ঈয়াদ দেখল দু’জন গোরিলা তাকে ধরার জন্য পাহাড়ের উপর থেকে নেমে আসছে। সে তখন সেখানে আর না দাঁড়িয়ে ঘোড়াটাকে ঘুরিয়ে ছুটিয়ে দিল পিছন দিক দিয়ে।
গোরিলাদের হাতে ধরা পড়ে ভয়ে নাওমির রক্ত হিম হয়ে যেতে লাগল। আরবদের থেকে এরা আরো ভয়ঙ্কর।
এদিকে পুঙ্গুর গায়ে ওবরস্কিকে রেখে দিয়ে ওরমানদের খোঁজে জঙ্গলে ক্রমাগত গাছের ডালে ডালে এগিয়ে যেতে থাকল টারজান। রাতটা সে একটা গাছে কাটিয়ে সকালে আবার রওনা হলো। কিছুদূর যাওয়ার পর বাতাসে শ্বেতাঙ্গদের গন্ধ পেল।
পথে একটা হরিণ দেখতে পেয়ে সেটাকে শিকার করল টারজান। তার অল্প কিছু দূরেই ওরমান আর ওয়েস্ট সেই পথে আসছিল।
হঠাৎ ওরমান ওয়েস্টকে বলল, কিসের শব্দ শোনা যাচ্ছে?
ওয়েস্ট বলল, নিশ্চয় কোন জন্তু।
ওরমান বলল, ওবরস্কি আসছে।
ওয়েস্ট দেখল ওবরস্কির মত অবিকল দেখতে একটা লোক কাঁধের উপর একটা মরা হরিণ নিয়ে তাদের দিকে আসছে।
টারজান দেখল, ওরা দুজনেই তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।
টারজান বলল, তোমরা নিশ্চয় খুবই ক্ষুধার্ত।
ওরমান বলল, ওবরস্কি তুমি?
টারজান বলল, তুমি কি ভেবেছিলে আমি ভূত?
টারজান তার নিজের পরিচয় না দিয়ে বলল, আমি তোমাদের দলের মেয়েদের খোঁজ করছি। তোমাদের দলের বাকি সবার খবর কি?
ওরমান বলল, তারা এখন কোথায় আছে কিছুই জানি না আমরাও মেয়ে দুটির খোঁজ করছি। আমরা এই আরবটিকে ধরেছি। এর কাছে জানতে পারি একটি মেয়ে সিংহের কবলে পড়ে মারা যায়। অন্যটির ও আরবদের কি অবস্থা হয়েছে তা ও জানে না।
টারজান তখন আরবী ভাষায় ঈয়াদকে প্রশ্ন করতে সে বলল, একটা মেয়ে সিংহের হাতে ধরা পড়ে। অন্যটিকে গোরিলাদের হাতে ধরা পড়তে দেখেছি আমি। গোরিলারা তাকে ধরে নিয়ে গেছে।
ঘটনাটা কোথায় ঘটেছে তার পূর্ণ বিবরণ জেনে নিল টারজান ঈয়াদের কাছ থেকে। তারপর সে ওরমানকে বলল, মনে হয় ও সত্য বলেছে। যাই হোক, আমি এখনি সেই উপত্যকায় গিয়ে দেখব।
এই বলে আবার গাছের উপর লাফ দিয়ে উঠে কোথায় চলে গেল টারজান।
ওরমান আর ওয়েস্ট সেইদিকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল বেশ কিছুক্ষণ ধরে।
এদিকে বাকিংহাম নামে সেই গোরিলাটা নাওমিকে নিয়ে দক্ষিণ দিকের পাহাড়টা পার হয়ে উপত্যকাটার দক্ষিণ প্রান্তে গিয়ে পড়ল।
কিছুক্ষণ যাওয়ার পর ওরা দেখল আর একটা গোরিলা ওদের তাড়া করে আসছে। বাকিংহাম নাওমিকে কাঁধে তুলে নিয়ে একটা বনে ঢুকে পড়ল।
বন থেকে ছুটে গিয়ে একটা পাহাড়ের গুহার সামনে এসে বাকিংহাম বলল, তুমি এখানে থাক। আমি সাফোককে মেরে তাড়িয়ে দিয়ে আসছি।
নাওমি সেই গুহাটায় একা রয়ে গেল। গুহার কাছে একটা ছোট ঝর্ণা ছিল। তার জল খেয়ে তৃষ্ণা মেটাল সে। এইভাবে দুটো দিন দুটো রাত কাটানোর পর তৃতীয় দিনে বাকিংহাম গুহাটায় ফিরে এসে বলল, তাড়াতাড়ি করে তুমি আমার পিঠে চাপ।
নাওমিকে পিঠে চাপিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে লাগল বাকিংহাম। অনেকক্ষণ ধরে এইভাবে যাবার পর পিছনে কার গর্জন শুনে থমকে দাঁড়াল। দেখল নগ্নদেহ এক শ্বেতাঙ্গ তার কাছে এসে পড়েছে।
নাওমি টারজানকে দেখে ওবরস্কি ভাবল। বলল, স্ট্যানলি, তুমি আমাকে বাঁচাও।
টারজান বাকিংহামকে বলল, তুমি চলে যাও বোলগানি। এ মেয়ে আমার, তোমাকে খুন করে ফেলবে।
বাকিংহাম ইংরেজিতে কথা বলায় আশ্চর্য হয়ে গেল টারজান। সে তাকে আক্রমণ করতে তার পিঠের উপর চড়ে তার ঘাড়টা ধরল। টারজনের সঙ্গে লড়াই করার জন্য নাওমিকে এক জায়গায় নামিয়ে। দিয়েছিল বাকিংহাম। সেখান থেকে ওদের লড়াই দেখতে লাগল।
হঠাৎ টারজান তার ছুরিটা বার করে বার বার বসিয়ে দিতে লাগল বাকিংহামের বুকে। অবশেষে বাকিংহাম নিষ্প্রাণ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে টারজান নাওমিকে নিয়ে চলে গেল সেখান থেকে।
নাওমি ক্ষুধায় ও দুর্বলতায় কথা বলতে পারছিল না। তাকে কাঁধের উপর তুলে পথ হাঁটছিল টারজান। নাওমি বলল, কোথায় যাবে এখন স্ট্যানলি?
টারজান বলল, জলপ্রপাতের কাছে ওরমান আর ওয়েস্ট অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।
নাওমি বলল, তারা তাহলে এখনো বেঁচে আছে?
টারজান বলল, তারা তোমার খোঁজ করছিল। বোন্ডাকে বোধহয় সিংহতে খেয়েছে।
নাওমি হাত বাড়িয়ে গোরিলাদের নগরটাকে দেখিয়ে বলল, না, রোন্ডাকে গোরিলারা ধরে নিয়ে গিয়ে ঐ নগরের মধ্যে একটা পাথরের প্রাসাদে বন্দী করে রেখেছে। গোরিলাটা আমায় বলেছিল, সে ওদের দেবতার কাছে আছে।
পথে এবার সেই নদীটা পেল ওরা। টারজান এক জায়গায় নাওমিকে ধরে সাঁতার কেটে সহজেই নদী পার হলো। নাওমি আশ্চর্য হয়ে গেল।
জলপ্রপাতটার কাছে গিয়ে টারজান নাওমিকে দেখাল পাহাড়ের তলায় তিনজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। টারজান বলল, ওরা হলো ওরমান, ওয়েস্ট আর ঈয়াদ নামে একটা আরব।
ওরমান ওদের দেখতে পেয়ে ছুটে এল। নাওমিকে জাড়িয়ে ধরলে তার চোখে জল এল।
টারজান বলল, আমাকে ওদের নগরটাকে দেখতে হবে। অনেককিছু জানতে হবে।
তখন অন্ধকার হয়ে আসছিল। সন্ধ্যার সেই ঘনায়মান অন্ধকারে ওদের বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে পড়ল টারজান। সে খাড়াই পাহাড়টায় গা বেয়ে অবলীলাক্রমে উঠে যেতে লাগল।
ওয়েস্ট সেইদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর বলল, আমিও যাব।
সেই পাহাড় আর উপত্যকা পার হয়ে প্রাচীর ঘেরা একটা নগর দেখতে পেল টারজান। টারজান প্রাচীরটা পার হয়ে নগরমধ্যে পড়ল। ভিতরটা অন্ধকার। কোন গোরিলাকে কোথাও দেখতে পেল না। একটা বড় বাড়িতে আলো দেখতে পেল টারজান। সে অনুমান করল ঐটাই বোধহয় দেবতার প্রাসাদ, যার কথা নাওমি তাকে বলেছিল। প্রাসাদটা পাহাড় কেটে নির্মাণ করা হয়েছে।
