ওয়াজিরি সর্দারের নাম উসুলা। এস্তেবান জানত এখন তাদের শিবিরে দুই চারজন নিগ্রোভৃত্য ছাড়া আর কেউ নেই। এই অবসরে সোনাগুলো নিয়ে পালিয়ে আসতে হবে।
শিবিরের কাছে গিয়ে এস্তেবান ওয়াজিরিদের বলল, শিবিরটাকে ঘেরাও করে ফেল।
এরপর এস্তেবান শিবিরের সামনে একা গিয়ে নিগ্রোভৃত্যদের বলল, আমি হচ্ছি টারজান। তোমাদের শিবির আমার লোকেরা ঘিরে ফেলেছে। কোন শব্দ করবে না বা গুলি ছোঁড়ার চেষ্টা করবে না।
এস্তেবান এবার হাত দিয়ে উসুলাকে আসার জন্য ইশারা করল। উসুলা এসে শিবিরের নিগ্রোভৃত্যদের বলল, আমরা হচ্ছি ওয়াজিরি যোদ্ধা, টারজান হচ্ছে আমাদের মালিক। আমরা তোমাদের এই চুরি করা সোনাগুলো উদ্ধার করতে এসেছি। আমরা তোমাদের কিছু করব না যদি তোমরা শান্তিপূর্ণভাবে আমাদের এই দেশ ছেড়ে চলে যাও।
এস্তেবান নিগ্রোভৃত্যদের বলল, তোমরা চলে যাও, তোমাদের মালিকদের বলবে, দয়া করে টারজান তোমাদের জীবন ভিক্ষা দিয়েছে।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই ওয়াজিরিরা সব সোনার তালগুলো শিবির থেকে বয়ে নিয়ে গেল।
এদিকে শিকার শেষে ফ্লোরারা বিশিরের দিকে এগিয়ে এলেই যেসব নিগ্রোভৃত্যরা শিবিরে পাহারারত ছিল তারা ফ্লোরাকে বলল, টারজান এসেছিল তার ওয়াজিরি যোদ্ধাদের নিয়ে। তারা সব সোনা নিয়ে গেছে।
ব্লুবার বলল, আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেল।
দূর থেকে টারজান প্রাসাদের মত যে একটা বাড়ি দেখেছিল সেই বাড়িটা লক্ষ্য করে বনের ভিতর দিয়ে যেতে লাগল।
কাছে গিয়ে গাছের আড়াল থেকে টারজান দেখল বাড়িটা সত্যিই প্রাসাদের মত আর চারদিকে উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। বাড়ির সীমানার মধ্যে কতকগুলো গোরিলা ঘোরাফেরা করছে। কিছু নিগ্রো নগ্নদেহ ক্রীতদাসও কাজ করছে। টারজান এক সময় সবার অলক্ষ্যে বাড়ির ফটকের সামনে গোরিলার মৃতদেহটা নামিয়ে দিয়ে এল।
দীর্ঘ সময় গাছের উপর উপেক্ষা করেও টারজান যখন বাড়ির ভিতরে ঢোকার কোন সুযোগ বা অবকাশ পেল না তখন লা-কে যে গাঁয়ে রেখে এসেছিল সেই গাঁয়ে ফিরে গেল। কিন্তু গাঁয়ে গিয়ে আশ্চর্য হয়ে গেল। দেখল গাঁয়ের মধ্যে একটা লোকও নেই। টারজান সারা গাঁটা তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়াল। কিন্তু কোথায় একটা লোককেও দেখতে পেল না।
হঠাৎ দেখল একটা কুঁড়ের পাশে একরাশ কাঠের আড়ালে লুকিয়ে আছে একটা মেয়ে। টারজান তাকে অনেকবার ডাকলেও ভয়ে সে এল না। অবশেষে টারজান তার হাত ধরে টেনে তাকে বার করে নিয়ে এসে বলল, আমি তোমার কোন ক্ষতি করব না, বল, গাঁয়ের লোকেরা আর আমার সাথী কোথায় গেল?
মধ্যবয়সী আদিবাসী মেয়েটি বলল, বোলগানিরা সেই মৃতদেহটা দেখতে পায়। তারা তখন দলবেঁধে এসে গাঁয়ের সব লোককে ধরে নিয়ে গেছে। তোমার সাথীকেও নিয়ে গেছে।
টারজান বলল, তোমার কি মনে হয় ওরা এই গাঁয়ের সবাইকে হত্যা করবে?
মেয়েটি বলল, হ্যাঁ। ওরা কাউকে ক্ষমা করে না। আমি লুকিয়েছিলাম বলে আমাকে দেখতে পায়নি।
টারজান আবার সেই বোলগানিদের বাড়িটার কাছে ফিরে গেল। সে একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখল। সে দেখল প্রাসাদের একটা ঘণ্টা বাজতেই সমস্ত আদিবাসী ভৃত্যরা কাজ থামিয়ে উঠোনে এসে সারবন্দীভাবে দাঁড়াল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সব গোরিলারা শোভাযাত্রা সহকারে সোনার শিকল গলায় একটা সিংহকে ধরে নিয়ে এল উঠোনে। সিংহটা যে পথে আসছিল সেই পথের দু’ধারে অনেকে জোড়হাত করে পঁড়িয়েছিল। সম্ভ্রমে মাথা নত করছিল সবাই। সিংহটা এসে নিগ্রোভৃত্যদের গাগুলো একবার এঁকে এঁকে চলে যেতে লাগল। নিগ্রোগুলো ভয়ে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
রাত্রি হওয়ার পর এক সময় দেখল সকলেই শুতে চলে গেল। কোথাও কোন পাহারাদার নেই। রাত্রি গম্ভীর হলে টারজান তার কাছে যে দড়ি ছিল তার সাহায্যে গেটের উপর দিয়ে প্রাসাদের ভিতর দিকে গিয়ে পড়ল। গোটা প্রাসাদটাকে সে খুঁজে বেড়াল। কয়েকটা ঘর খোলা দেখল। সেখানে দু’একটা গোরিলা ঘুমোচ্ছে। কিন্তু লা-এর কোন খোঁজ পেল না।
সহসা টারজনের মনে হলো তার পিছনে একটা ছায়ামূর্তি এসে দাঁড়িয়েছে। পিছনে ফিরেই সে দেখল একজন নগ্ন শ্বেতাঙ্গ দাঁড়িয়ে আছে।
টারজান সেই হীরের প্রাসাদে রাতের অন্ধকারে একজন নগ্ন শ্বেতাঙ্গকে দেখতে পেয়ে তার খাপ থেকে ছুরি বার করতে যাচ্ছিল। কিন্তু সে লোকটা ছিল নিরস্ত্র; তার উপর তার মুখের হাবভাব দেখে টারজান সামলে নিল নিজেকে। লোকটার মুখে সাদা দাড়ি ছিল। তার গায়ে কিছু সোনা ও হীরের গয়না ছাড়া গোটা গাটাই ছিল নগ্ন।
টারজান দেখল লোকটা ইংরেজি ভাষা জানে। তবু বাঁদর-গোরিলাদের ভাষায় টারজান তাকে প্রশ্ন করল, কে তুমি? কি চাও?
বৃদ্ধ বলল, আমি কিশোর বয়স থেকে এখানে আছি। আমি ইংল্যান্ড থেকে একটা জাহাজে করে স্ট্যানলির সঙ্গে পালিয়ে আসি। আমি আফ্রিকার জঙ্গলের গভীরে একটা শিবিরের কাছে থাকতাম। একদিন তার সঙ্গে শিকার করতে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলি। ঘুরতে ঘুরতে একদল আদিবাস আমায় ধরে তাদের গায়ে নিয়ে যায়। সেখান থেকে পালিয়ে এসে আমি উপকূলে যাবার পথে এদিকে চলে আসি পথ না জানায়। তখন এই গোরিলারা আমায় ধরে আটকে রাখে এখানে। সেই থেকে আমি বন্দী আছি এখানে। দেশে ফিরে যাবার কথা আজও ভাবি আমি। কিন্তু কোন উপায় নেই।
