গোরিলাদেবতা বলল, সেই বন্দিনী মেয়েটি কোথায়?
সাফোক বলল, অন্তঃপুরে ছিল। হেনরি তাকে নিয়ে পালিয়ে গেছে।
কোন পথে পালিয়েছে?
আসুন, আমি দেখিয়ে দিচ্ছি।
এই বলে সে গোরিলাদেবতা আর টারজানকে নিয়ে সেই গুপ্ত সুড়ঙ্গপথটার শেষ প্রান্ত পৌঁছে গেল। তারপর বলল, এই দিকে হেনরি নগরের বাইরে কোথায় চলে গেছে।
টারজান আর না দাঁড়িয়ে তখনি নগরের বাইরে বেরিয়ে পড়ল রোন্ডার খোঁজে।
আরো এগিয়ে বনের মাঝে গিয়ে টারজান দেখল মাথায় ঝকরা চুলওয়ালা একজন নগ্ন শ্বেতাঙ্গ এক শ্বেতাঙ্গ নারীকে কাঁধের উপর নিয়ে ছুটছে আর এক শ্বেতাঙ্গ নারী সম্পূর্ণ উলফঙ্গ অবস্থায় তাকে তাড়া করে ছুটছে তার পিছনে।
বনটা পার হয়ে লোকটা একটা পাহাড়ে উঠতে লাগল। সে পিছন ফিরে টারজানকে দেখে বাঁদর গোরিলাদের ভাষায় বলল, ফিরে যাও। তা না হলে তোমাকে মেরে ফেলব।
এবার রোল্ডাকে চিনতে পেরে বলল, রোন্ডা!
লোকটা তখন টারজানকে মারার জন্য রোন্ডাকে পাহাড়ের গায়ে এক জায়গায় নামিয়ে রাখল। টারজান বলল, রোন্ডা, তুমি পাহাড়ের মাথায় উঠে যাও। আমি ওর সঙ্গে লড়াই করে ওকে আটকে রাখব।
সেই উলঙ্গ শ্বেতাঙ্গ যুবতী তখন শ্বেতাঙ্গ লোকটাকে বলল, মেয়েটা পালাচ্ছে, ওকে ধর।
লোকটা তখন টারজানকে ছেড়ে রোন্ডাকে ধরতে যেতেই টারজান তাকে গিয়ে ধরে ফেলল। লোকটার গায়ে প্রচুর শক্তি থাকলেও টারজান তার মুখে জোরে ঘুষি মেরে তাকে ফেলে দিয়ে তার বুকের উপর বসে আবার তার মাথায় আঘাত করল। কিন্তু তাকে হত্যা করল না। টারজান এবার উঠে দেখল সেই উলফঙ্গ মেয়েটা রোন্ডাকে ধরতে যাচ্ছে। সে তখন মেয়েটাকে ধরে পাহাড়ের মাথায় রোন্ডার কাছে উঠে গিয়ে তার দড়িটা দিয়ে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলল তাকে। মেয়েটা অনেক ধস্তাধস্তি করেও পেরে উঠল টারজনের সঙ্গে।
টারজান দেখল সেই গোরিলাগুলো এবার পাহাড়ের নিচে থেকে উপরে উঠার চেষ্টা করছে। কিন্তু ওরা যেখানে আছে সেখান থেকে পালাবার কোন পথ নেই। সে তখন চীৎকার করে গোরিলাদের বলল, তোমরা ফিরে যাও। তা না হলে তোমাদের দলের এই মেয়েটিকে হত্যা করব।
মেয়েটি তখন টারজনের মুখপানে তাকিয়ে হেসে বলল, ওরা থামবে না। তুমি আমাকে হত্যা করলেও ওরা তোমাকে ছাড়বে না। ধরতে পারলে ওরা আমাদের সকলকে খাবে। তুমি বরং পাথর ছুঁড়ে ওদের মার। তাহলে ওরা আর আসতে পারবে না।
টারজান দেখল মেয়েটি এখন শান্ত এবং কোনরকম বিরোধিতা করছে না তার। মেয়েটি টারজানকে বলল, এখন আমি তোমার। ওদের কাছে আর যাব না।
টারজান পাথর কুড়িয়ে গোরিলাদের মাথায় মারতে লাগল। তখনই সেই মেয়েটির বাঁধন খুলে দিতে সেও পাথর ছুঁড়তে লাগল। রোন্ডাও তাই করতে লাগল। মাথায় পাথর লাগায় গোরিলাদের কয়েকজন ঘায়েল হলো। তারা একটা গুহায় গিয়ে আশ্রয় নিল।
মেয়েটি বলল, আমরা এখানে দিন শেষ না হওয়া পর্যন্ত থাকব। অন্ধকার হয়ে গেলে ওরা আর বেরোবে না বা আমাদের তাড়া করবে না।
টারজান এক সময় মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করল, তুমি মানুষের মাংস খাও?
মেয়েটি ইংরেজিতে বলল, আমি বা মালবিয়াত কেউই খাই না।
টারজান বলল, মালবিয়াত কে?
মেয়েটি বলল, আমার লোক। আগে আমি ওর কাছে ছিলাম। এখন তুমি তার সঙ্গে লড়াই করে আমাকে জয় করে নিয়ে নিয়েছ। এখন আমি তোমার। তবে ও মেয়েটা কে?
এই বলে রোন্ডাকে দাঁত বার করে আক্রমণ করতে গেল। টারজান তাকে ধরে ফেলল।
মেয়েটি বলল, যতদিন তোমার কাছে আমি থাকব ততদিন তুমি অন্য কোন মেয়েকে কাছে রাখতে পারবে না।
টারজান বলল, ও আমার নয়।
মেয়েটি বলল, ওর নাম কি? তোমারই বা নাম কি? আমার নাম বালজা।
টারজান বলল, ওর নাম রোন্ডা আর আমার নাম স্ট্যানলি বলতে পার। তুমি ইংরেজি শিখলে কোথা থেকে?
বালজা বলল, যখন আমি লন্ডনে ছিলাম। পরে লন্ডন থেকে আমাকে তাড়িয়ে দেয় ওরা।
টারজান বলল, কেন তাড়িয়ে দিয়েছে তোমায়?
বালজা বলল, কারণ আমি ওদের মত নই। ওরা আমায় অনেক আগেই তাড়িয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু আমার মা আমায় লুকিয়ে রেখেছিল। পরে আমার সন্ধান পায় ওরা। তখন আমি পালিয়ে আসি।
টারজান বলল, মালবিয়াতও তোমার মত?
বালজা বলল, ও ইংরেজি শিখতে পারেনি। তুমি ওর থেকে ভাল। তোমাকে আমার ভাল লাগে। তুমি কি মালবিয়াতকে মেরে ফেলেছ?
টারজান বলল, না মরেনি বোধ হয়। আহত হয়ে পড়ে আছে।
বালজা একটা পাথর কুড়িয়ে শায়িত মালবিয়াতের উপর ছুঁড়ে দিল। মালবিয়াত কোনরকমে হাতে পায়ে গুঁড়ি মেরে ওদের চোখের আড়ালে চলে গেল।
বালজা বলল, আমি ওর কাছে ফিরে গেলে ও আমাকে মারবে। তবে আমি সুন্দরী বলে আমাকে কিছু বলবে না। কিন্তু আমি ওর কাছে আর যাব না। আমি তোমার সঙ্গেই যাব।
ক্রমে পাহাড়গুলোর উপর সন্ধ্যার ছায়া নেমে আসতে ওরা পাহাড়টা থেকে নেমে একটা গুহার দিকে গেল। গুহাটায় গিয়ে টারজান দেখল সরু হলেও গুহার দুটো দিকে খাড়া হয়ে উপরে উঠে গেছে এবং উপরটা ফাঁকা। ভাবল এখানে থাকার থেকে উপরে উঠে যাওয়া ভাল।
টারজান ওদের বলল, আমি আগে উপরে উঠে যাই। পরে দড়িটা নামিয়ে একে একে উঠে যাবে তোমরা।
উপরে উঠে গেল ওরা। তখন রাত্রি হয়ে গেছে। সেখানে গিয়ে একটা জলনিকাশের নালা দেখতে পেল। হঠাৎ বোন্ডা দেখল সেই নালাটির কতকগুলো পাথর অন্ধকারে জ্বলছে। সে বেশ বুঝতে পারল ওগুলো হচ্ছে হীরে। হীরে ছাড়া অন্ধকারে কোন পাথর এমন করে আলো দিতে পারে না।
