অবাক কাণ্ড! এ কেমন ধারার লোক যে ভয় কাকে বলে জানে না, যে বানরদের ভাষায় কথা বলতে পারে। প্রশ্নটা মনে আসতেই আর একটা অস্বস্তিকর প্রশ্ন জাগল তার মনেঃ এই জীবটি মানুষ তো?
পথের একটা বাঁক ঘুরতেই একটা ভয়াবহ দৃশ্য দেখে ওরান্ডোর চিন্তায় বাধা পড়ল। তার চোখের সামনে পড়ে আছে একটি সৈনিকের বিকৃত মৃতদেহ। বন্ধু ও সহকর্মী নিয়ামওয়েগিকে চিনতে বিলম্ব হল না। কিন্তু কেমন করে তার মৃত্যু হল।
নবাগত লোকটি এসে তার পাশে দাঁড়াল। নিচু হয়ে মৃত্যুদেহটাকে ভাল করে পরীক্ষা করতে সেটাকে উল্টে দিতে চোখে পড়ল মুখময় ইস্পাত-নখরের নির্মম আঘাতের চিহ্নগুলো।
নিরুত্তাপ গলায় সে শুধু বলল, চিতা-মানুষের কাজ।
কিন্তু ওরান্ডো তখন থরথর করে কাঁপছে। বন্ধুর মৃতদেহটা দেখামাত্রই চিতা-মানুষদের কথা তার মনে হয়েছিল। এই নৃশংস গুপ্ত সমিতির ভীতি বাসা বেঁধে আছে তার মনের গভীরে। তাদের রহস্যময় নরহন্তারক ধর্মীয় অনুষ্ঠান আরও বেশি ভয়ংকর এই কারণে যে তাদের সংঘবহির্ভূত কোন মানুষ সে সব কখনও চোখে দেখে নি, বা দেখলে আর বেঁচে থাকে নি।
মৃতদেহটাকে সেই একইভাবে বিকৃত করা হয়েছে; নরমেধ যজ্ঞের জন্য দেহের কতকগুলো বিশেষ অঙ্গকে কেটে নিয়েছে। ওরান্ডো শিউরে উঠল; কিন্তু সে শিহরণ যত না ভয়ের, তার চাইতে বেশি ক্রোধের। নিয়ামওয়েগি তার বন্ধু। শৈশব থেকে দু’জন এক সঙ্গে বড় হয়েছে। এই পৈশাচিক আক্রমণ যারা হেনেছে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা সাধনের জন্য তার আত্মা চীৎকার করে উঠল। কিন্তু অনেকের বিরুদ্ধে সে একা কি করবে? নরম মাটিতে অনেক পায়ের ছাপ দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে অনেকে মিলে তাকে হত্যা করেছে।
নবাগত লোকটি বর্শায় ভর রেখে নিঃশব্দে সৈনিকটিকে দেখছিল- দেখছিল তার মুখের শোক ও ক্রোধের প্রকাশ। বলল, তুমি একে চিনতে?
আমার বন্ধু।
নবাগত কোন কথা বলল না; দক্ষিণের পথে পা বাড়াল।
ওরান্ডো তাকে অনুসরণ করে বলল, কোথায় যাচ্ছ?
যারা তোমার বন্ধুকে মেরেছে তাদের শাস্তি দিতে।
ওরান্ডো প্রতিবাদ করে বলল, তারা সংখ্যায় অনেক; আমাদেরই মেরে ফেলবে।
নবাগত জবাব দিল, তারা চারজন। আমিই মারতে পারব।
তারা যে চারজন তা জানলে কেমন করে?
পায়ের কাছের পথটা দেখিয়ে নবাগত বলল, একজন বৃদ্ধ খুঁড়িয়ে হাঁটে; একজন ঢ্যাঙা ও সরু; অপর দু’জন যুবক সৈনিক। তারা হাঁটে হাল্কা পায়ে, যদিও একজনের শরীর বেশ ভারী।
তুমি তাদের দেখেছ?
তাদের পায়ের ছাপ দেখেছি; সেটাই যথেষ্ট।
কথাগুলো ওরান্ডোর মনে ধরল। লোকটা পথের হদিস বোঝে বটে। আর দ্বিধা নয়। যা থাকে কপালে, ওর সঙ্গেই সে যাবে।
বলল, অন্তত ওরা কোন গ্রামে ফিরে গেল সেটা তো জেনে আসতে পারব। আমার বাবা টুম্বাই গ্রামের সর্দার। সারা ওয়াটেঙ্গা দেশে সে হরকরা পাঠাবে; যুদ্ধের ঢাক বেজে উঠবে; উটেঙ্গা যোদ্ধারা দলে। দলে আসবে। তখন আমরা চিতা-মানুষদের গ্রাম আক্রমণ করে নিয়ামওয়েগির রক্তের প্রতিশোধ নেব।
দু’জনে পথ চলতে লাগল। এক সময় ওরান্ডোর মনে হল, তার সঙ্গীটি কোন সাধারণ মানুষ নয়; অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী। বিদ্যুৎ-চমকের মত সহসা একটা নতুন চিন্তা তার মনে দেখা দিল : যে পরলোকগত পূর্বপুরুষের নামে তার নামকরণ হয়েছে তার আত্মাই বুঝি এসে দেখা দিয়েছে। এই নবাগতের রূপ ধরে-এই লোকটিই তার মুজিমো। তাছাড়া মুজিমোর কাঁধের উপরকার ছোট বানরটিও একটি আত্মা। হয়তো বা নিয়ামওয়েগির যেমন সারা জীবনের বন্ধু ছিল, তেমনি এরা দু’জনও খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
সে ডাকল, মুজিমো!
নবাগত মুখ ফিরিয়ে চারদিকে তাকিয়ে বলল, তুমি মুজিমোকে ডাকলে কেন?
ওরান্ডো জবাব দিল, আমি তোমাকেই ডেকেছি মুজিমো।
মুজিমো বলে?
হ্যাঁ।
তুমি কি চাও?
ওরান্ডো বুঝল, সে ভুল করে নি; এই তো তার মুজিমো।
তুমি আমাকে ডাকছিলে কেন?
কোন জবাব খুঁজে না পেয়ে ওরান্ডো শুধাল, আমরা কি চিতা-মানুষদের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি মুজিমোঃ
আমরা সেই দিকেই চলেছি। এক কাজ করা যাক। গাছের ডালে ডালে ঝুলতে ঝুলতে যাওয়া যাক। চলে এস।
বলেই একটা বড় গাছের ডাল ধরে সে ঝুলে পড়ল।
ওরান্ডো চেঁচিয়ে বলল, দাঁড়াও। আমি তো গাছে-গাছে চলতে পারব না।
তাহলে হেঁটেই এস। আমি এগিয়ে গিয়ে চিতা-মানুষদের ধরে ফেলব।
ওরান্ডোকে আর কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়েই বানরটাকে কাঁধে নিয়ে নবাগত লোকটি মুহূর্তের মধ্যে গাছপালার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল। সবিস্ময়ে তার কথা ভাবতে ভাবতেই ওরান্ডো পায়ে হেঁটে এগোতে লাগল।
সে যদি আরও বেশি সতর্ক থাকত তাহলেই বুঝতে পারত যে চার জোড়া হিংস্র লোলুপ চোখে গাছ পালার আড়াল থেকে তার উপর নজর রেখে চলেছে। যেই সে ভোলা জায়গাটার মাঝখানে পৌঁছে গেল অমনি ভয়ঙ্কর চীৎকার করতে করতে বীভৎসভাবে সজ্জিত চারজন সৈনিক লাফিয়ে পড়ে তার দিকে ছুটে এল।
লোবোঙ্গোর ছেলে ওরান্ডো আগে কখনও চিতা-মানুষদের সংঘের ভয়ঙ্কর কোন সদস্যকে চোখে দেখে নি; তবু এই চারজনকে চিনতে তার কোন অসুবিধা হল না। তখন তারা চারদিক থেকে তাকে ঘিরে ফেলেছে।
মেয়েটি গুলি ছুঁড়তেই গোলাটো যন্ত্রণায় চীৎকার করে উঠল; ডান হাতের কনুইয়ের উপরটা বাঁ হাতে চেপে ধরে ছুটে তাঁবু থেকে বেরিয়ে গেল। কালি বাওয়ানা উঠে পোশাক পরল, খাপে-ঢাকা পিস্তলসহ কার্তুজের বেল্টটা বেঁধে নিল।
