শেখ আতুই-এর মাধ্যমে কথাটা শুনে বলল, ওকে বল তাই করব। কিন্তু আমরা হীরে পেয়ে গেলেও ওকে ছাড়ব না। এ কথাটা ওকে কিন্তু বলো না।
তখন বিকাল হয়ে গিয়েছিল। আরবরা নদীর ধারে গিয়ে সে রাতটার মত ওখানেই শিবির স্থাপন করল। পরদিন সকালেই ওরা আবার যাত্রা শুরু করল। নাওমি ওদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে লাগল। নদীটার ধারে ধারে সরু পথটা ধরে ওরা এগোতে লাগল।
কিন্তু নদীটা বড় খরস্রোতা এখানে। তার উপর জলে অনেক কুমারী আছে। কোনখান থেকে নদীটা পার হওয়া সহজ হবে তা দেখতে গিয়ে দুটো দিন কেটে গেল ওদের। তারপর একটা জায়গা ওরা নির্বাচন করল। কিন্তু সেখান থেকেও নদী পার হতে গিয়ে সকাল থেকে প্রায় সারাদিন কেটে গেল। কিন্তু ওরা যখন নাওমিকে নিয়ে নদীর ওপারে গিয়ে পৌঁছল তখন দেখা গেল ওদের দু’জন লোক মারা গেছে এবং তাদের ঘোড়া দুটোকে কুমীরে ধরে নিয়ে গেছে।
নদীর ওপারে গিয়ে ওরা একটা চওড়া রাস্তা দেখতে পেল। সেই পথ ধরে ওরা যেতে লাগল। আতুই নাওমির পাশে পাশে ঘোড়ায় চেপে যাচ্ছিল। এক সময় আতুইকে দেখাল নাওমি, ঐ দেখ, লাল গ্রানাইট পাথরের একটা স্তম্ভ। ম্যাপে ওটা দেখানো আছে। ওর পূর্ব দিকেই আছে হিরকদেশের উপত্যকায় যাবার প্রবেশ পথ।
শেখের মুখে হাসি ফুটে উঠল কথাটা শুনে। নাওমি বলল, আমি আমার কথামত কাজ করেছি। তোমরা তোমাদের কথামত কাজ করো। আমাকে আমার সঙ্গীদের কাছে পাঠিয়ে দাও।
আতুই বলল, থাম, এখন নয়। এখনো আমরা উপত্যকায় পৌঁছায়নি।
পরদিন সকালেই টারজান তার কথামত ওরমান আর ওয়েস্টের সন্ধানে বার হতে চাইল। কিন্তু ওবরস্কি হঠাৎ জ্বলের পড়ে গেল। সে শুয়ে শুয়ে জ্বরের ঘোরে ভুল বকতে লাগল।
অবশেষে সে ওবরস্কিকে কাঁধে তুলে নিয়ে জঙ্গলের মধ্যে বেরিয়ে পড়ল। সারাদিন ধরে ক্রমাগত দক্ষিণ দিকে এগোতে লাগল।
দিনের শেষে একটা গায়ে গিয়ে পৌঁছল টারজান। ওবরস্কির তখনো জ্ঞান ফিরে আসেনি। টারজনের থাকার জন্য একটা কুঁড়ে ঘর দিয়েছিল গাঁয়ের সর্দার পুঙ্গু। সেই ঘরে ওবরস্কিকে শুইয়ে দিয়ে নিজে পেট ভরে খেয়ে নিল টারজান। তারপর একাই উত্তর দিকের একটা বনপথ ধরে হাঁটতে লাগল। তখন গোধূলি হয়ে গেছে।
এদিকে সেই গোরিলাদের পার্বত্য নগরীর আসাদ অন্তঃপুরে বন্দী অবস্থায় সাতদিন কাটাল রোন্ডা। রানীরা তাকে ভাল চোখে কেউ না দেখলেও কনিষ্ঠা রানী ক্যাথারিন পার তাকে ঘৃণা করত সবচেয়ে বেশি। কারণ রাজা রোন্ডাকে বিয়ে করলে তার আদর একেবারেই কমে যাবে রাজার কাছে।
ক্যাথারিন বলল, আমরা সব মিলিয়ে ছ’জন রানী। তাদের নাম হল ক্যাথারিন অফ আরাগন, এ্যনি বোলিন, জেন সেমুর, এ্যানি অফ ক্লীভস, ক্যাথারিন হাওয়ার্ডে ও ক্যাথারিন পার।
রোন্ডা বলল, আজ হতে চারশ’ বছর আগে ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরির রানীদের এই সব নাম ছিল।
ক্যাথারিন পার বলল, এটা হলো ইংল্যান্ড এবং আমাদের বিয়ের পর এই সব নাম দেয়া হয়েছে।
রোন্ডা বলল, তোমাদের দেবতা কোথায় থাকে।
ক্যাথারিন পার বলল, ঐ প্রাসাদটায়। ওর ভিতরটায় কোনদিন ঢুকিনি। তাঁকে দেখিওনি কখনো। তবে শুনেছি তিনি নাকি খুবই বৃদ্ধ। দেবতার কাছে কেবলমাত্র রাজা আর তার সামন্তরা ছাড়া কেউ যেতে পারে না।
এমন সময় বাইরে তুমুল গোলমালের শব্দ শোনা গেল। জানালা দিয়ে ক্যাথারিন পার আর রোন্ডা উঁকি মেরে দেখল প্রাসাদের উঠোনে দু’দল গোরিলা লড়াই করছে ভয়ঙ্করভাবে।
ক্যাথারিন বলল, উলফসির দলের গোরিলারা উলফসিকে টাওয়ার থেকে মুক্ত করে এনেছে। রাজার দলের গোরিলাদের সঙ্গে উলফসির দল তাই লড়াই করছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই লড়াইটা অন্তঃপুরের বারান্দায় চলে এল। হঠাৎ ঘরের দরজা ঠেলে একদল পুরুষ গোরিলা ঘরে ঢুকল। তাদের নেতা ঘরে ঢুকেই বলল, সেই লোমহীন মেয়েটা কোথায়?
এই বলে সে রোন্ডার কাছে এসে তার হাতের কব্জিটা ধরে টানতে টানতে তাকে নিয়ে গেল। বলল, এস, দেবতা তোমায় ডেকে পাঠিয়েছে।
আরবরা সরু পথটা ধরে এগিয়ে যেতে থাকল। আতুই নাওমির পাশে পাশে তার ঘোড়াকে চালাতে লাগল। সে যে হীরকদেশে যাবে এবং সেখানে গিয়ে অনেক হীরে ও ধনরত্ন পাবে এ বিষয়ে কোন সন্দেহ। রইল না তা।
ক্রমে পথটা উঁচু হতে হতে একটা খাড়াই পাহাড়ের সামনে এসে পড়ল ওরা। আর ঘোড়া চালানো সম্ভব নয়। এবার পায়ে হেঁটে সাবধানে পাহাড়টা পার হয়ে ওধারের উপত্যকায় পৌঁছতে হবে।
ঈয়াদ সেইখানে ঘোড়ায় চেপে প্রতীক্ষায় রইল। শেখরা পা টিপে টিপে পাহাড়ে উঠতে লাগল। সহসা ঈয়াদ নিচে থেকে দেখতে পেল পাহাড়ের গা দিয়ে যে পথে শেখরা যাচ্ছিল সেই পথের ধারে ও উপরে ঘন বাঁশবন ছিল। সেই বাঁশবন থেকে মানুষের মত অনেকটা দেখতে কালো লোমওয়ালা একটা গোরিলা মুখ বাড়িয়ে উঁকি মেরে শেখদের দেখতে লাগল। এমনি করে পর পর কয়েকটা গোরিলা বাশবন থেকে বেরিয়ে এসে গর্জন করতে করতে আরবদের সামনে এসে দাঁড়াল। ঈয়াদ নিচে থেকে চীৎকার করে শেখকে সাবধান করার চেষ্টা করলেও তখন কোন উপায় ছিল না।
আরবরা পর পর গুলি করতে লাগল। তাতে দু-চারটে গোরিলা মারা গেল। জনকতক আহত হলো। কিন্তু বাকি সব গোরিলাগুলো আরবদের হাত থেকে সব বন্দুক কেড়ে নিয়ে সেগুলো ভেঙ্গে ফেলে দিল। তারপর তারা আরবদের ধরে তাদের ঘাড়ে কামড় দিতে লাগল আর তাদের হাতে কুড়াল আর লাঠি দিয়ে আঘাত করতে লাগল। বাকিংহাম নামে যে গোরিলাটা আগে রোন্ডাকে ধরেছিল সেই গোরিলাটা নাওমিকে তুলে নিয়ে পালাতে লাগল।
