রোন্ডা বলল, পাথরগুলো কুড়িয়ে নিতে পারি?
বালজা বলল, তুমি যতটা বয়ে নিয়ে যেতে পারবে, নিতে পার।
রোন্ডা বলল, এগুলো হীরে আর এই জন্যই এটাকে হীরকদেশের উপত্যকা। এতক্ষণে বুঝতে পারলাম ব্যাপারটা। ওদের নিয়ে ট্রাকে করে অনেক হীরে বোঝাই করে নিয়ে যেতে পারি।
টারজান বলল, না, জীবনে আর কখনো এই অভিশপ্ত হীরকদেশের নাম করবে না। এটাকে চিরকালের মত বিদায় জানাবে।
এরপর ওরা রাতের মধ্যে দক্ষিণ দিকে একটা পথ ধরল। গোরিলা-নগরী থেকে পালিয়ে আসা গোরিলাগুলো যে গুহায় থাকে সেগুলোকে দূর থেকে ওদের দেখিয়ে দিল বালজা। ওরা এখান থেকে দক্ষিণ দিকে গিয়ে সেই পাহাড়টায় গিয়ে পৌঁছবে, তার পাদদেশে আছে ওম্বাম্বি জলপ্রপাত যেখানে ওরমানদের অপেক্ষা করতে বলে এসেছে টারজান।
সারারাত ধরে পথ চলল ওরা। রোন্ডা অত্যধিক ক্লান্ত হয়ে পড়ায় টারজান তাকে কাঁধে করে বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। বালজা সমানে অক্লান্তভাবে পথ হাঁটতে লাগল। এইভাবে উঁচু নিচু অনেক পাহাড়ী পথ পার হয়ে ওরা ভোরবেলায় সেই পাহাড়টায় গিয়ে পৌঁছল।
কিছু পরে রোদ উঠতেই কুয়াশা কেটে গেল। ওরা সেই পাহাড়ের পাদদেশে এসে উপস্থিত হলো। টারজান বলল, এখান থেকে আমাদের শিবির আর বেশি দূরে নয়।
রোন্ডা বলল, এবার আমাকে নামিয়ে দাও স্ট্যানলি, এবার আমি হাঁটতে পারব। কিন্তু শিবিরে যাবার আগে বালজার জন্য একটা স্কার্ট যোগাড় করতে হবে।
টারজান বলল, ও সভ্য জাগতে গিয়ে বদলে যাবে একেবারে।
মাইলখানেক যাবার পর কতকগুলো তাঁবু দেখতে পেল ওরা। রোন্ডা চীৎকার করে উঠল, সফরি, আমাদের সফরি। প্যাটকে দেখতে পাচ্ছি।
ওরা শিবিরের কাছে এগিয়ে যেতেই শিবিরের একজন ওদের দেখতে পেয়ে চীৎকার করতে লাগল। তখন সবাই ছোটাছুটি শুরু করে দিল। সবাই রোন্ডাকে চুম্বন করল তাকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে। নাওমি ম্যাডিসন টারজানকে চুম্বন করতেই বালজা তাকে মারতে গেল।
টারজান তার কোমর ধরে তাকে শান্ত করে বলল, ওরা সবাই তোমার বন্ধু। কাউকে মারতে নেই। ওদের সঙ্গে হলিউডে যাবে। সভ্য হবে।
বালজাকে দেখে সবাই আশ্চর্য হয়ে গেল। ওরমান ও ওগ্রেডি তার জন্য একটা নতুন ভূমিকা সৃষ্টি করল ছবিতে। ওরমান বলল, সে ছবির কাজ শুরু করবে। সে বলল, সে নিজেও কোন একটা ভূমিকায় অভিনয় করবে। ওগ্রেডি অভিনয় করবে মেজর হোয়াইটের শিকারীর ভূমিকায়।
শেষে ওরমান বলল, বালজার জন্য এমন একটা ভূমিকা তৈরি করেছি যে ভূমিকায় ও অভিনয় করে তাক লাগিয়ে দেবে সবাইকে।
এরপর দু’সপ্তাহ ধরে ওরমান পরপর কয়েকটা দৃশ্যের ছবি তুলে ফেলল। টারজান এক সময় একটা দূর আদিবাসী গা থেকে একদল নিগ্রোভৃত্য নিয়ে এল শিবিরের কাজ ও মালপত্র বহন করার জন্য।
হঠাৎ একদিন একটা পিওন এসে একটা টেলিগ্রাম দিয়ে গেল ওরমানের হাতে। ওদের স্টুডিওর প্রযোজক খবর পাঠিয়েছে ওকে, দলের সকলকে ও ছবির যাবতীয় সাজসরঞ্জাম ও মালপত্র নিয়ে হলিউডে ফিরে যেতে হবে।
আর ছবি তোলা হবে না ভেবে মনটা খারাপ হয়ে গেল ওরমানের। কিন্তু বাকি সবাই খুশিতে লাফাতে লাগল। দীর্ঘদিন পর সাক্ষাৎ মৃত্যুর কবল থেকে আবার ফিরে যাবে ওরা হলিউডে।
টারজান ওরমানকে বলল, ও ওদের সঙ্গে বানসুটোদের গাঁ পর্যন্ত যাবে। সে ওদের বলল, বানসুটোদের গাঁয়ের সর্দারের সঙ্গে তার কথা হয়েছে সে আর ওদের কোন ক্ষতি করবে না।
বানসুটোদের গায়ের সীমানাটা ওদের পার করিয়ে দিয়ে টারজান ওদের বলল, আমি একজায়গায় যাচ্ছি। জিঞ্জায় গিয়ে তোমাদের সঙ্গ নেব।
সেখান থেকে পুঙ্গুদের গাঁয়ে ওবরস্কির খোঁজে চলে গেল টারজান। সে তখনো পর্যন্ত দলের কাউকে তার আসল পরিচয় দেয়নি। সবাই তাকে স্ট্যানলি ওবরস্কি বলেই জানে।
কিন্তু পুঙ্গুর সঙ্গে দেখা হতেই সে বলল, দুঃখের কথা বাওয়ানা, তোমার সেই লোকটি এক সপ্তাহ আগে মারা গেছে। আমরা তার মৃতদেহটা জিঞ্জায় শ্বেতাঙ্গদের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি যাতে আমরা মেরেছি বলে কারো কোন সন্দেহ না হয়।
টারজনের মনটা খারাপ হয়ে গেল। ও ভেবেছিল ওবরস্কিকে ওদের সামনে নিয়ে গিয়ে হাজির করিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়ার পর নিজের আসল পরিচয়টা দেবে। কিন্তু তা আর হলো না। আর ও ওদের কাছে ফিরে যাবে না কখনো।
টারজান ও সোনালী সিংহ (টারজন এ্যাণ্ড দি গোল্ডেন লায়ন)
বাংলো বাড়িতে ফেরার পথে টারজান, তার স্ত্রী জেন আর তার ছেলে কোরাক বনপথে দেখল একটা মরা সিংহীর পাশে তার একটা জীবন্ত বাচ্চা ঘুমিয়ে আছে।
হাত বাড়িয়ে প্রথমে বাচ্চাটাকে ধরতে যেতেই সে গর্জন করে মুখটা সরিয়ে নিল। তার হাতটা আঁচড়ে দিতে গেল।
জেন বলল, অনাথা বেচারী, কিন্তু কি সাহস!
কোরাক বলল, এখনো ওর চার-পাঁচ মাস মার দুধ দরকার। ওকে আর বাঁচানো যাবে না।
টারজান বলল, ওকে মরতে দেয়া হবে না।
জেন বলল, তুমি তাহলে ওকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে লালন-পালন করবে?
টারজান বলল, হ্যাঁ, তাই করব।
এই বলে সে বাচ্চাটার ঘাড়ে ধরে তার গায়ে হাত বুলিয়ে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে কি বলতেই বাচ্চাটা চুপ করে রইল শান্ত হয়ে। তাকে বুকে তুলে নিল।
জেন আশ্চর্য হয়ে বলল, কি করে সম্ভব হলো এটা?
টারজান বলল, সভ্য জগতের মানুষরা এসব বুঝতে পারে না। বনেই আমার জন্ম।
