কিছুদিনের মধ্যে বাংলো থেকে ওপার নগরীর পথে রওনা হয়ে পড়ল টারজান।
টারজনের বাংলো থেকে ওপার নগরী পঁচিশ দিনের পথ। টারজান একা হলে সে গাছে গাছে অনেক তাড়াতাড়ি পৌঁছতে পারত। কিন্তু ওয়াজিরি যোদ্ধারা বেশি দ্রুত পথ চলতে না পারায় দেরী হচ্ছিল টারজনের। প্রতিদিন রাত্রি হলেই পথের ধারে লতাপাতা ডালপালা দিয়ে একটা করে শিবির তৈরি করত।
একদিন টারজান শরাহত এক হরিণকে দেখে ছুটে গেল তার দিকে। মরা হরিণটার পাশে একটা পায়ের ছাপ দেখতে পেল টারজান। সেটা পরীক্ষা করে এঁকে দেখল ছাপটা কোন শ্বেতাঙ্গের পায়ের।
ওয়াজিরিরা তখন শিবিরে তার জন্য অপেক্ষা করছে ভেবে মরা হরিণটা কাঁধে করে শিবিরে ফিরে গেল টারজান। পরদিন সকালে আবার রওনা হলো ওরা ওপারের পথে। টারজান ওয়াজিরিদের এগিয়ে যেতে বলে অদৃশ্য শিকারীর পায়ের ছাপ অনুসরণ করে তার খোঁজ করতে লাগল।
পথে একদল বাঁদর-গোরিলার সঙ্গে দেখা হলো। তারা টারজানকে বলল, গতকাল তুমি আমাদের গোরিলা যুবক গোবুকে বধ করেছ। তুমি চলে যাও, তা না হলে আমরা তোমাকে হত্যা করব।
টারজান বলল, আমি তোমাদের গোবুকে হত্যা করিনি।
সে বুঝল যার পায়ের ছাপ দেখতে পেয়েছে সেই শ্বেতাঙ্গই হয়ত গোবুকে বধ করেছে। তাই ওরা ভুল করে শ্বেতাঙ্গ টারজানকে গোবুর হত্যাকারী ভাবছে।
ওপার নগরীর কথা আর তার মূল উদ্দেশ্যের কথা ভুলে গিয়ে সেই হত্যাকারী শ্বেতাঙ্গের খোঁজ করে যেতে লাগল। এইভাবে ওপারে নগরীর উপত্যকার একধারে পাহাড়ের পাদদেশে গিয়ে হাজির হলো টারজান। সেখানে গিয়ে কতকগুলো পায়ের ছাপ দেখতে পেল।
টারজান পরীক্ষা করে দেখল সে ছাপগুলো কতকগুলো কৃষ্ণকায় নিগ্রো আর কতকগুলো শ্বেতাঙ্গের। তাদের মধ্যে একজন নারীও আছে। দলটাকে ধরার জন্য এগিয়ে যেতে লাগল টারজান।
কিছুদূর গিয়ে একটা শিবির দেখতে পেল সে।
টারজান বাংলো থেকে চলে গেলে কোরাকরা নির্বিঘ্নেই দিন কাটাচ্ছিল।
এইভাবে এক সপ্তাহ কেটে যাবার পর একদিন নাইরোবি থেকে এক পিওন একখানা টেলিগ্রাম নিয়ে এল। তাতে জানা গেল লন্ডনে জেনের বাবার দারুণ অসুখ; জেনকে সেখানে যেতে হবে। ঠিক হলো। জেন সেইদনই রওনা হবে লন্ডনের পথে। কোরাক তাকে নাইরোবিতে দিয়ে আসবে। সেখান থেকে সে লন্ডনগামী জাহাজে চাপবে।
কোরাক আর জেন দু’জনেই যখন বাড়িতে ছিল না তখন একদিন বাড়ির এক বিগ্রোভৃত্য জাদ-বাল জার খাঁচা পরিষ্কার করার সময় অসাবধাণতাবশত খাঁচার দরজাটা খোলা রেখেছিল। এই অবসরে জাদ বাল-জা বনে পালিয়ে যায়।
এদিকে সেই রাত্রিতে অচেনা বিদেশীদের খোঁজে এগিয়ে যেতে যেতে একটা অস্থায়ী শিবিরের সামনে এসে পড়ল টারজান। শিবিরের সামনে একটা গাছের উপর উঠে পাতার আড়াল থেকে শিবিরের লোকজনদের গতিবিধি লক্ষ্য করতে লাগল। দেখল শিবিরে মোট চারজন শ্বেতাঙ্গ পুরুষ আছে আর একটি ঘরে একজন মহিলা আছে বলে মনে হলো। শ্বেতাঙ্গ চারজনের মধ্যে দু’জন ইংরেজ, একজন জার্মান, একজন রুশদেশীয়।
টারজান দেখল শিবিরের কাছে একটা সিংহের গর্জন শুনে ব্লুবার নামে জার্মান লোকটা ভয়ে উলফটে পড়ে গেল।
এমন সময় টারজান গাছ থেকে নেমে শিবিরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। শিবিরের সামনে যে আগুন জ্বলছিল তার আভায় টারজনের গোটা দৈত্যাকার চেহারাটা প্রকট হয়ে উঠল সকলের কাছে। একটা তাঁবুর ঘরের মধ্যে ফ্লোরা কার্লের সঙ্গে কথা বলছিল। সে ঘরের ভিতর থেকে টারজানকে দেখেই চিনতে পারল। দেখার সঙ্গে সঙ্গে ভয় পেয়ে গেল ফ্লোরা, কারণ সে টারজনের লন্ডনের বাড়িতে বেশ কিছুদিন কাজ করেছে এর আগে। তার কাছ থেকে ভাল ব্যবহারও পেয়েছে। টারজান আর জেনের মধ্যে ওপার নগরীর ধনরত্ন নিয়ে যে সব কথাবার্তা হত তা শুনেই উচ্চভিলাষ জাগে তার মনে। সে তখন একটা দলের। সঙ্গে ভিড়ে গিয়ে ওপার নগরীতে গিয়ে সেই ধনরত্ন লুণ্ঠন করে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করে।
ফ্লোরা গোপনে কার্লকে বলল, আমাদের পথে এখন একমাত্র বাধা হলো এই টারজান। ও যেন আমাদের আসল উদ্দেশ্যের কথা কখনই জানতে না পারে। আমিও ওকে দেখা দেব না। ওকে এখন হত্যা করাও যাবে না। কারণ ওর বিশ্বস্ত ওয়াজিরি আদিবাসীরা তাহলে আমাদের মেরে ফেলবে। তার থেকে এক কাপ কফির সঙ্গে কিছু বিষ মিশিয়ে ওকে অচেতন করে ফেলে রেখে আমাদের পালিয়ে যাবার ব্যবস্থা করো।
টারজান শিবিরের সামনে দাঁড়িয়ে তাদের প্রশ্ন করল, কে তোমরা? আমার বিনা অনুমতিতে আমার বন রাজ্যে প্রবেশ করে কি করছ? আমি হচ্ছি এ বনের রাজা টারজান।
এস্তেবানের চেহারাটা অনেকটা টারজুনের মত দেখতে। সে তখন বাইরে কোথায় গিয়েছিল। তাই ওরা হঠাৎ টারজানকে দেখে ভাবল, এস্তেবান টারজান সেজে এসে ভয় দেখাচ্ছে তাদের। কিন্তু ফ্লোরার কথায় ভিতর থেকে কার্ল এসে সরাসরি টারজনের কথার উত্তরে বলল, আসুন আসুন, আমরা সত্যিই ভাগ্যবান যে আপনার দর্শন পেলাম এবং নিজে থেকে এসে দেখা দিলেন আপনি। আপনার নাম আমরা শুনেছি, কিন্তু দেখার সৌভাগ্য হয়নি। আমরা পথ হারিয়ে কষ্ট পাচ্ছি এখানে। আপদি যদি পথটা আমাদের দেখিয়ে দেন ত ভাল হয়। এখন একটু দয়া করে বসুন, এক কাপ কফি খান।
এদিকে কফি তৈরি করার সময় টারজনের কফির কাপে ওষুধ ঢেলে দিল কার্ল, টারজনু তার কিছুই জানতে পারল না।
