তারপর থেকে সেই মহিলার সঙ্গে আর দেখা হয়নি টারজনের।
প্যারিসে পৌঁছেই দার্ণতের কাছে চলে গেল টারজান। টারজান স্বেচ্ছায় তার পৈত্রিক ভূ-সম্পত্তি আর পদমর্যাদা ত্যাগ করার জন্য দার্ণৎ তাকে তিরস্কার করল।
দার্ণৎ বলল, তুমি নিশ্চয় পাগল হয়েছ বন্ধু। তুমি শুধু ধনসম্পত্তি ও পদমর্যাদা ত্যাগ করলে না, তোমার দেহের শিরায় শিরায় যে ইংল্যান্ডের এক সম্ভ্রান্ত ও অভিজাত পরিবারের রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে সেটা জগতের সামনে প্রমাণ করার সুযোগটাও হারালে। কিন্তু একথা তারা বিশেষ করে জেন পোর্টার বিশ্বাস করল কি করে যে তুমি এক মেয়ে-বাঁদরের সন্তান? তোমার বাবার ডায়েরীতে পাওয়া তথ্য, তোমার শিশু বয়সের আঙ্গুলের ছাপ প্রভৃতির প্রমাণ সত্ত্বেও তুমি যে সবকিছু ছেড়ে দিলে তা আমার কাছে অবিশ্বাস্য বোধ হচ্ছে।
টারজান বলল, টারজান নামই আমার সবচেয়ে ভাল লাগছে। তুমি যদি আমাকে একটা চাকরি দেখে দাও তাহলে আমাকে অন্তত নিঃস্ব থাকতে হবে না।
দার্ণৎ বলল, আমি তা বলছি না। আমি আমার যথাসর্বশ্বের অর্ধেক যদি তোমাকে দান করি তাহলেও তোমার ঋণের দশ ভাগের এক ভাগ শোধ হবে না। তুমি আমাকে মবঙ্গাদের কাছ থেকে যেভাবে উদ্ধার করেছ তা আমি কখনো ভুলতে পারব না। টাকা দিয়ে তোমার ঋণ শোধের স্পর্ধা আমার নেই। তবে তোমার টাকার দরকার বলে সে দরকার মেটাতে চাই।
টারজান বলল, ঠিক আছে, কিন্তু আমি একটা কিছু করতে চাই। তাই একটা কাজ চাই। আর আমার উত্তরাধিকারের কথা যদি বলতে চাও তাহলে বলি আমার থেকে ক্লেটন এ বিষয়ে বেশি যোগ্য। সে ভদ্র, শিক্ষিত, আমার মধ্যে পশুসুলভ ভাব ও বৃত্তি সুপ্ত হয়ে আছে এবং সভ্যতা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির কিছুই জানি না। তাছাড়া আজ যদি ক্লেটনের কাছ থেকে সব সম্পত্তি ও পদমর্যাদা কেড়ে নিই তাহলে যে মেয়েটিকে আমি ভালবাসি এবং যে ক্লেটনকে বিয়ে করতে চলেছে তার অবস্থা কি হবে ভেবে দেখেছ? আমার কাছে। বংশ গৌরব বা পদমর্যাদার কোন দাম নেই।
দার্ণৎ বলল, কিন্তু ভবিষ্যতে এমন একদিন আসবে যখন তুমি তোমার বংশ মর্যাদা ফিরে পেয়ে আনন্দ লাভ করবে। অধ্যাপক পোর্টার ও মিস্টার ফিলান্ডার-একমাত্র তারা দুজনেই সর্বসমক্ষে বলতে পারেন সেই কেবিনটার মধ্যে যে শিশুর কঙ্কালটা পাওয়া যায় তা কোন মানব শিশুর নয়, সেটা এক শিশু বাঁদর-গোরিলার কঙ্কাল। তাঁরা বৃদ্ধ, বেশি দিন বাঁচবেন না। আসল সত্য উদ্ঘাটিত হলে মিস পোর্টারের মনের পরিবর্তন হবে।
টারজান বলল, তুমি মিস পোর্টারকে জান না। ক্লেটনের কিছু একটা না হলে ওর মনের পরিবর্তন কিছুতেই ঘটবে না। আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলে এক পরিবারে ওর জন্ম। জীবনে নিষ্ঠা আর বিশ্বস্ততাকে ওরা বড় করে দেখে।
সেই থেকে দু’সপ্তা ধরে দার্ণতের কাছে প্যারিসেই রয়ে গেলে টারজান।
একদিন সন্ধ্যার পর থিয়েটার দেখার পর টারজনের হঠাৎ নজর পড়ল কোন এক অচেনা লোকের এক জোড়া সন্ধানী দৃষ্টি তাকে লক্ষ্য করছে তার অগোচরে।
সেরাতে থিয়েটার হল থেকে বেরিয়ে অন্ধকার রাস্তাটা দিয়ে কিছুটা হেঁটে যেতেই টারজান দেখল একটা লোক ছুটে রাস্তাটা পার হয়ে অন্য দিকে অদৃশ্য হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরেই রাস্তার ধারের একটা তিনতলা বাড়ির দোতলার একটা ঘর থেকে নারীকণ্ঠের আর্ত চীৎকার শুনতে পেল সে।
আর্ত নারীকণ্ঠের চীৎকার কানে যাওয়া মাত্র টারজান ঘরটা লক্ষ্য করে ছুটতে লাগল। ঘরে ঢুকেই সে দেখল একজন নারী তার গলায় একটা হাত দিয়ে একাধারে দেওয়াল ঘেসে দাঁড়িয়ে রয়েছে আর কয়েকজন। পুরুষ ঘোরাফেরা করছে ঘরখানায়। টারজানকে দেখে পুরুষগুলো কেউ সরে গেল না। প্রায় তিরিশ বছর বয়সের সেই নারীটি টারজানকে বলল, আমাকে বাঁচান মঁসিয়ে, ওরা আমাকে খুন করতে এসেছে।
টারজান ঘরের স্বল্প আলোয় দেখল একটা লোক ঘর থেকে বেরিয়ে গেল এবং সে হলো রোকোফ। রোকোফ ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই একটা লোক একটা বড় দা হাতে টারজনের মাথায় মারার জন্য। এগিয়ে এল। বাকি লোকগুলো এবার একযোগে আক্রমণ করল টারজানকে। টারজান প্রথমে যে লোকটা তার মাথার উপর দা তুলে ধরেছিল সেই লোকটার মুখের উপর একটা জোর ঘুষি মারতেই সঙ্গে সঙ্গে মেঝের উপর মুখ থুবড়ে পড়ে গেল লোকটা। টারজান এবার অন্য লোকগুলোকে মারতে লাগল। তার কাছে এটা যেন একটা খেলার ব্যাপার।
মেয়েটাও ভয়ে চীৎকার করে উঠল, হা ভগবান!
লোকগুলোর মধ্যে অনেকেরই হাড় ভেঙ্গে গেল। তারা সবাই ঘর থেকে কোনরকমে নিজেদের মুক্ত করে পালিয়ে গেল। রোকোফ এতক্ষণ বাইবেই দাঁড়িয়ে ছিল। সে ভেবেছিল টারজান ওদের হাতে মারা যাবে। কিন্তু সে যখন দেখল টারজান সকলকে মেরে তাড়িয়ে দিয়েছে ঘর থেকে তখন সে পুলিশকে টেলিফোন করল। বলল, একটা দুবৃত্ত কোথা থেকে এসে মারপিট করছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ অফিসাররা এসে ঘরের মধ্যে ঢুকে দেখল ঘরের একধারে একজন যুবতী একটা নোংরা বিছানার উপর হাতে মুখ ঢেকে শুয়ে আছে আর তিনজন আহত লোক মেঝের উপর শুয়ে
যন্ত্রণায় আর্তনাদ করছে। ঘরের মাঝখানে দৈত্যাকার এক ভদ্রলোক ধবধবে সাদা পোশাক পরে দাঁড়িয়ে হাসছে।
একজন পুলিশ অফিসার জিজ্ঞাসা করল, কি হয়েছে এখানে?
টারজান যা যা হয়েছিল সব কথা বুঝিয়ে বলল। কিন্তু সব কথা বলার পর মেয়েটির দিকে সমর্থনের আশায় তাকাতেই মেয়েটি বলল, ও মিথ্যা কথা বলছে। আসলে আমি যখন একা এই ঘরে ছিলাম তখন ও অসদুদ্দেশ্যে এসে আমার শালীনতা নষ্ট করার চেষ্টা করে। আমি সাহায্যের জন্য চীৎকার করলে এইসব ভদ্রলোকরা ছুটে আসে। কিন্তু এই লোকটা তাদের প্রত্যেককে আহত করে শুধু তার হাত আর দাঁত দিয়ে। ও মানুষ নয়, একটা পশু।
