টারজান যখন শিবিরে কফি খাচ্ছিল, তখন ওপার নগরীর বাইরেকার পাঁচিলের সবচেয়ে উঁচু জায়গাটার উপর দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছিল একটা লোক। লোকটা বেঁটে এবং বিকৃত ধরনের। তার মাথায় জটা আর মুখে দাড়ি ছিল। গায়ে ছিল বাঁদরদের মত লোম। তার চোখ দুটো ছিল ছোট ছোট, দাঁতগুলো বড় বড় আর পা দু’খানা বাঁকা বাঁকা।
মন্দিরের প্রধান পুরোহিত কাদিজ তখন মন্দিরের পাশে একটা পুরোনো গাছের তলায় বসেছিল। তার সঙ্গে ছিল বারোজন তার অধীনস্থ পুরোহিত।
পাহারাদার সোজা কাদিজের সামনে গিয়ে বলল, অচেনা একদল বিদেশী ওপার নগরীর দিকে উত্তর পশ্চিম দিক থেকে এগিয়ে আসছে।
তখন কাদিজ তার দলের পুরোহিতদের নিয়ে মন্দির সংলগ্ন বাগান থেকে নগর প্রাচীরের দিকে চলে গেল। পাঁচিলের উপর থেকে দেখল সত্যিই একদল লোক এগিয়ে আসছে। দলটা তখন অনেকটা এগিয়ে। এসেছে এবং তাদের স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।
একজন পুরোহিত প্রধান পুরোহিতকে বলল, সেই টার্মাঙ্গানী যে নিজেকে টারজান বলে পরিচয় দেয়। দলের বাকি সবাই কৃষ্ণকায় নিগ্রো।
কাদিজ বলল, তুমি ঠিক বলছ? টারজান আসছে?
অন্য একজন পুরোহিত বলল, হ্যাঁ, টারজানই বটে।
টারজানকে চিনতে পারার সঙ্গে সঙ্গে কাদিজ চীৎকার করে উঠল, ওকে ঢুকতে দিও না। ওকে ঢুকতে দিও না। যাও, এখনি একসোজন যোদ্ধা নিয়ে এস। ওদের সবাইকে মেরে ফেলব নগর প্রাচীরে ঢোকার আগেই।
একজন পুরোহিত বলল, কিন্তু কাদিজ, প্রধান পুরোহিত লা ত টারজানকে আসতে বলেছিল। কারণ টারজান তাকে হাতির কবল থেকে বাঁচিয়েছিল। ও তাই টারজনের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছিল।
কাদিজ তাকে ধমক দিয়ে বলল, চুপ করো। ওদের ওপারে ঢুকতে দেয়া হবে না। ওদের আমি হত্যা করব। যে আমার বিরুদ্ধে কোন কথা বলবে বা আমার উদ্দেশ্য ব্যর্থ করে দেবার কথা বলবে তাকে আমি। নিজের হাতে খুন করব।
এদিকে পাঁচিল পার হয়ে নগর সীমানার বাইরে টারজনের বা তার দলের কোন চিহ্ন দেখতে পেল না কাদিজ। তখন সকাল হয়ে গেছে। সে ক্রমাগত উপত্যকার উপর দিয়ে টারজনের সন্ধানে হেঁটে যেতে লাগল। এইভাবে অনেকটা দূর যাওয়ার পর ডালপালার এক পরিত্যক্ত শিবির দেখতে পেল কাদিজ।
শিবিরটা পরিত্যক্ত হলেও ভিতরটায় ঢুকে খোঁজ করতে লাগল কাদিজ। এক সময় তার এক যোদ্ধা টারজনের অচেতন দেহটাকে পড়ে থাকতে দেখে চীৎকার করে উঠল।
পুরোহিত ছুটে গিয়ে টারজনের বুকের উপর কান পেতে দেখে বলল, না মরেনি, বেঁচে আছে।
কাদিজ তখন বলল, ওর হাত পা বেঁধে ফেল। যে ব্যক্তি একদিন বেদী থেকে পালিয়ে এসে সূর্যদেবতার বেদীকে কলুষিত করেছে আজ তার উপর প্রতিশোধ নেবার জন্য সূর্যদেবতাই তাকে তুলে দিয়েছেন আমাদের হাতে। ওকে টেনে রোদের আলোয় নিয়ে এস। সূর্যদেবতা চোখ মেলে তাকিয়ে ওকে দেখুন।
এই কথা বলে সে তার কোমর থেকে ছুরিটা খুলে সূর্যের দিকে মুখ তুলে টারজানকে বলি দেবার জন্য উদ্যত হলো।
পুরোহিতদের মধ্যে একজন কাদিজের এই কাজের প্রতিবাদ করে বলল, কাদিজ, তুমি বলি দেবার কে? এ কাজ হলো প্রধান পুরোহিত লা-এর। আমাদের রানী লা-ই একমাত্র সূর্যদেবতার কাছে কাউকে বলি দিতে পারে।
কাদিজ তাকে ধমক দিয়ে বলল, চুপ করো ডুথ। আমি হচ্ছি প্রধান পুরোহিত লা-এর স্বামী আমার কথাই হলো আইন। যদি বাঁচতে চাও ত আমার উপর কোন কথা বলবে না।
ডুথ রেগে গিয়ে বলল, তুমি যদি লা এবং সূর্যদেবতাকে রুষ্ট করে তোল তাহলে তোমাকেও অন্যদের মত শাস্তি পেতে হবে।
কাদিজ বলল, সূর্যদেবতা আমাকে বলেছে মন্দির অপবিত্র করার অপরাধে একে বলি দিতে হবে আমাকে।
এই বলে সে টারজনের পাশে নতজানু হয়ে বসে তার বুকটা লক্ষ্য করে ছুরিটা ধরল।
এমন সময় একটা বড় মেঘ এসে আকাশে মধ্যাহ্নের সূর্যটাকে ঢেকে দিল। কাঁদিজের মনে হঠাৎ সন্দেহ দেখা দিল। তবে কি সূর্যদেবতা তার এই কাজ সমর্থন করছেন না? তাই ভয় পেয়ে ছুরিটা। টারজনের বুকে বসাতে গিয়েও বসাল না। উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল! মেঘটা না কাটা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে লাগল। ভাবল আবার সূর্য দেখা দেবার সঙ্গে সঙ্গে সে বলির কাজটা সেরে ফেলবে।
কাদিজ যখন দেখল মেঘটা কেটে আসছে এবং মেঘের প্রান্ত থেকে সূর্য এখনি বেরিয়ে আসবে তখনি সে আবার বসে ছুরিটা উপরে তুলে ধরল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে পিছন থেকে নারীকণ্ঠে কে তার নাম ধরে ডাকল, কাদিজ।
মুখ ঘুরিয়ে কাদিজ দেখল, ওপারের প্রধান পুরোহিত লা তার পিছনে দাঁড়িয়ে তার পিছনে ডুথ আর বারো তেরোজন পুরোহিত তার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
লা বলল, এর মানে কি কাদিজ?
কাদিজ বলল, সূর্যদেবতা এই নাস্তিক অধর্মাচারীর জীবন নিতে চাইছে।
লা ক্রুদ্ধভাবে বলল, মিথ্যা কথা। সূর্যদেবতার কিছু বলার থাকলে তা তাঁর প্রধান পুরোহিতের মাধ্যমেই বলবেন। মনে রাখবে অতীতে এই ধরনের ঔদ্ধত্যের জন্য অনেক প্রধান পুরোহিতকে মন্দিরের। বেদীতে বলি দেয়া হয়েছে।
কাদিজ এবার নীরবে খাপের মধ্যে ছুরিটা ঢুকিয়ে রেখে ডুথের দিকে একবার ক্রুদ্ধভাবে তাকিয়ে চলে গেল সেখান থেকে। সে বুঝল ডুথই ছুটে গিয়ে লাকে খবর দিয়ে এখানে নিয়ে এসেছে।
কিন্তু লা এবার মুস্কিলে পড়ল। সে তার পদাধিকারবলে কাদিজের হাত থেকে বাঁচাল টারজানকে কিন্তু অন্য সব পুরোহিতদের ইচ্ছা সে নিজের হাতে টারজানকে বলি দেয়। এর আগে সে টারজানকে বেদী থেকে দু-দু’বার ছেড়ে দিয়েছে।
