টারজান অন্ধকারে নগরটার একধার দিয়ে চলে যাওয়া পথটা ধরে প্রাসাদটার দিকে এগিয়ে চলল। প্রাসাদের একটা ঘরে মাত্র আলো জ্বলছিল। প্রাসাদের গেটে কোন পাহারা ছিল না।
প্রাসাদের ভিতর ঢুকে পর পর কয়েকখানা ঘর দেখতে পেল টারজান। কিন্তু হাত দিয়ে দেখল প্রতিটি ঘরের দরজায় তালা লাগানো আছে। একটা ঘরে তালা ছিল না। সেই ঘরে ঢুকে সে একটা সিঁড়ি পেল। সিঁড়িটা নিচে নেমে গেছে। সিঁড়িটা দিয়ে নিচে নেমে গিয়ে একটা সরু টানা বারান্দা পেল। তারপর একটা দরজা। দরজাটায় চাপ দিতেই সেটা খুলে গেল। কিন্তু টারজান খোলা দরজা দিয়ে একটা লম্বা ঘরে ঢুকে পড়তেই পিছন থেকে বন্ধ হয়ে গেল দরজাটা। টারজান হাত দিয়ে দেখল সেটা আর খুলছে না। ঘরখানার মধ্যে একটা মশালের আলো জ্বলছিল। মশালটা ঘরের এককোণে ছিল। টারজান দেখল নাওমির মত দেখতে এক সুন্দরী যুবতী তার দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে।
টারজান তার দিকে এগিয়ে যেতে মেয়েটি মুখ ঘুরিয়ে তাকে দেখে আশ্চর্য হয়ে বলল, স্ট্যানলি ওবরস্কি, তুমিও এখানে বন্দী হয়েছ?
হঠাৎ জোর গোলমালের শব্দে ঘুম থেকে জেগে উঠল রোন্ডা টেরী। জানালা দিয়ে দেখল, প্রাসাদের উঠোনে রাজা হেনরীর গোরিলাদের সঙ্গে দেবতার গোরিলাদের জোর লড়াই হচ্ছে। রাজার দল ক্রমশই হেরে যাচ্ছিল।
এমন সময় দরজা খুলে স্বয়ং রাজা হেনরি রোন্ডাকে ধরে নিয়ে যাবার জন্য ঘরে ঢুকল। রানীরা তখন ভয়ে রোন্ডার কাছ থেকে সরে গেল। হেনরি সোজা রোন্ডার কাছে এসে বলল, দেবতা তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছে। কিন্তু সে তোমাকে পাবে না। তুমি আমার।
এই বলে হেনরি রোন্ডাকে কাঁধের উপর তুলে নিয়ে প্রাসাদের সুড়ঙ্গপথ দিয়ে পালিয়ে যেতে লাগল। সুড়ঙ্গের শেষ প্রাণে একটা ঘর ছিল। সেখানে গিয়ে হেনরি বলল, এদিকে কেউ আসতে পারে না।
ঘরটা থেকে বেরিয়েই উপত্যকায় গিয়ে পড়ল হেনরি। একটা নদীর ধারে গিয়ে দাঁড়িয়ে বোন্ডাকে নামিয়ে দিল।
নদীর ধার দিয়ে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে নদীটা পার হলো হেনরি। সে রোন্ডার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছিল তাকে।
হঠাৎ একটা সিংহের গর্জন শুনতে পেল গোরিলারাজা হেনরি। ঘন কুয়াশায় ছেয়েছিল সমস্ত উপত্যকাটা। কিছু দেখা যাচ্ছিল না।
এবার সিংহটা খুব কাছে এসে পড়াতে রোন্ডা ভালভাবে দেখতে পেল। তার মনে হলো সিংহটা খুব ক্ষুধার্ত। হঠাৎ হেনরি রোন্ডাকে তুলে নিয়ে সিংহটার মুখের সামনে ছুঁড়ে ফেলে দিল। কিন্তু রোন্ডা মরার মত শক্ত হয়ে পড়ে রইল। সে জানত মরা মানুষকে সিংহ মারে না।
হেনরি একা ছুটে পালাচ্ছিল। কিন্তু তার জীবন্ত শিকার পালাচ্ছে দেখে সিংহটা লাফ দিয়ে তাকে ধরে ফেলল। দুজনেই গর্জন করতে লাগল। রোন্ডা একবার চোখ মেলে দেখল কিছু দূরে কতকগুলো গাছ রয়েছে। সে আরো দেখল সিংহ গোরিলারাজা হেনরিকে মেরে তার মুখটা চিবিয়ে খাচ্ছে। সে এখন তার শিকারের মাংস নিয়ে ব্যস্ত থাকবে ভেবে রোন্ডা উঠে ছুটে গিয়ে বনের মধ্যে ঢুকে পড়ল।
বনের মধ্যে ঢুকে একটা নদী পেল রোন্ডা। সে ভাবল নদীটার পাড় দিয়ে ওম্বাম্বি জলপ্রপাতের কাছে যেতে পারলেই ওর সঙ্গীদের দেখা পাবে।
নিবিড় ক্লান্তিতে পা টেনে টেনে চলছিল রোন্ডা। হঠাৎ তার সামনে একটা গাছ থেকে আধা-মানুষ আধা-গোরিলার মত একটা ভয়ংকর জন্তুকে নেমে পড়তে দেখে চমকে উঠল সে। সে জন্তুর মুখটা মানুষের মত। কিন্তু দেহ আর কানটা বাঁদরের মত।
রোন্ডা ভাবল সে নদীর জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে সাঁতার কেটে ওপারে পালিয়ে যাবে। কিন্তু ঝাঁপ দেবার আগেই গোরিলা মানুষটা ধরে ফেলল তাকে। সঙ্গে সঙ্গে আর একটা ঐ ধরনের গোরিলা মানুষ গাছ থেকে নেমে রোন্ডার অন্য হাতটা ধরে ফেলল। দুজন দুদিকে তার দুটো হাত ধরে টানতে লাগল। রোন্ডার মনে হতে লাগল তার হাত দুটো ছিঁড়ে যাবে।
এমন সময় এক নগ্ন শ্বেতাঙ্গ মানুষ কোথা থেকে এসে তার হাতের মোটা লাঠি দিয়ে গোরিলা দুটোকে মেরে তাড়িয়ে দিল। তারপর সে তার কাঁধের উপর রোন্ডাকে তুলে নিতেই প্রায় বিশটা গোরিলা এসে ঘিরে ফেলল তাদের। রোন্ডা দেখল যে মানুষটা তাকে ধরেছিল তার দেহ ও মুখচোখ সত্যিই সুন্দর ও সুগঠিত। তার মাথায় ছিল লম্বা লম্বা চুল। সিংহের কেশরের মত ঘাড়ের উপর ছড়িয়ে পড়েছিল চুলগুলো। গোরিলাগুলো শ্বেতাঙ্গ মানুষটার ভয়ে কেউ রোন্ডার কাছে আসতে পারছিল না।
ঠিক এই সময়ে কাছের একটা গাছ থেকে উলফঙ্গ এক শ্বেতাঙ্গ যুবতী নেমেই ছুটে এল তাদের দিকে।
মেয়েটি আসতেই সকলেই সম্ভ্রমের সঙ্গে পথ ছেড়ে দিল। কিন্তু সেই শ্বেতাঙ্গ লোকটা রোন্ডাকে কাঁধের উপর চাপিয়ে উধ্বশ্বাসে ছুটে পালাতে লাগল। সেই শ্বেতাঙ্গ মেয়েটিও ছুটতে লাগল লোকটার পিছু পিছু।
টারজান যখন দেখল রাজার গোরিলাদল একেবারে হেরে গেল এবং দেবতার গোরিলাদের সংখ্যা ক্রমশই বেড়ে যাচ্ছে তখন সে গোরিলা দেবতার কাছে গিয়ে তার প্রতিশ্রুতির কথাটাকে স্মরণ করিয়ে দিল। দেবতা গোরিলা তখন পলাতক রাজা হেনরির খোঁজ করছিল। টারজান বলল, আগে সেই বন্দিনীকে খুঁজে বের করতে হবে।
গোরিলাদেবতা টারজানকে সঙ্গে করে জনকতক গোরিলাযোদ্ধা নিয়ে প্রাসাদের অন্তঃপুরের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।
অন্তঃপুরে ঢোকার মুখে সিঁড়ির কাছে সাফোক আর হাওয়ার্ড পাহারা দিচ্ছিল। তারা দুজনেই রাজার দলের গোরিলা হলেও তারা যখন দেখল রাজার দল হেরে গেছে এবং রাজা পালিয়ে গেছে তখন তারা গোরিলাদেবতার বশ্যতা স্বীকার করল। গোরিলাদেবতাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে নতজানু হয়ে বলল, তারা দেবতারই সেবক এবং রাজাকে তারা তাড়িয়ে দিয়েছে প্রাসাদ থেকে।
