কার্ল বলল, আমরা উপকূলের দিকে যেতে চাই। সেখান থেকে দেশে ফিরে যাব।
টারজনের সঙ্গে একটা গাঁয়ে গেল তারা। টারজান ওদের জন্য খাবার এনে দিল। পরে সে বলল, তোমাদের দলে লুভিনি নামে এক নিগ্রোভৃত্য ছিল। আমার লোকেরা বলেছে সে আমার স্ত্রীকে হত্যা করেছে। আমি তাকে খুঁজছি।
কার্ল বলল, ওই লোকটাই আমাদের নিগ্রোভৃত্যদের ক্ষৈপিয়ে তোলে। সে আমাদের হত্যা করার ষড়যন্ত্র করে। আমাদের দলের ফ্লোরা নামে মেয়েটিকেও পাচ্ছি না আমরা। সে লেডী গ্রেস্টোকের কাছেই ছিল, আরবদের সঙ্গে লুভিনিরা লড়াই করছিল।
রাত্রিতে গাঁয়ের সামনে একটা ফাঁকা জায়গায় শুয়ে পড়ল ওরা। টারজান ওদের কাছাকাছি এক জায়গায় শুয়ে পড়ল। বলল, তোমাদের কোন ভয় নেই, জাদ-বাল-জা আমার পাশেই থাকবে।
কাল শুয়ে পড়েছিল, কিন্তু তখনো ঘুমোয়নি। হঠাৎ সে দেখল টারজান যখন শুতে যাচ্ছিল তখন তার কোমর থেকে চামড়ার মোড়ক দেয়া একটা প্যাকেট মাটিতে পড়ে গেল। কিন্তু টারজান সেটা বুঝতে পারল না। সে শুয়ে পড়ল এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল।
এদিকে কার্ল লোভে পড়ে শুয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে এগিয়ে গিয়ে প্যাকেটটা নিয়ে নিল। তারপর সেটা ধীরে ধীরে খুলে দেখল প্যাকেটটা অসংখ্য হীরের টুকরোয় ভর্তি। সারারাত জেগে থেকে ভোর হতেই কার্ল পালিয়ে গেল শিবির ছেড়ে।
পরদিন সকালে উপকূলের দিকে রওনা হবার সময় ব্লুবার দেখল কার্ল শিবির ছেড়ে কোথায় চলে গেছে। টারজান সকাল হতেই চলে গেছে জাদ-বাল-জাকে নিয়ে।
এদিকে কার্ল বনের মধ্যে একা পথ চলতে চলতে অবসন্ন হয়ে পড়তে লাগল। বুকফাটা তৃষ্ণায় জল পর্যন্ত পায়নি একটু। তার উপর কোথা থেকে এক ধরনের অসংখ্য পিঁপড়ের রাশ তার জামার ভিতরে ঢুকে পড়ে আর তার গাটাকে কুরে কুরে খেতে শুরু করে দিয়েছে।
এক সময় সে অতিষ্ঠ হয়ে জামা প্যান্ট সব ছিঁড়ে ফেলে দিল। শুধু রাইফেল আর সেই হীরের প্যাকেটটা ছাড়া কিছুই রইল না তার কাছে।
এইভাবে যেতে যেতে সামনে একটা শিবির দেখতে পেল সে। সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা, এস্তেবানের গলার স্বর শুনতে পেল সে। শুধু এস্তেবানের নয়, তার সঙ্গে ফ্লোরার গলাও শুনতে পেল। শিবিরের সামনে এগিয়ে গিয়ে এস্তেবানের নাম ধরে ডাকতে লাগল।
কিন্তু এস্তেবান বেরিয়ে এসে তাকে দেখে চিনতেই পারল না যেন।
কার্ল বলল, এস্তেবান, তুমি আমাকে চিনতে পারছ না? আমি কার্ল। আমি উপকূলের দিকে যাচ্ছিলাম।
এস্তেবান কড়া গলায় বলল, এখানে কি চাই? তুমি ঐ পথে যাও।
এমন সময় ফ্লোরা বেরিয়ে এসে বলল, কার্ল তুমি! আমাকে বাঁচাও, এস্তেবান আমাকে জোর করে ধরে এনে আটকে রেখে দিয়েছে।
কার্ল একটু জল চাইলে এস্তেবান বলল, জল আছে নদীতে। সেখানে চলে যাও।
এবার আর থাকতে না পেরে তার রাইফেল থেকে একটা গুলি করল কার্ল এস্তেবানকে লক্ষ্য করে। কিন্তু গুলিটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো। তখন এস্তেবান, কার্ল আবার গুলি করার আগেই তার হাতের বর্শাট কালের বুকের মধ্যে আমূল ঢুকিয়ে দিল। রক্তাক্ত দেহে লুটিয়ে পড়ল কার্ল।
এদিকে মৃত কার্লের কৌপীনের মধ্যে হীরের প্যাকেটটা পেয়ে আনন্দে লাফাতে লাগল এস্তেবান। সে আবেগের সঙ্গে বলতে লাগল, এখন আমি ধনী।
কার্লের মৃতদেহটা সেখানেই ফেলে রেখে তারা শিবির ছেড়ে রওনা হয়ে পড়ল তখনি।
এদিকে পীবলস, গ্রুক আর ব্লুবার যখন আদিবাসীদের দেখিয়ে দেয়া পথে উপকূলের দিকে এগিয়ে চ্ছিল তখন হঠাৎ টারজান তাদের সামনে এসে দাঁড়াল। টারজনের চোখ মুখের অবস্থা দেখে ভয় পেয়ে গেল তারা।
টারজান কড়া গলায় জিজ্ঞাসা করল, আমার হীরের প্যাকেটটা কোথায়? তোমরা সেটা নিয়েছ। আমি চলে যাবার সময় খেয়াল ছিল না। পরে বুঝতে পারি ব্যাপারটা।
ওরা তিনজন বলল, আমরা ত নিইনি।
টারজান বলল, তোমাদের মধ্যে আর একজন কোথায়?
ওরা বলল, কার্লকে সকাল থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। সে ভোরবেলায় আমরা ওঠার আগেই পালিয়ে গেছে। এবার বুঝতে পারছি, সে-ই তাহলে সেটা নিয়ে পালিয়ে গেছে।
টারজান ওদের সবকিছু খুঁজে দেখল কিন্তু প্যাকেটটা কারো কাছে পাওয়া গেল না।
টারজান আবার জাদ-বাল-জাকে সঙ্গে নিয়ে মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে গেল বনের মধ্যে।
এদিকে এস্তেবান ফ্লোরাকে বলল, আমি এখানে তোমার জন্য অপেক্ষা করে মরব না। তোমাকে আর আমার কোন প্রয়োজন নেই।
এই বলে সে ফ্লোরাকে পথের উপর রৈখেই চলে গেল। ফ্লোরা পথের উপরেই মৃতপ্রায় অবস্থায় শুয়ে পড়ল।
সেই রাতে একটা নদীর ধারে ছোটখাটো একটা শিবির তৈরি করল। তারপর আগুন জ্বালাল এস্তেবানু।
টারজনের অভিনয় করতে করতে নিজেকে সব সময় টারজান বলে ভাবত সে।
আগুন জ্বেলে তার পাশে বসেছিল এস্তেবান। হঠাৎ তার মনে হলো তার সামনে নদীর বাঁধের উপর থেকে সাদা পোশাক পরা এক অনিন্দ্যসুন্দরী শ্বেতাঙ্গ নারীমূর্তি এগিয়ে আসছে তার দিকে।
এস্তেবান অবাক হয়ে গেল।
এদিকে বাতাসে কার্ল এর গন্ধ-সূত্র খুঁজে খুঁজে এগিয় চলেছিল টারজান। হঠাৎ সে দেখল পথের উপর এক শ্বেতাঙ্গ নারী জড়োসড়ো হয়ে শুয়ে আছে।
টারজানকে দেখে ফ্লোরা এস্তেবান ভেবে বলল, অবশেষে আমাকে বাঁচাতে এসেছে এস্তেবান?
টারজান আশ্চর্য হয়ে বলল, এস্তেবান? আমি এস্তেবান নই।
এবার টারজানকে চিনতে পেরে ব্যস্ত হয়ে উঠল ফ্লোরা, লর্ড গ্রেস্টোক আপনি?
