টারজান সিংহশাবকটাকে সঙ্গে নিয়ে দুধের খোঁজে একটা আদিবাসী গাঁয়ে গেল।
সর্দার বলল, তার অনেক ছাগল আছে। ছাগলের দুধ এনে দেবে।
এমন সময় টারজনের চোখে পড়ল একটা মাদী কুকুর শুয়ে আছে। তার সম্প্রতি বাচ্চা হয়েছিল। কিন্তু বাচ্চাগুলো মারা যাওয়ায় তার দুধের বাটগুলো দুধে ভর্তি। টারজান দেখল ঐ কুকুরটার দুধ সিংহের বাচ্চাটাকে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করতে পারলে আর ভাবনা থাকবে না।
টারজান বলল, কুকুরটাকে আমি কিনে নিয়ে যাব।
সর্দার বলল, কিনতে হবে না মালিক। ওকে আপনি নিয়ে যান। দরকার হলে আরো কুকুর নিয়ে যান।
সে রাতটা আদিবাসীদের গায়েই কাটাল টারজানরা।
পরদিন সকাল হলেই বাংলো বাড়ির দিকে রওনা হলো ওরা। বাংলোটা আর ওয়াজিরি বস্তিটা আর বেশি দূরের পথ নয়।
টারজান, জেন আর কোরাক বন পার হয়ে সেই ফাঁকা জায়গাটায় এসে দেখল তাদের বাংলো বাড়িটা ঠিকই চারপাশের গাছপালা আর ওয়াজিরিদের বস্তির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। টারজান ভেবেছিল জার্মানদের দ্বারা একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে বাড়িটা।
টারজানরা বাংলোটার কাছে যেতেই ওয়াজিরি সর্দার বুড়ো মুভিরো এগিয়ে এসে প্রথমে অভ্যর্থনা জানাল তাদের।
টারজানদের আসার খবর পেয়ে বিশ্বস্ত ওয়াজিরিরা ছুটে এসে তাদের ঘিরে আনন্দে নাচতে লাগল।
এদিকে দিন দিন বেড়ে উঠতে লাগল সিংহশাবক জাদ-বাল-জা। টারজান তাকে এরই মধ্যে অনেককিছু শিখিয়েছে। টারজনের কথামত তার সঙ্গে চলাফেরা করে, কোন জিনিস হারিয়ে গেলে গন্ধসূত্র ধরে খুঁজে বার করে আনতে পারে। কোন জিনিস বয়ে নিয়ে যেতে পারে।
সিংহের বাচ্চাটাকে খাওয়ানোর জুন্য এক অদ্ভুত পদ্ধতি অবলম্বন করে টারজুন। একটা মানুষের ডামি বা প্রতিমূর্তি করে তার গলায়-মাংস বেঁধে দিত খাবার সময়। ডামিটার গলায় মাংস বেঁধে দাঁড় করিয়ে দেয়া হত। তারপর টারজান তাকে মাংস খাবার হুকুম দিতেই সিংহ বাচ্চাটা লাফ দিয়ে ডামিটার গলা থেকে মাংস ছিনিয়ে নিত।
সেদিন বিকালে টারজান জেন আর কোরাককে সঙ্গে নিয়ে বাংলো থেকে কিছুদূরে জঙ্গলের মধ্যে এমন একটা জায়গায় গিয়ে উঠল যেখানে হরিণ পাওয়া যায়। তাদের সঙ্গে চারজন নিগ্রো শিকারীও ছিল। কোরাক একুশো পাউন্ড বাজী রেখেছিল। সিংহশাবকটা যদি কাছে মাংস থাকা সত্ত্বেও টারজনের কথা মত চলে তাহলে সে তার বাবাকে একশো পাউন্ড দেবে। জাদ-বাল-জা টারজনের ঘোড়ার পিছনে পিছনে। বনে আসতে লাগল।
ওরা চুপি চুপি, একটা ঝোপের ধারে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। একদল হরিণ চড়ে বেড়াচ্ছিল। এদিক থেকে সিংহ জাদ-বাল-জাকে ছেড়ে দেয়া হল। জাদ-বাল-জাকে দেখে হরিণরা দল বেঁধে ছুটে পালাল। শুধু একটা হরিণ পালাতে পারল না। জাদ-বাল-জা তাকে ধরে ফেলল সে পালাবার আগেই।
কোরাক বলল, এবার ওর আসল পরীক্ষা।
টারজান বলল, ও শিকারকে আমার কাছে নিয়ে আসবে।
জাদ-বাল-জা প্রথমে মরা হরিণটাকে নিয়ে ইতস্তত করতে লাগল। একবার ক্ষোভে গর্জন করে উঠল। তারপর ঘাড়টা ধরে টারজনের সামনে টেনে আনল মৃত দেহটাকে। টারজান এবার জাদ-বাল জার মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে প্রশংসা করে নিচু গলায় তার কানে কানে কি বলল।
জেন ও কোরাক বিস্ময়ে অবাক হয়ে গেল।
জাদ-বাল-জার বয়স মাত্র বছর দুই হলেও তখনই সাধারণ সিংহশাবকের থেকে আকারে অনেক বিরাট হয়ে উঠল সে। তার বুদ্ধিও সাধারণ সিংহের থেকে অনেক বেশি হয়ে উঠল। তাকে দেখে একই সঙ্গে গর্ব আর আনন্দ বোধ করত টারজান। সে তাকে নিজের হাতে সব কিছু শেখাতে থাকে।
এক বছর পর্যন্ত জাদ-বাল-জা টারজনের বাংলো বাড়িতে ছাড়া অবস্থায় সর্বত্র ঘুরে বেড়াত। টারজনের বিছানার নিচে এক জায়গায় শুত। কিন্তু তার বয়স এক বছর পূর্ণ হতেই একটা বড় খাঁচার ভিতর তাকে রাখার ব্যবস্থা করল টারজান। মাঝে মাঝে তাকে নিয়ে শিকার করতে যেত সে জঙ্গলে।
এমন সময় টারজান খবর পেল তার জমিদারীর পশ্চিম আর দক্ষিণ দিকে একদল লুণ্ঠনকারী অনেক আদিবাসী অধ্যুষিত গা আক্রমণ করে হাতির দাঁত লুণ্ঠন করে নিয়ে যাচ্ছে এবং আদিবাসীদের উপর পীড়ন চালাচ্ছে। শেখ আমুর বেন খাতুরের পর থেকে এই ধরনের ঘটনা আর ঘটেনি।
কথাটা শুনে টারজান রেগে গেলেও এক মাস কেটে গেল এবং এর মধ্যে কোন অপ্রীতিকর ঘটনার কথা শোনেনি।
এদিকে জার্মান আক্রমণের ফলে টারজনের অনেক আর্থিক ক্ষতি হয়। বাংলো মেরামত আর ওয়াজিরি বস্তির উন্নয়নের জন্য অনেক টাকা খরচ হয়। অনেক ফসল ও মজুত শস্য নষ্ট হয়। তাই বাংলোতে ফিরে আসার পর থেকে অর্থাভাব দেখা দেয় টারজনের সংসারে।
একদিন রাত্রিতে টারজান জেনকে বলল, আমার মনে হচ্ছে আমাকে একবার ওপার নগরীতে যেতে হবে।
জেন বলল, আমার কিন্তু ভয় লাগছে। তুমি দু’বার গিয়ে কোনরকমে ফিরে এসেছ। তৃতীয়বার গেলে কোন বিপদ ঘটতে পারে। এমন কিছু অভাব হয়নি আমাদের। আমাদের এখনো যা আছে তাতে আমাদের খাওয়া পরার কোন অভাব হবে না।
টারজান বলল, এর আগের বারে ওয়ারপার আমার পিছু নিয়েছিল। তাছাড়া ভূমিকম্পের ফলে আটকে পড়ি আমি। এবার এ ধরনের কোন দুর্ঘটনার সম্ভাবনা নেই।
জেন বলল, তাহলে কোরাক বা জাদ-বাল-জাকে সঙ্গে নিয়ে যাও।
টারজান বলল, না, ওরা থাক। কোরাক বাংলোর নিরাপত্তা রক্ষা করবে। আমার অনুপস্থিতিতে বিপদ ঘটতে পারে। জাদ-বাল-জাকে সঙ্গে করে সে শিকার করে নিয়ে আসবে। তাছাড়া আমি বেশির ভাগ পথ দিনের বেলায় হাঁটব। কিন্তু সিংহটা রোদে গরমে মোটেই হাঁটতে পারবে না। আমার সঙ্গে যাবে পঞ্চাশজন ওয়াজিরি যোদ্ধার একটা দল।
