে চেপে ধরে আর এক হাতে মুজিমো চেপে ধরেছে তার গলা। একটু একটু করে তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। ক্রমে তার হাত-পা সহ গোটা শরীরটাই শিথিল হয়ে এলিয়ে পড়ল। মৃতদেহটাকে সে মাটিতে ফেলে দিল।
তার দিকে এগিয়ে গিয়ে ওরান্ডো ভয়ে ভয়ে বলল, মুজিমো, আজ তুমি আমার প্রাণ রক্ষা করেছ। এ প্রাণ তোমার।
মুজিমো বলল, এখন মনে পড়ছে, তুমিও আমার প্রাণ রক্ষা করেছ।
হা মুজিমো, আজ সকালেই।
আজই সকালে! হ্যাঁ, তাই। আমরা শিকারে যাচ্ছিলাম। আমি সত্যি ক্ষুধার্ত; শিকারে চল।
ওরান্ডো বলল, যে পালিয়ে গেল তার পিছু নেব না? ওদের গ্রামটা চিনে আসতে হবে না?
মুজিমো বলল, আগে মরা মানুষদের সঙ্গে কথা বলে দেখি, তারা কতটা কি বলতে পারে।
ভয় কম্পিত গলায় ওরান্ডো শুধাল, তুমি মরা মানুষের সঙ্গেও কথা বলতে পার?
মুজিমো বলল, শব্দ দিয়ে কথা না বললেও অনেক সময় তারা অনেক কিছু বলতে পারে। ওদের ধারালো দাঁত বলেছে ওরা নরমাংস খায়; ওদের কবচ আর থলের জিনিসপত্র বলেছে যে ওরা জেলে; কোন বড় নদীর ধারে বাস করে, আর কুমীর গিমলাকে ভীষণ ভয় করে। ওদের থলের বঁড়শি ও কবচই সে কথা আমাকে বলে দিয়েছে। ওদের অলংকার অস্ত্র এবং কপাল ও থুতনির কাটা দাগ থেকেই জানতে পেরেছি ওরা কি জাতি, আর কোন্ দেশে বাস করে। যে পালিয়ে গেছে তাকে অনুসরণ করার কোন দরকার নেই; তার বন্ধুরাই সব কথা বলে দিয়েছে। তাই আপাতত শিকারে চল। চিতা-মানুষদের গ্রামে পরে যাওয়া যাবে।
দু’টি সাদা মানুষ একটা তালি-মারা জীর্ণ তাঁবুর সামনে বসেছিল। কোন চেয়ার না থাকায় তারা মাটিতেই বসেছিল। তাদের জামাকাপড় আরও বেশি তালি-মারা, আরও বেশি জীর্ণ। পাঁচটি আদিবাসী কিছুদূরে চুল্লীর পাশে বসে আছে। অপর একটি আদিবাসী তাঁবুর কাছে ছোট উনুনে সাদা মানুষদের জন্য আহার্য তৈরি করছে।
আর পারা যায় না, বয়স্ক লোকটি বলল।
একুশ-বাইশ বছরের যুবকটি বলল, তাহলে ফিরে যাচ্ছ না কেন?
বয়স্ক সঙ্গীটি কাঁধ ঝাঁকাল। কোথায় যাব? দেশে ফিরে গেলে একটা নোংরা বাউণ্ডুলে বনে যাব। শ্রদ্ধা করুক আর নাই করুক, তবু তো এখানে ক’টা চাকর রাখতে পেরেছি; নিজেকে একজন কেউ-কেটা বলে ভাবতে পারি। আর সেখানে গেলে তো অন্যের হুকুম-বরদার হতে হবে। কিন্তু তুমি-তুমি কেন যে এই পাণ্ডব-বর্জিত দেশে ছারপোকা ও জ্বরের জঙ্গে লড়াই করে চলেছ তা তো বুঝি না। তুমি যুবক। তোমার সামনে রয়েছে একটা পুরো জীবন একটা গোটা জগৎ।
