টারজান বলল, হ্যাঁ আমি। কিন্তু তুমি কে?
ফ্লোরা বলল, আমি ফ্লোরা হক। একদিন লেডী গ্রেস্টোকের কাছে কাজ করতাম।
টারজান বলল, হ্যাঁ, মনে আছে আমার। তুমি এখানে কি করে এলে?
ফ্লোরা বলল, আমরা ওপার নগরী থেকে সোনা চুরি করতে এসেছিলাম।
টারজান বলল, আমি তার কিছুই জানি না। তবে কি তুমি সেই উরোপীয়দের সঙ্গে ছিলে যারা একদিন আমার কফিতে ওষুধ মিশিয়ে দিয়েছিল?
ফ্লোরা বলল, হ্যাঁ, আমরা সোনা পেয়েছিলাম। কিন্তু আপনি একদিন ওয়াজিরিদের সঙ্গে এসে আমাদের শিবির থেকে তা নিয়ে যান।
টারজান আশ্চর্য হয়ে বলল, আমি ত কখনো আসিনি। আমি ত বুঝতে পারছি না তোমার কথা।
ফ্লোরা টারজনের কথায় আশ্চর্য হয়ে গেল। সে জানত টারজান কখনো মিথ্যা কথা বলে না। সে বলল, আমার নিগ্রোভৃত্যরা বিদ্রোহী হয়ে উঠলে এস্তেবান আমাকে চুরি করে নিয়ে যায়। পরে কার্ল এক প্ল্যাকেট হীরে নিয়ে আমাদের কাছে এসে পড়ে। কিন্তু এস্তেবান তাকে খুন করে হীরের প্যাকেটটা নিয়ে নেয়।
টারজান বলল, তাহলে তুমি এস্তেবানের কাছেই ছিলে?
ফ্লোরা বলল, সে আমায় ত্যাগ করে চলে গেছে। আমি এখানে মরতে বসেছি।
টারজান বলল, এসো আমার সঙ্গে, তাকে খুঁজে বার করব।
ফ্লোরা বলল, আমি হাঁটতে পারব না।
টারজান তখন ফ্লোরাকে কাঁধের উপর তুলে নিয়ে এগিয়ে চলল।
কিছুদূর গিয়েই একটা আলো দেখতে পেল টারজান। কারা কথা বলছে সেখানে।
একজন নারীর কণ্ঠস্বর শুনে চিনতে পেরেই টারজান ডাক দিল, জেন! জেন তুমি!
জেন অবাক হয়ে একবার টারজনের পানে তাকাবার পর এস্তেবানের পানে তাকাতে গিয়ে দেখল। তার আগেই সে পালিয়ে গেছে সেখান থেকে।
জেন হতবুদ্ধি হয়ে বলল, তুমি যদি টারজান হও তাহলে ও কে? এর মানে কি?
টারজান বলল, আমিই ত টারজান।
ফ্লোরা বলল, ইনিই হচ্ছেন লর্ড গ্রেস্টোক, আর ও হচ্ছে ভণ্ড প্রতারক।
টারজান এবার জেনের দিকে এগিয়ে এল। জেন বলল, তাকে দেখে আমার অন্তর বিশ্বাস করতে চায়নি, শুধু সে তোমার মত দেখতে।
টারজান বলল, যাক ওকে যেতে দাও। সে আমার হীরে চুরি করে নিলেও তোমাকে এখানে ফেলে আমি যেতে পারব না।
এরপর সে জাদ-বাল-জাকে ডেকে বলল, লোকটাকে ধরে আন।
জেন বলল, ও ওকে খেয়ে ফেলবে।
টারজান বলল, না আমার কাছে ধরে নিয়ে আসবে।
কিছুক্ষণ পর টারজান জেনকে বলল, আচ্ছা জেন, উসুলা বলছিল তুমি মারা গেঁছ। তোমাকে লুভিনি যে ঘরে বন্দী করে রেখেছিল সে ঘরটা পুড়ে যায় এবং ছাই-এর গাদার মধ্যে একটা মৃতদেহ পাওয়া যায়। এবং ওরা সেটা তোমার মৃতদেহ ভাবে। সেখান থেকে এখানে অক্ষত দেহে এলে কি করে? আমি তোমার মৃত্যুর জন্য লুভিনিকে দায়ী করে তার উপর প্রতিশোধ নেবার উদ্দেশ্যে সারা জঙ্গল খুঁজে বেড়াই।
জেন বলল, আর তাকে কোনদিন খুঁজে পাবে না তুমি। লুভিনি যখন আমাকে বশ করার জন্য ধস্তাধস্তি করছিল তখন সহসা তার ছুরিটা কোমর থেকে নিয়ে তার বুকে আমূল বসিয়ে দিই। লুভিনি মারা যায়। গোটা গাঁটা তখন জ্বলছে। আমি পালিয়ে যেতেই সেই ঘরেও আগুন লেগে যায়। আমি তখন একটা আরবের সাদা আলখাল্লা তুলে নিয়ে তাই পরে জঙ্গলে পালিয়ে আসি।
ফ্লোরা বলল, এস্তেবানই ওয়াজিরিদের ভুলিয়ে তাদের সাহায্যে আমাদের শিবির থেকে সোনার তালগুলো চুরি করে নিয়ে যায়।
টারজান বলল, লোকটা একটা পাকা শয়তান।
এমন সময় জাদ-বাল-জা এস্তেবানের পরনে যে চিতাবাঘের ছালটা ছিল সেই ছালটা মুখে করে নিয়ে এল।
টারজান তখন জাদ-বাল-জাকে নিয়ে সেই জায়গায় গেল যেখান থেকে সে এস্তেবানের ছালটা তুলে এনেছিল। টারজান দেখল নদীর ধারে কিছুটা রক্তের দাগ রয়েছে।
সে ফিরে এসে জেনদের বলল, সিংহটা ওকে ধরেছিল। তাই রক্তের দাগ রয়েছে। পরে সে নিজেকে ছিনিয়ে নিয়ে নদীতে ঝাঁপ দেয়। নদীতে ওকে নিশ্চয় কুমীরে খাবে।
ফ্লোরা বলল, এতকিছুর জন্য আমিই একমাত্র দায়ী। আমার কুটিল লোভলালসা তাদের এই আফ্রিকার জঙ্গলে টেনে আনে। আমি তাদের ওপারের ধর্নরত্নের কথা বলেছিলাম এবং এস্তেবানের মত এমন একজন লোককে বাছাই করেছিলাম যে দেখতে অবিকল লর্ড গ্রেস্টোকের মত।
টারজান বলল, এর জন্য তোমাকে অনেক কষ্ট ভোগ করতে হয়েছে। তুমি প্রচুর শাস্তি পেয়েছ।
ফ্লোরা টারজনের সামনে নতজানু হয়ে বলল, আপনার এত দয়ার জন্য কি বলে ধন্যবাদ দের আপনাকে? আমি কিন্তু আর কোথাও যাব না। আমি আপনাদের কাছে থেকে গিয়ে সারা জীবন ধরে আপনাদের সেবা করে যাব।
টারজান বলল, ঠিক আছে, তুমি আমাদের কাছেই থেকে যেতে পার ফ্লোরা।
ওরা তিনজন জাদ-বাল-জাকে সঙ্গে নিয়ে পরদিন সকালে রওনা হয়ে ক্রমাগত তিনদিন ধরে বাড়ির পথে এগিয়ে যেতে লাগল। তিনদিন পর এক জায়গায় টারজুন দেখতে পেল তার ওয়াজিরি যোদ্ধারা তাদের খোঁজেই এদিকে আসছে।
টারজান জেনকে বলল, ওদের বাড়ি যেতে বললাম আর ওরা আমাদের খোঁজ করতে আসছে।
কিছুক্ষণের মধ্যই ওয়াজিরি যোদ্ধারা ওদের সামনে এসে পড়ল। টারজান আর জেনকে এক সঙ্গে দেখতে পেয়ে আনন্দের আবেগে নাচতে লাগল ওরা। অনেক কথার পর টারজান উসুলাকে জিজ্ঞাসা করল, সেই সোনার তালগুলো কোথায় রেখেছ?
উসুলা বলল, সেগুলো তুমি যেখানে রাখতে বলেছিলে তোমার কথামত সেখানেই পুঁতে রেখেছি।
টারজান বলল, আমি নই, আমার মত দেখতে অন্য একটা লোক তোমাদের ঠকিয়েছিল।
