ওরমান আর ওয়েস্ট রাইফেল হাতে এগিয়ে গেল। ওদের দেখে ঈয়াদও রাইফেল তুলে গুলি করতে গেল। কিন্তু তার আগেই ওরমান ওকে লক্ষ্য করে রাইফেল তুলে ধরেছে। সে ধমক দিয়ে বলল, বন্দুক নামাও।
ঈয়াদ বাধ্য হয়ে এবার বন্দুক নামাল।
ওরমান ওকে জিজ্ঞাসা করল, শেখ আবেল বেনেম কোথায়? আমাদের দল থেকে যে মেয়েদের ধরে নিয়ে গিয়েছিলে তারাই বা কোথায়?
ঈয়াদ শুধু নামগুলো ছাড়া ওদের কোন কথা বুঝতে পারল না। সে ইংরেজিতে কথা বলতে জানে না, আতুই জানত। সে হাবভাবে ও ইশারা করে বুঝিয়ে দিল, একটা মেয়েকে সিংহতে খেয়েছে। সে ছাড়া বাকি আরবদলের সবারই অবস্থা খুব খারাপ। তারা সবাই বিপদাপন্ন।
ওরা বুঝল ঈয়াদ নিশ্চয়ই কোন বিপদ থেকে বাঁচার জন্য দল ছেড়ে একাই পালিয়ে এসে পথ হারিয়ে ফেলেছে। না খেতে পেয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
একটা নদীর ধারে সন্ধ্যার সময় শিবির স্থাপন করল ওরা। ওদের সঙ্গে যে মাংস ছিল তা রান্না করল ওরমান। ঈয়াদ ওদের সঙ্গেই রয়ে গেল। ওরমান বলল, আগামীকাল সকালে আমরা আমাদের সফরির। খোঁজে বার হব। ঈয়াদ আমাদের কাছে থাকবে পথ দেখাবার জন্য।
এদিকে ওদের শিবিরের কাছ থেকে ওদের অলক্ষ্যে অগোচরে টারজান কখন ওদের দেখে গেছে তা বুঝতে পারেনি ওরা। টারজান সেই রাতেই ওবরস্কির কাছে গিয়ে বলল, আমি তোমাদের দু’জন সঙ্গীকে দেখে এসেছি তাদের নাম ওরমান আর ওয়েস্ট। তাদের সঙ্গে একজন আরবও ছিল। আমাদের এখান থেকে উত্তর দিকে কয়েক মাইল দূরে।
ওবরস্কি বলল, মেয়েদের দেখনি?
টারজান বলল, না, কালই তোমায় ওরমানের কাছে নিয়ে যাব। সেখানে গেলেই জানতে পারবে সবকিছু।
সেদিন সিংহটার আক্রমণের পর চেতনা হারিয়ে ফেলেছিল রোন্ডা ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়ে। চেতনা ফিরে পেয়ে চোখ মেলে তাকাতেই সে দেখল একটা সিংহ তার মরা ঘোড়াটার উপর একটা পায়ের থাবা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সে তখন ভয়ে আবার চোখ বন্ধ করল।
সিংহটা এবার তার কাছে এসে তার দেহটাকে শুঁকতে লাগল। রোন্ডা যতদূর পারল শ্বাসরুদ্ধভাবে মরার ভান করে রইল। সে জানত সাধারণত মরা মানুষকে কোনরকম পীড়ন করে না সিংহরা। দেখল কিছুক্ষণ পর ঘোড়ার মৃতদেহটা টানতে টানতে একটা ঝোপের আড়ালে নিয়ে গেল সিংহটা।
রোন্ডা শুয়ে শুয়ে লক্ষ্য করতে লাগল সিংহটাকে। সে দেখল কাছে একটা গাছ রয়েছে। গাছটায় কোনরকমে একবার উঠতে পারলেই আপাতত মুক্তি পাবে সিংহটার কবল থেকে। সিংহটা মাঝে মাঝে পিছন ফিরে তাকে দেখছিল।
সিংহটা যখন অন্যদিকে তাকিয়ে বসেছিল তখন রোন্ডা ছুটে গিয়ে গাছটার একটা ডাল ধরে ফেলল। ক্রমে সে গাছের উপরে উঠে গেল। সিংহটাও ততক্ষণে একটা লাফ দিয়ে তাকে ধরতে গিয়ে তার নাগাল টারজানক পেল না। গাছের উপর চারদিকে তাকাতে লাগল রোন্ডা। দেখল তার উত্তর-পূর্ব দিকে এক বিশাল প্রান্তর বিস্তৃত হয়ে আছে। প্রান্তরটার মাঝে মাঝে আছে কিছু কিছু গাছের জটলা। প্রান্তরটা ক্রমশ উঁচু হয়ে একটা পাহাড়ে গিয়ে মিলিয়ে গেছে। সহসা তার আতুই-এর একটা কথা মনে পড়ে গেল। ঐ পাহাড়ের নিচে উপত্যকাটার শেষ প্রান্তে একটা জলপ্রপাত আছে। তার নাম ওম্বাম্বি জলপ্রপাত। তার মনে হলো ঐ জলপ্রপাতের কাছে কোনরকমে গিয়ে পড়তে পারলেই সে তার সঙ্গীদের দেখা পাবে। ওরমান এখানেই যেতে বলেছিল। এক নতুন আশার আলো দেখতে পেল রোন্ডা।
প্রায় এক ঘণ্টা কেটে গেল। তারপর রোন্ডা দেখল সিংহটা ঝোপ থেকে বেরিয়ে যে নদীটা তারা পার হয়ে এসেছে সেই নদীর ধারে গিয়ে একটা ঝোপের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। রোন্ডা দেখল এই হচ্ছে সুযোগ। সে তাই গাছ থেকে নেমে উপত্যকার উপ দিয়ে হাঁটতে লাগল সামনের পাহাড়টাকে লক্ষ্য করে। একবার পিছন ফিরে দেখল সিংহটা আর আসছে না তার পিছনে। ক্ষুধা আর তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়েছিল সে।
ক্লান্তি ও দুর্বলতায় আর পথ চলতে পারছিল না রোন্ডা। এক সময় একটা পাথরের উপর বসে পড়ল। এমন সময় তার পিছনে কে ইংরেজিতে বলল, ও একা আছে। ওকে আমরা আমাদের দেবতার কাছে। নিয়ে যাব।
রোন্ডা মুখ ঘুরিয়ে দুটো গোরিলা মানুষের মত কথা বলছে।
একটা লোমশ হাতে রোন্ডাকে ধরে ফেলল, একটা গোরিলা তাকে বলল, এস আমাদের সঙ্গে। আমরা তোমাকে আমাদের দেবতার কাছে নিয়ে যাব।
রোন্ডা গোরিলা দু’টোর কাছ থেকে নিজেকে মুক্ত করার জন্য ধস্তাধস্তি করতে লাগল। কিন্তু পারল না। একজন গোরিলা তাকে শক্ত করে ধরে পথ চলতে লাগল।
পথের মধ্যে দু’জন গোরিলা ঝগড়া শুরু করে দিল নিজেদের মধ্যে। যে গোরিলাটা রোন্ডাকে ধরেছিল সে বলল, সে তাকে তাদের দেবতার কাছে নিয়ে যাবে।
নাওমির ঘোড়াটা ঊর্ধ্বশ্বাসে আরবদের শিবিরের দিকে ছুটতে লাগল। নাওমি ঘোড়াটার লাগাম টেনে তার গতিটা অন্য দিকে ঘোরাবার অনেক চেষ্টা করল। কিন্তু ঘোড়াটা তাকে সোজা আরবদের শিবিরে নিয়ে গেল। আতুই তাকে দেখতে পেয়ে আবার বন্দী করে ফেলল।
নাওমিকে দেখে খুশি হলো শেখ। সে বলল, অন্য মেয়েটি কোথায়?
নাওমি বলল, সিংহ তাকে খেয়ে ফেলেছে।
শেখ বলল, ঠিক আছে। তুমি হলেই চলবে। আমাদের কাছে ম্যাপটা আছে। তুমিই আমাদের হীরকদেশের উপত্যকায় নিয়ে যাবে।
নাওমি বলল, আমি যদি তোমাদের সেখানে নিয়ে যাই তাহলে বল আমাকে মুক্তি দেবে? আমার সঙ্গীদের কাছে পাঠিয়ে দেবে?
