অথচ টারজানকে সে কিছুতেই বলি দিতে পারবে না নিজের হাতে। এই টারজানই তাকে দু-দু’বার সাক্ষাৎ মৃত্যুর কবল থেকে উদ্ধার করে।
লা তার লোকদের হুকুম দিল, একটা পাল্কি এনে টারজানকে ওপারের মন্দিরে নিয়ে চল।
টারজনের যখন জ্ঞান ফিরল সে দেখল তখন রাত্রিকাল। একটা অন্ধকার ঘরে সে মেঝের উপর শুয়ে আছে। পরে সে হাত দিয়ে মেঝেটাকে পরীক্ষা করে ও গন্ধ শুঁকে বুঝল সে ওপারের মন্দিরের নিচের তলায় একটা ঘরে আছে।
এদিকে টারজান যে ঘরে ছিল সেই ঘরেরই উপরতলায় একটা ঘরে প্রধান পূজারিণী লা ছটফট করছিল তার বিছানায়। যে তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয়জন, যে তার একমাত্র ভালবাসার বস্তু তাকে নিজের হাতে কিভাবে বলি দেবে তা বুঝে উঠতে পারল না সে।
রাত্রি তখন গভীর। হঠাৎ একজন পূজারিণী এসে লাকে বলল, ডুথ আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে।
ডুথকে ডেকে পাঠিয়ে তার কথা শুনতে চাইল না। ডুথ বলল, কাদিজ আপনার বিরুদ্ধে ওয়া নামে এক পূজারিণী ও কয়েকজন পুরোহিতের সঙ্গে চক্রান্ত করছে। ওরা চারদিকে চর পাঠিয়ে লক্ষ্য রাখছে আপনি টারজানকে মুক্তি দান করছেন কি না। আপনি কোনভাবে টারজানকে মুক্তি দিলেই ওরা আপনার জীবন নাশ করবে। তখন ওয়া প্রধান পূজারিণীর পদ পাবে এবং কাদিজের সঙ্গে তার বিয়ে হবে।
এদিকে একজন পুরোহিত কাদিজকে একটা পরামর্শ দিল। বলল, আমরা যাকে পাঠিয়েছিলাম লার কাছে তার কথা শোনেনি। এখন আমাদের একজন লোককে পাঠাও টারজনের কাছে। সে বলবে আমি লা’র কাছ থেকে আসছি। আমি তোমাকে তার নির্দেশমত ওপার নগরীর বাইরে দিয়ে আসব। সেখান থেকে তুমি তোমার গন্তব্যস্থলে চলে যাবে। তারপর টারজানকে নিয়ে লোকটা গুপ্ত পথে বেরিয়ে যেতে গেলেই আমাদের প্রহরীরা তাদের ধরে ফেলবে। তখন আমরা গোপনে হত্যা করব টারজানকে। তারপর লা’র বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে বলল লা-ই নিশ্চয় বন্দীকে ছেড়ে দিয়েছে এবং এটা সম্পূর্ণ অধর্মাচরণ। ফলে তাকেও বলি দেওয়া হবে।
কাদিজ বলল, তাহলে আগামী কাল সূর্য অস্ত যাবার আগেই ওরা প্রধান পূজারিণীর আসনে বসবে।
সে রাতে হঠাৎ কার স্পর্শে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল টারজনের। সে বুঝল কোন এক অদৃশ্য নারীর হাত তার দেহটাকে স্পর্শ করে তাকে ঘুম থেকে জাগাচ্ছে। সে জেগে উঠতেই নারীটি বলল, এখনি আমার সঙ্গে এস। তোমার জীবন বিপন্ন।
টারজান জিজ্ঞাসা করল, কে পাঠিয়েছে তোমায়?
নারীকণ্ঠ উত্তর দিল, লা আমায় পাঠিয়েছে তোমাকে ওপার নগরীর বাইরে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেয়ার জন্য।
আর কালবিলম্ব না করে সেই নারীর পিছু পিছু বেরিয়ে পড়ল টারজান। ওরা এগিয়ে চলল ওপার নগরীর পিছনের দিকের এক গোপন সুড়ঙ্গ পথ ধরে। সারারাত ওরা একটানা পথ চলার পর ভোরবেলায় নগরসীমানার শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছল।
এবার সেই নারীর দিকে তাকিয়ে টারজান আশ্চর্য হয়ে গেল। দেখল তার সামনে লা নিজে দাঁড়িয়ে আছে।
টারজান বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে বলল, লা তুমি!
লা বলল, ওপারে ফিরে যাবার আর কোন পথ নেই আমার।
টারজান বলল, নগরসীমানা যেখানে শেষ হয়েছে তার পর থেকেই শুরু হয়েছে অন্তহীন এক বিরাট জঙ্গল। এ পথের কোথায় কি আছে তার ত কিছুই জান না তুমি। অথচ এ ছাড়া ত এখান থেকে বেরিয়ে যাবার অন্য পথ নেই আমাদের।
লা বলল, শুনেছি এই বনটাতে অনেক বড় বড় বাঁদর-গোরিলা আর সিংহ আছে। তুমি কি এই পথেই যাবে বলে মনে করছ?
টারজান বলল, মরতে ত একদিন হবেই। তবে বৃথা ভয় করে কি হবে বলতে পার। তার থেকে চল, এই বনের ভিতর দিয়েই এগিয়ে যাব আমরা। ‘
এই বলে লাকে কাঁধের উপর তুলে নিয়ে বনের মধ্যে ঢুকে পড়ল টারজান। তারপর একটা গাছের উপর বাঁদরের মত উঠে পড়ে গাছে গাছেই এগিয়ে চলল। টারজনের গায়ের শক্তি দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল না।
গাছের উপর থেকে লা দেখল অদূরে বনের ধারে কতকগুলো কুঁড়ে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু কুঁড়েগুলো অদ্ভুত ধরনের। কুঁড়েগুলো একই মাপের–অর্থাৎ সাত ফুট করে চওড়া আর ছয় ফুট করে উঁচু। কিন্তু কুঁড়েগুলো মাটির উপর ছিল না; এক একটা গাছের ডালের সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় শূন্যে দোতলার মত ঝুলছিল মাটি থেকে ঠিক তিন ফুট উপরে। কুঁড়েগুলোর গায়ে কোন দরজা দেখা গেল না; তবে হাওয়া ও আলো ঢোকার জুন্য তিন-চার ইঞ্চির একটা করে ফাঁক ছিল।
সহসা সমস্ত বনভূমি কাঁপিয়ে গর্জন করতে করতে একটা গোরিলা এসে গাঁয়ের ফটকের সামনে দাঁড়াল।
বোলগানি বা গোরিলাটা গায়ের ভিতরে ঢুকেই একজন গ্রামবাসীকে বলল, তোমাদের মেয়ে ও শিশুরা কোথায়? ডাক তাদের নিয়ে এসো তাদের এখানে।
একজন গ্রামবাসী সাহস করে কোনরকমে ক্ষীণ প্রতিবাদের সুরে বলল, কিন্তু আমরা ত একপক্ষকালের মধ্যেই একজন নারীকে তোমার হাতে তুলে দিয়েছ। এখন অন্য গাঁয়ের পালা।
কিন্তু বোলগানি এ কৃথায় রেগে গিয়ে বলল, থাম, থাম। আমাদের সম্রাট নুমার নামে দাবি জানাচ্ছি। আমার হুকুম তামিল করো অথবা মরো।
আর কোন কথা না বাড়িয়ে গ্রামবাসীরা নারী ও শিশুদের ডাকতে লাগল। কিন্তু কুঁড়ে থেকে কেউ বার হলো না। অবশেষে গায়ের যোদ্ধারা গুপ্তস্থান থেকে মেয়েদের ধরে নিয়ে এল। মেয়েরা ভয়ে কাঁপতে লাগল।
একজন গ্রামবাসী বলল, হে মহান বোলগানি, তোমাদের সম্রাট নুমা যদি শুধু আমাদের গা থেকেই মেয়ে ধরে নিয়ে যায় তাহলে কিছুদিনের মধ্যেই আমাদের গায়ে যোদ্ধাদের জন্য আর কোন মেয়ে থাকবে না। তার ফলে শিশুও উৎপন্ন হবে না।
