টারজান বলল, এখান থেকে বেরিয়ে যাবার কোন পথ নেই?
বৃদ্ধ বলল, এখান থেকে বাইরের উপত্যকা পর্যন্ত একটা সুড়ঙ্গ পথ আছে। কিন্তু সেখানে আছে কড়া পাহারা।
টারজান বলল, এ রাজ্যে কত নিগ্রো আদিবাসী আর কত গোরিলা আছে?
বৃদ্ধ বলল, এ রাজ্যে প্রায় পাঁচ হাজার আদিবাসী আর একহাজার থেকে এগারোশো গোরিলা আছে।
টারজান আশ্চর্য হয়ে বলল, কিন্তু সংখ্যা এত বেশি থাকা সত্ত্বেও আদিবাসীরা ওদের কবল থেকে মুক্ত করতে পারে না কেন নিজেদের?
বৃদ্ধ বলল, বোলগানিদের তুমি চেন না। ওরা ভীষণ বুদ্ধিমান। আদিবাসীদের অত বুদ্ধি নেই।
টারজান বলল, বড় মজার ব্যাপার। কিন্তু যে সুন্দরী মেয়েটিকে ওরা ধরে এনেছে সে এখানে কোথায় আছে?
বৃদ্ধ বলল, আমি বলে দিতে পারি কোথায় আছে সে, কিন্তু তাকে তুমি উদ্ধার করতে পারবে না।
টারজান বলল, তবু তুমি দেখিয়ে দাও।
বৃদ্ধ তাকে এক জায়গায় নিয়ে গিয়ে বলল, ঐ বাড়িটার কোন না কোন ঘরে তাকে রাখা হয়েছে। তাছাড়া তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে পার। আমি যতটা পারি সাহায্য করব। কারণ আমি গোরিলাদের ঘৃণা করি।
টারজান চলে গেল সেখান থেকে। সে বড় বাড়িটার মধ্যে গিয়ে এক একটা ঘরে ঢুকে তাকে খুঁজতে লাগল। একটা ঘরে কৃষ্ণকায়; এক আদিবাসী নিগ্রোকে দেখতে পেল টারজান। লোকটার চেহারাটা দৈত্যের মত।
নিগ্রোভৃত্যটি টারজানকে বলল, কি চাও তুমি? তুমি কি সেই মহিলাকে খুঁজছ যাকে ধরে আনা হয়েছে?
টারজান বলল, হ্যাঁ। তুমি জান কোথায় সে আছে?
নিগ্রোভৃত্য বলল, হ্যাঁ, আমি তোমাকে সেখানে নিয়ে যেতে পারি।
টারজান বলল, তুমি কেন আমার এ উপকার করবে?
নিগ্রো বলল, ওরা আমাকে তোমাকে একটা ঘরে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে বলেছে। সে ঘরে তুমি ও আমি ঢুকলেই দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে। আমরা দুজনেই বন্দী হয়ে থাকব চিরকাল। তুমি যদি সেখানে আমাকে হত্যা করো তাহলে, ওরা তা গ্রাহ্য করবে না।
টারজান বলল, তুমি যদি আমাকে ফাঁদে ফেলে বন্দী করো তাহলে তোমাকে হত্যা করব আমি। কিন্তু যদি তুমি সেই বন্দিনী মহিলার ঘরে আমাকে নিয়ে যাও তাহলে তোমাকে মুক্তি দেব।
নিগ্রো বলল, কিন্তু এখান থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয় মোটেই।
ওরা দু’জনে সেই বড় বাড়িটার একটা বড় হলঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজাটা বন্ধ ছিল। নিগ্রোভৃত্যটি বলল, এই ঘরে তোমার সাথী আছে।
নিগ্রোটি হাত দিয়ে চাপ দিতেই দরজাটা খুলে গেল। টারজান নিগ্রোটার হাতটা ধরে রইল যাতে সে পালিয়ে যেতে না পারে। সে দেখল একটা বিরাট হলঘরের একপ্রান্তে একটা উঁচু মঞ্চের উপর কালো কেশওয়ালা এক বিরাটকায় সিংহ বসে আছে। তার গলায় একটা সোনার শিকল লাগানো আছে এবং সেই শিকলটা দু’দিকে দু’জন করে বসে থাকা নিগ্রো ক্রীতদাস ধরে আছে। সিংহটার পিছনে একটা সোনার বড় সিংহাসনে তিনজন গোরিলা বসেছিল। তাদের গায়ে অনেক সোনার আর হীরের গয়না ছিল। সেই ঘরটার নিচে এক জায়গায় দাঁড়িয়েছিল লা। তার দুদিকে দু’জন নিগ্রো প্রহরী ছিল।
টারজান বুঝল, এই সিংহটাকে ওরা সম্রাট নুমা বলে। সম্রাট নুমার নামে গোরিলারা রাজ্য শাসন করে। মঞ্চটার নিচে দুদিকে পাতা দুটো বেঞ্চিতে পঞ্চাশজন গোরিলা বসেছিল। তারা ছিল এক একজন সামন্ত।
টারজান এক সময় ঘরটার বাইরে বারান্দায় নিয়ে গিয়ে সেই নিগ্রোভৃত্যটিকে বলল, এই ঘরের মধ্যে যে সব নিগ্রো ক্রীতদাস রয়েছে তারা সবাই গোরিলাদের কবল থেকে চিরদিনের মত মুক্তি পেতে চায়। ত? ওদের সঙ্গে ওদের ভাষায় কথা বলে দেখ। বল, আমার সঙ্গে ওরা যদি গোরিলাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে তাহলে আমি ওদের মুক্তি দৈব।
নিগ্রোটি বলল, কিন্তু তোমাকে বিশ্বাস করবে না তারা।
টারজান বলল, ওদের বল, আমাকে সাহায্য না করলে ওদের মরতে হবে।
এমন সময় সিংহাসন থেকে একজন গোরিলা গম্ভীরভাবে বক্তৃতার ভঙ্গিতে বলতে লাগল, হে রাজা নুমার সামন্তগণ, নুমা বন্দিনীর সব কথা শুনেছেন। তার ইচ্ছা বন্দিনী মৃত্যুদণ্ড লাভ করুক। সম্রাট নিজে। এখন ক্ষুধার্ত। তাই নিজে বন্দিনীকে অর সামন্তদের ও ঊর্ধ্বতন রাজ পরিষদের তিনজন সদস্যের উপস্থিতিতে ভক্ষণ করবেন। আগামী দিন এই বন্দিনী মহিলার সাথীকে বিচারের জন্য সম্রাট নুমার সামনে। আনা হবে।
অবশেষে সে নুমার সামনে লাকে নিয়ে আসার জন্য হুকুম দিল।
এই সময় অশান্ত হয়ে উঠল নুমা। সে তার মুখ বার করে গর্জন করতে লাগল। নিগ্রো ক্রীতদাসরা যখন লাকে জোর করে নুমা বা সেই সিংহ সম্রাটের মুখের কাছে জোর করে ঠেলে দিতে উদ্যত হলো তখন টারজান তার হাতের বর্শাটা সিংহের বুকটা লক্ষ্য করে সজোরে ছুঁড়ে দিল।
বর্শাটা সিংহটার বুকটা বিদ্ধ করায় লুটিয়ে পড়ল সিংহটা।
এদিকে টারজনের বাড়ি থেকে ছাড়া পাওয়া পোষা সিংহ জাদ-বাল-জা তার প্রভুর খোঁজে বহু বনপথ পার হয়ে প্যালেস অফ ডায়মন্ড বা হীরের প্রাসাদ-সংলগ্ন এক উপত্যকায় এসে পড়ে। সে বাতাসে গন্ধ এঁকে এঁকে এই প্রাসাদে এসে পড়ে। কিন্তু তখনো সে টারজান যেখানে ছিল সেখানে আসতে পারেনি।
সম্রাট নুমা টারজনের বর্শার আঘাতে লুটিয়ে পড়লে টারজনের সঙ্গী সেই নিগ্রাভৃত্যটি ঘরের সব নিগ্রো ক্রীতদাসদের বলতে লাগল, তোমরা যদি মুক্তি পেতে চাও তাহলে এই বিদেশীকে সাহায্য করো। বোলগানিদের সব হত্যা করো।
