নিগ্রোরা তখন একযোগে সিংহাসনে বসে থাকা সেই তিনজন গোরিলাকে লক্ষ্য করে বর্শা ছুঁড়তে লাগল। টারজান এবার মঞ্চের উপর উঠে গিয়ে মরা সিংহের বুকটা থেকে তার গেঁথে যাওয়া বর্শাটা তুলে নিয়ে ঘরে অন্য সব গোরিলা ছিল তাদের প্রতি আক্রমণ চালাতে লাগল। প্রথমে সে সামনের দিকে যে পঞ্চাশজন সামন্ত গোরিলা ছিল তাদের সম্বোধন করে বলল, থাম তোমরা, আগে আমার কথা শোন। আমি হচ্ছি বাঁদরদলের টারজান। আমি তোমাদের সঙ্গে কোন ঝগড়া বিবাদ করতে চাই না। আমি শুধু তোমাদের দেশ থেকে বাইরে যাবার একটা পথ খুঁজে পেতে চাই। আমাকে শুধু এই মহিলার সঙ্গে শান্তিতে চলে যেতে দাও এখান থেকে।
টারজনের কথা শুনে গোরিলাগুলো গর্জন করতে করতে কি সব বলাবলি করছিল নিজেদের মধ্যে। এমন সময় তাদের মধ্যে সেই বৃদ্ধ শ্বেতাঙ্গ ইংরেজকে দেখে রাগ হয়ে গেল টারজনের। সে তাকে চীৎকার করে বলল, শয়তান বিশ্বাসঘাতক কোথাকার। তুই এখানে এসে এদের আমার কথা বলে দিয়েছিস তাই এরা একজন নিগ্রোভৃত্যকে আমাকে ফাঁদে ফেলার জন্য পাঠিয়েছিল।
বৃদ্ধ বলল, না, আমি এই বন্দিনী মহিলার কি হয় তা দেখার জন্যই এখানে এসেছিলাম, তোমাকে ধরাতে আসিনি।
টারজান বলল, ঠিক আছে, তুমি তাহলে এখন আমার দলে চলে এসো। তোমার আনুগত্যের পরিচয় দাও আমার প্রতি। সারাজীবন দাসত্ব করার থেকে মৃত্যু অনেক ভাল।
নিগ্রো ক্রীতদাসরা সংখ্যায় ছিল মোট সাতজন। তারা সবাই টারজনের দলে এসে বর্শা,খড় আর কুড়াল নিয়ে লড়াই করতে লাগল।
বৃদ্ধ শ্বেতাঙ্গকে নিয়ে ওরা ছিল সংখ্যায় মাত্র নয় জন; কিন্তু গোরিলাদের সংখ্যা ছিল পঞ্চাশ। প্রথম দিকে গোরিলারা হতবুদ্ধি হয়ে পড়লেও তারা এতক্ষণে নিজেদের সামলে নিয়ে একযোগে আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল।
এমন সময় দরজার সামনে একটা সিংহের গর্জন শুনে চমকে উঠল সবাই। টারজান দেখল জাদ বাল-জা কোথা থেকে এসে ঘরে ঢুকেছে। সে সঙ্গে সঙ্গে আনন্দে চীৎকার করে ডাকল, জাদ-বাল-জা, মার বোলগানিদের।
সে আঙ্গুল দিয়ে গোরিলাদের দেখিয়ে দিল। জাদ-বাল-জার আক্রমণে কয়েকজন গোরিলা মারা গেল। আর বাকি কয়েকজন পালিয়ে গেল ঘর থেকে। টারজান তখন জাদ-বাল-জাকে মঞ্চের উপর নিয়ে গিয়ে বসিয়ে নিগ্রোদের বলল, এই হচ্ছে আসল সম্রাট তোমাদের।
লা বলল, চল, আমরা এখনি পালিয়ে যাই।
বৃদ্ধ বলল, যে সব গোরিলারা চলে গেছে তারা আবার দলবল নিয়ে আসবে। ওরা সহজে ছেড়ে দেবে না। ঐ দেখ প্রাসাদসংলগ্ন বাগানে কত গোরিলা রয়েছে।
এই সময় এক বিরাট গোরিলাকে বারান্দা দিয়ে সেই হল ঘরটায় ঢুকতে দেখেই টারজান জাদ-বাল জাকে ছেড়ে দিল। জাদ-বাল-জা এক লাফে গিয়ে আবার কয়েকজন গোরিলার গলা কামড়ে কেটে দিল। ফলে আর কোন গোরিলা ঘরের মধ্য ঢুকার চেষ্টা করল না। যে সব গেরিলারা ঘরের মধ্যে ঢুকে লড়াই করতে এসেছিল তাদের মধ্যে থেকে পনেরজন গোরিলাকে বন্দী করে পাশের একটা ঘরে বন্দী করে রাখল। টারজান।
এমন সময় উপর থেকে জ্বলন্ত কি একটা জিনিস পড়তেই লা টারজানকে দেখাল সেটা। টারজান দেখল ঘরের উপর ছাদের নিচে ব্যার্লকনির মত যে সব জায়গা ছিল তাতে কোথা থেকে অনেক গোরিলা এসে বসে আছে আর তেলেভেজানো কাপড়ে আগুন লাগিয়ে নিচে ফেলছে।
ইতোমধ্যে টারজান তিনজন নিগ্রোকে তাদের গাঁয়ের বস্তিতে পাঠিয়ে দিয়েছে যাতে তারা গ্রামবাসীদের সংগঠিত কৃরে নিয়ে আসতে পারে।
গোরিলারা উপর থেকে ক্রমাগত তেলভেজানো জ্বলন্ত কাপড়ের টুকরো ফেলতে থাকায় সমস্ত হলঘরটা ধোঁয়ায় ভরে গেল। এতে লা বলল, আর থাকতে পারছি না, এখান থেকে পালিয়ে চল।
বৃদ্ধ শ্বেতাঙ্গ বলল, ধোঁয়াটা আর একটু গম্ভীর হলে আমরা এক গোপন পথ দিয়ে চলে যাব। তাহলে গোরিলারা আর আমাদের দেখতে পাবে না।
টারজান বলল, সে পথে কোথায় নিয়ে যাবে আমাদের?
বৃদ্ধ বলল, এই প্রাসাদের বাইরে উপত্যকায়।
ক্রমে সত্যিই ধোয়াটা আরো ঘন হয়ে উঠল। বৃদ্ধ তখন মঞ্চের পিছন দিক দিয়ে একটা পথ দিয়ে ওদের নিয়ে যেতে লাগল। টারজান, লা, জাদ-বাল-জা আর সেই নিগ্রোভূত্যটি বৃদ্ধের পিছু পিছু যেতে লাগল। বৃদ্ধ সিঁড়ি দিয়ে নেমে একটা সুড়ঙ্গপথ ধরল কতকগুলো অন্ধকার বারান্দা পার হয়ে।
বৃদ্ধ তাদের একটি বড় ঘরে নিয়ে গিয়ে টারজানকে ঘরের তাকের দিকে দেখতে বলল। টারজান : দেখল ঘরের চারদিকে তাকের উপর অনেক চামড়ার প্যাকেটে মোড়া কি সব জিনিস ভরা আছে। বৃদ্ধ। একটা প্যাকেট টেনে নিয়ে সেটা খুলে টারজানকে দেখাল। ওরা দেখল প্যাক্রেটটা হীরেয় ভর্তি। বৃদ্ধ একটা বাতি জ্বালাল অন্ধকারে।
বৃদ্ধ বলল, এক একটা প্যাকেটে পাঁচ পাউন্ড করে হীরে আছে।
এরপর সে টারজনের হাতে একটা প্যাকেট দিয়ে বলল, এটা নিয়ে যাও।
সেই ঘর থেকে বেরিয়ে ওরা আবার অন্ধকারে সুড়ঙ্গপথ ধরল। পথে এক জায়গায় আর আকটা রুদ্ধদ্বার ঘর পেল ওরা। দরজাটায় বৃদ্ধ চাপ দিতেই দরজাটা খুলে গেল। সেই ঘরের পিছনের দিকের দরজাটা খুলে ওরা প্রাসাদের বাইরে চলে গেল। ওরা প্রাসাদের পূর্বদিকের ফটকের বাইরে চলে এল। বৃদ্ধ বলল, চল আমরা জঙ্গলের দিকে চলে যাই।
টারজান বলল, দাঁড়াও, নিগ্রোরা আসুক। ওরা এখনি এসে পড়বে।
দরবার ঘরে গোরিলারা ধোয়া কমে গেলে যখন জানতে পারল বিদেশীরা পালিয়েছে তখন তারা প্রাসাদের সব গোরিলাদের জড়ো করে প্রাসাদের সব গেটগুলোতে খোঁজ করতে লাগল।
