গোরিলাটা বলল, তাতে কি হয়েছে। সারা জগতে অনেক গোমাঙ্গানী বা কৃষ্ণকায় লোক বেড়ে গেছে। তোমাদের কাজই ত হলো আমাদের সম্রাট নুমার সেবা করা।
এই কথা বলতে বলতে গোরিলাটা মেয়েগুলোর গায়ে আঙ্গুল দিয়ে টিপে টিপে কি দেখতে লাগল। অবশেষে সে একটি মেয়েকে বাছাই করল। মেয়েটার কোমরে একটা শিশু বাঁধা ছিল।
গোরিলাটা বলল, আজ এই মেয়েটা হলেই চলবে।
এই বলে সে মেয়েটার কোল থেকে ছেলেটাকে টান মেরে নিয়ে মাটির উপর ছুঁড়ে ফেলে দিল। যুবতী মেয়েটি তখন তার ছেলেটাকে মাটি থেকে কুড়োতে গেলে গোরিলাটা তার লম্বা দুটো হাত বাড়িয়ে ধরে ফেলল মেয়েটাকে। আর এমন সময় গাঁয়ের ধারে একটা গাছের উপর এক বাঁদর-গোরিলার মত কে ভয়ঙ্করভাবে গর্জন করে যুদ্ধে আহ্বান জানাল গোরিলাটাকে।
সঙ্গে সঙ্গে গোরিলাটা তার ভয়ঙ্কর মুখ তুলে তাকাল পিছন ফিরে। গ্রামবাসীরাও ভয় পেয়ে গেল। তারা দেখল এক দৈত্যাকার শ্বেতাঙ্গ গাছ থেকে নেমে এগিয়ে আসছে। সহসা সে চোখের নিমেষে তার হাতের বিরাট বর্শাটা সজোরে ছুঁড়ে গোরিলাটার বুকটাকে বিদ্ধ কল। গোরিলাটা তৎক্ষণাৎ পড়ে গিয়েই মারা গেল।
টারজানকে শত্রু ভেবে গ্রামবাসীরা তাদের বর্শা উঁচিয়ে ধরল। টারজান গোরিলাটার বুক থেকে বর্শটা তুলে নিয়ে বলল, আমি তোমাদের বন্ধু, বর্শা নামাও। কে এই গোরিলা যে তোমাদের গা থেকে এইভাবে নারী ও শিশুদের ধরে নিয়ে যায় অথচ তোমরা কোন ব্যবস্থা নিতে পার না তার বিরুদ্ধে?
গ্রামবাসীদের একজন বলল, ও একটা গোরিলা, নুমার প্রেরিত পুরুষ।
টারজান কৌতূহলী হয়ে বলল, কিন্তু নুমা কে?
গ্রামবাসীরা বলল, নুমা হচ্ছে সম্রাট যে বোলগানিদের সঙ্গে হীরের প্রাসাদে থাকে। সে হচ্ছে রাজার রাজা।
গোরিলাটা টারজনের বর্শার আঘাতে মরে গেলে সেই যুবতী মেয়েটি তার ছৈলেকে কুড়িয়ে নিয়ে দেখল ছেলেটা বেঁচে আছে, তার গায়ে শুধু একটা আঘাত লেগেছে। সে যখন দেখল টারজান তার কোন ক্ষতি করতে চাইছে না, তখন সে আশ্বস্ত হলো।
অবশেষে গ্রামবাসীরা বলল, আমরা তোমাকে বধ করব না, তোমার কোন ক্ষতি করব না। আমরা শুধু তোমাকে আমাদের সম্রাট নুমার কাছে নিয়ে যাব।
টারজান বলল, তাহলে তারা ত আমায় খুন করবে।
গ্রামবাসীরা বলল, তাহলে আমরা কিছু করতে পারব না।
টারজান বলল, কিন্তু তারা জানবে কি করে যে এই বোলগানিটা তোমাদের গাঁয়ে মরেছে? আমি যদি মৃতদেহটা নিয়ে গিয়ে দূর জঙ্গলে ফেলে দিই তাহলে তারা এটা দেখতে পাবে না।
গ্রামবাসীরা বলল, সেটা হতে পারে।
টারজান বলল, আমি বিদেশী। পথ হারিয়ে ফেলেছি। তোমরা আমাকে এই উপত্যকা থেকে বার হবার পথটা দেখিয়ে দেবে যাতে আমি দক্ষিণ-পূর্ব দিকে যেতে পারি। ও পথে কি আছে তা জান তোমরা?
গ্রামবাসীরা বলল, না, তা ত জানি না, শুধু জানি ঐ পথ দিয়ে বোলগানিরা আমাদের গাঁয়ে আসে।
টারজান বুঝতে পারল এর বেশি খবরাখবর তাদের কাছ থেকে পাওয়া যাবে না। সে বলল, আমার একটা কথা শোন। আমার একজন সাথী আছে। আমি তাকে তোমাদের কাছে রেখে ঐ পথে গিয়ে কিছুটা দেখে আসব। আমি কোন্ পথে কোন্ দিকে যাব তা ঠিক করতে পারব তাহলে। আমি না আসা পর্যন্ত আমার সাথী তোমাদের এই গাঁয়েই থাকবে। দেখবে যেন কোন ক্ষতি না হয় তার।
গ্রামবাসীরা বলল, তোমার সাথী কোথায়?
টারজান বলল, তার জন্য একটা কুঁড়ে ঠিক করে দাও। তাকে আনছি।
এই বলে টারজান যে গাছের উপর লাকে রেখে এসেছিল সেই গাছে গিয়ে লাকে ডেকে নিয়ে এল।
লাকে কথাটা বুঝিয়ে বলল,টারজান।
তারপর টারজান গোরিলার মৃতদেহটা অবলীলাক্রমে কাঁধের উপর চাপিয়ে নিয়ে গায়ের ফটক পার হয়ে বনের মধ্যে চলে গেল। কিভাবে টারজান গোরিলার বিরাট ও এত বড় ভারী দেহটা কাঁধের উপর এমন অনায়াসে তুলে নিল তা দেখে অবাক হয়ে গেল গ্রামবাসীরা।
টারজান চলে গেলে লা গ্রামবাসীদের বলল, আমার থাকার জন্য একটা কুঁড়ে ঠিক করে দাও।
ওপারের উত্তর-পূর্ব দিকে বনের ধারে একটা শিরিরে তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে সবেমাত্র। সেখানে ছয়জন শ্বেতাঙ্গ আর একজন নিগ্রোভৃত্য তখন রাতের খাবার খাচ্ছিল। শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে একজন মেয়ে ছিল, তার নাম ফ্লোরা।
ফ্লোরা বলল, আমাদের দলের মধ্যে এ্যাডলফ ব্লুবার আর এস্তেবান অপদার্থ। ব্লুবার কুঁড়ে আর কৃপণ আর এস্তেবানের শুধু বড় বড় কথা আছে।
তাছাড়া ব্লুবার টাকার ভয়ে বেশি কুলি নিয়োগ করতে চায়নি। পঞ্চাশজন লোক আশি পাউন্ড ওজনের সোনার তালগুলো বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বাকি কিছু কুলি শিবিরের জিনিসপত্র বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আর বাড়তি কুলি একটাও নেই। এরা সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।
পরদিন সকালে ওরা একসঙ্গে শিকারে বার হলো। শিকার করতে গিয়ে এস্তেবান দল থেকে অনেকটা দূরে সরে পড়েছিল একা একা।
হঠাৎ পঞ্চাশজন ওয়াজিরির একটা দল এস্তেবানকে ঘিরে ধরল। তাদের সর্দার ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজিতে বলল, ও বাওয়ানা, ও বাওয়ানা, তুমিই ব্রাদরদলের টারজান। বনের রাজা। তোমাকে হারিয়ে আমরা কত খুঁজেছি তোমায়। আমরা ভাবলাম তুমি একাই ওপারে গেছ। আমরা তাই সমস্ত বিপদের ঝুঁকি নিয়ে ওপারে যাচ্ছিলাম।
এস্তেবান প্রথমে বিস্ময়ে অবাক হয়ে গেলেও নিজেকে সামলে নিল পরমুহূর্তে। তার মাথায় একটা কুবুদ্ধি খেলে গেল। সে নিজের পরিচয় গোপন রেখে নিজেকে টারজান বলে স্বীকার করে নিল। তাকে দেখতে অনেকটা টারজনের মত। এ জন্য সে নিজেও টারজনের মত বেশভূষা ধারণ করত।
