হঠাৎ টারজান বলল, ঐ দেখ, গোরিলারা দলবেঁধে আমাদের দিকে আসছে। না, তুমি পালাও ওপারের পথ। আমি পরে যাব। নিগ্রোরা আসুক।
লা বলল, তুমি আমার জন্য যা করেছ তা আমি কখনো ভুলব না। আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাধ না। অতে মরতে হয় মরব।
এমন সময় সেই নিগ্লোভৃত্যটি ওদের দেখাল, ঐ দেখ, ওরা এসে গেছে।
টারজান দেখল সত্যিই পিছনের বন থেকে হাজার হাজার নিগ্রো আদিবাসী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ডায়মন্ড প্রাসাদের দিকে আসছে। টারজান তাদের গোরিলাদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করতে লাগল। ওদের মেরে ফেল। ওরা তোমাদের যুগ যুগ ধরে ক্রীতদাস করে রেখে অত্যাচার করে এসেছে। আর তার প্রতিশোধ নাও।
আদিবাসীরা ক্ষেপে গিয়ে বোলগানিদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। জাদ-বাল-জাও বোলগানিদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে অনেককে ঘায়েল করল। এইভাবে অনেকক্ষণ লড়াই করার পর বহু গোরিলা মারা গেল। কিছুসংখ্যক গোরিলা বন্দী হলো আর কিছু পালিয়ে গেল।
লড়াই শেষ হয়ে গেলে টারজান লা আর বৃদ্ধ শ্বেতাঙ্গকে নিয়ে প্রাসাদের উপরতলায় দরবার ঘরে চলে গেল। আদিবাসী নিগ্রোদের সর্ব সর্দারদের ডাকা হলো।
টারজান তাদের বলল, এখানে এমন একজন বিদেশী আছেন যিনি এখানে তোমাদের সঙ্গে দীর্ঘকাল বাস করে আসছেন। যিনি তোমাদের রীতি-নীতি ও আশা আকাঙ্ক্ষার কথা সব জানেন। এই শ্বেতাঙ্গই হবেন তোমাদের রাজা।
বৃদ্ধ শ্বেতাঙ্গ বলল, কিন্তু আমি এখান থেকে সভ্য জগতে চলে যেতে চাই।
টারজান বলল, কিন্তু আপনি এতদিন পর সভ্য সমাজে গিয়ে কি করবেন? এই অসহায় নিগ্রোরা আপনার সাহায্য চায়। এরা সরল প্রকৃতির এবং বড় অনুগত।
অবশেষে টারজনের কথায় রাজী হয়ে বৃদ্ধ শ্বেতাঙ্গ বলল, ঠিক বুলেছ তুমি। আমি আর যাব না কোথাও।
পরদিন সকালেই টারজান তিন হাজার নিগ্রো, যোদ্ধা একশো গোরিলা আর লাকে নিয়ে ওপারের পথে রওনা হলো।
টারজান নিজের হাতে কাদিজকে শাস্তি দেবার জন্য পাঁচিলের উপর উঠে গেল। কাদিজের যোদ্ধারা হেরে যেতে লাগল নিগ্রোয়োদ্ধা আর গোরিলাদের হাতে। কাদিজ সুড়ঙ্গপথ দিয়ে কয়েকজন যোদ্ধা আর পুরোহিতকে নিয়ে ছুটে পালাতে লাগল। টারজান একাই তাদের পিছু পিছু ছুটতে লাগল।
ছুটতে ছুটতে একসময় অন্ধকার সুগঙ্গ পথে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল টারজান।
কাদিজের পুরোহিতরা টারজনের হাত পা বেঁধে তাকে নিয়ে মন্দিরের উপরে গিয়ে বেদীর উপর তাকে শুইয়ে দিল।
কাদিজ বলল, আজ আমি তোমাকে নিজের হাতে বলি দেব। আর আমি অপেক্ষা করব না কারো জন্য।
কাদিজ তার বলির খাড়াটা টারজনের গলার উপর উঁচিয়ে ধরল, এমন সময় মন্দিরের পাচিলের উপর একটা সিংহের গর্জন শুনে চমকে উঠল কাদিজ। ভয়ে তার হাত থেকে খাড়াটা পুড়ে গেল।
টারজান চোখ মেলে তাকিয়ে দেখল জাদ-বাল-জা তার সন্ধানে এখানে এসে পড়েছে।
টারজান চীৎকার করে ডাকল জাদ-বাল-জাকে। বলল, ওকে মেরে ফেল জাদ-বাল-জা।
সঙ্গে সঙ্গে জাদ-বাল-জা এক লাফে পাচিল থেকে নেমে কাদিজের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কাদিজের সারা দেহ কামড়ে ছিঁড়ে খুঁড়ে দিয়ে সেটাকে একতাল মাংসে পরিণত করে ফেলল।
টারজান তেমনি হাত পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে রইল বেদীর উপর। কাদিজের অনুগত পুরোহিতরা কে কোথায় পালিয়ে গেছে ভয়ে।
ঘণ্টাখানেক পর লা তার বিজয়ী যোদ্ধাদের নিয়ে টারজনের খোঁজ করতে করতে মন্দিরে এসে হাজির হলো। সে টারজানকে বেদীর উপর পড়ে থাকতে দেখে ছুটে গিয়ে তার হাত পায়ের বাঁধন কেটে তাকে মুক্ত করে দিল।
এরপর সর পুরোহিত আর পূজারিণীরা লাকে তাদের রানী আর প্রধান পূজারিণী হিসাবে অকুণ্ঠচিত্তে মেনে নিল।
পরদিন সকালেই টারজান জাদ-বাল-জাকে নিয়ে লা-এর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তার দেশের বাড়ির পথে রওনা হয়ে পড়ল।
ওয়াজিরিরা যখন লেডী গ্রেস্টোককে হারিয়ে ক্লান্ত ও অবসন্ন দেহমনে তাদের বাড়ির দিকে এগিয়ে চলেছিল তখন টারজান তার সোনালী সিংহটা নিয়ে অন্য পথ দিয়ে তাদের দেখতে পেল।
ওয়াজিরি সর্দার উসুলা টারজনের পায়ে পড়ে সব কথা বলল। জেনকে কিভাবে হারিয়েছে সে কথা কাঁদতে কাঁদতে বলার পর শাস্তি চাইল তার মালিকের কাছ থেকে।
কিন্তু টারজান বলল, তোমরা এখন বাড়ি ফিরে যাও। তোমাদের কোন দোষ নেই। তোমরা বাড়ি গিয়ে কোরাককে বাড়িতেই থাকতে বলবে।
এই কথা বলে জাদ-বাল-জাকে সঙ্গে নিয়ে আবার জঙ্গলের গভীরে চলে গেল জেনের খোঁজে।
টারজান যে পথে জেনের খোঁজে যাচ্ছিল সেই পথেই ফ্লোরার দলের চারজন শ্বেতাঙ্গ অর্থাৎ ব্লুবার, কার্ল, পীবল, আর খ্রক ক্ষুধার্ত আর ক্লান্ত অবস্থায় আসছিল। তাদের পাগুলো ফুলে গিয়েছিল। ক্ষিদের জ্বালা আর সহ্য করতে পারছিল না তাঁরা।
হঠাৎ এক সময় পাশের ঝোপ থেকে একটা তীর এসে একজনের হাতে লাগল। ওরা অবাক হয়ে গেল, কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না। কিছুক্ষণ পর আবার একটা তীর এসে একজনের পায়ে লাগল। এবার ওরা ঝোপের মাঝে কয়েকজন আদিবাসীকে দেখতে পেয়ে গুলি করতে লাগল রাইফেল থেকে। আদিবাসীরা ভয়ে জঙ্গলে পালিয়ে গেল।
টারজান একটা গাছের উপর উঠে সব দেখে গর্জন করে উঠল, গুলি থামাও, আমি তোমাদের উদ্ধার করব।
ওরা গুরি থামালে গাছ থেকে নেমে এল টারজান। ওদের দেখে সে বলল, আমি চিনেছি তোমাদের। তোমরাই কফির সঙ্গে ওষুধ মিশিয়ে দিয়ে আমাকে অচেতন করে ফেলেছিলে। তবু এভাবে তোমাদের এখানে মরতে দিতে চাই না। তোমরা বিপন্ন, তোমাদের উপর কোন প্রতিশোধ নেব না আমি। তোমরা কোথায় যেতে চাও?
